আজ আন্তর্জাতিক আরবি ভাষা দিবস। ২০১০ সালে জাতিসংঘে এই দিনে আন্তর্জাতিক আরবি ভাষা দিবস উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই থেকে প্রতি বছর ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থার উদ্যোগে দিবসটি পালিত হয়। ১৯৭৩ সালে ১৮ ডিসেম্বর ষষ্ঠ ভাষা হিসেবে আরবি ভাষা জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষার মর্যাদা লাভ করে। জাতিসংঘের অন্য দাপ্তরিক ভাষাগুলোর (ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিশ, চায়নিজ, রুশ) মতো আরবি ভাষা দিবস উদযাপনের জন্য দিনটি নির্ধারিত হয়। প্রতি বছর ইউনেস্কোসহ আরব রাষ্ট্র ও আরবি ভাষার প্রতিষ্ঠানগুলো নানা ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে।
আরবি ভাষা বর্তমান বিশ্বের সর্বাধিক প্রচলিত ভাষাগুলো অন্যতম। আরব বিশে^ দিবসটি যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হলেও বাংলাদেশে দিবসটি তেমন সাড়া জাগাতে পারেনি। অথচ আরবি ভাষার সঙ্গে রয়েছে এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর আত্মার সম্পর্ক। এ দেশের আপামর জনসাধারণ আরবি ভাষাকে পরম শ্রদ্ধা করে, মন থেকে ভক্তি করে এবং হৃদয় দিয়ে ভালোবাসে। আরবি ভাষার যেমন রয়েছে ধর্মীয় গুরুত্ব, তেমনই রয়েছে বৈষয়িক গুরুত্ব।
পৃথিবীর প্রায় ২৮ কোটি জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা আরবি। আর ২৫ কোটি মানুষ আরবিকে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন। ২৫টি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের দাপ্তরিক ভাষা আরবি। জাতিসংঘের ৬টি দাপ্তরিক ভাষার একটি আরবি। তাই যুগ ও বাস্তবতার নিরিখে আরবি ভাষা বর্তমান পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী একটি ভাষা।
অর্থনৈতিক বিবেচনাতেও আরবি ভাষা বাংলাদেশের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। দেশের অর্থনীতির অন্যতম শক্তি ধরা হয় রেমিট্যান্স। আর এ রেমিট্যান্সের সিংহভাগই অর্জিত আরবি ভাষার দেশগুলো থেকে। তাই দেশের রেমিট্যান্স বাড়ানোর স্বার্থে, দেশের অর্থনীতিকে আরও চাঙ্গা করার স্বার্থে, দেশের আয় ও উন্নতির স্বার্থে আরবি ভাষাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
আমাদের দেশ থেকে প্রতি বছর প্রচুর মানুষ জীবিকার তাগিদে আরব দেশগুলোতে যায়। অথচ আরবি ভাষার সঙ্গে তাদের পূর্ব কোনো সম্পর্ক থাকে না। আরবি ভাষার সঙ্গে মোটামুটি সম্পর্ক থাকলে এ লোকগুলো আরব দেশে নিজেদের অবস্থান আরও মজবুত করতে পারত। নিজেদের ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা আরও বেশি আদায় করে নিতে পারত। আর আমাদের সরকার একটু উদ্যোগী হলে অনেক কিছুই করতে পারে। দেশের স্বার্থে, দেশের মানুষের স্বার্থে সরকার আরব দেশে গমনেচ্ছুক শ্রমিকদের জন্য স্বল্প মেয়াদে ব্যবহারিক আরবি ভাষা শিক্ষা কোর্স চালু করতে পারে। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে রেমিট্যান্সের ওপর। অবশ্য কিছুদিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন একটি আলাপ খুব সাড়া ফেলেছিল যে, স্কুলের মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রত্যেক শ্রেণিতে আরবি ভাষার ওপর স্বতন্ত্র একটি বিষয় সংযুক্ত করা হবে। এমনটি হলে খুবই ভালো হবে।
এ দেশের তিন লক্ষাধিক মসজিদে প্রতিদিন পাঁচবেলা দলবদ্ধ ও এককভাবে যে নামাজ পড়া হয়, সেই নামাজরে ভাষাও আরবি। একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান, তিনি যে দল ও মতেরই হোন কেন, নামাজের কারণে প্রতিদিন তাকে কম করে হলেও মোট ৫০ মিনিট সময় নিবীড়ভাবে আরবি ভাষার সঙ্গে কাটাতে হয়। প্রতি সপ্তাহের শুক্রবারে তাকে দশ মিনিট আরবিতে খুতবা শোনতে হয়। এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী তাদের জন্মের পর মুহূর্তে সর্বপ্রথম যে শব্দ শোনে, যে বাক্যগুলো দিয়ে পৃথিবীর নতুন জীবনে তারা বরণীয় হয়, সমাদৃত হয়, অভিনন্দিত হয়, সেই আজানের ভাষাও আরবি। আবার পৃথিবী থেকে তাকে চিরবিদায় দেওয়া হয় আরবি ভাষায়। জানাজার নামাজ, লাশ কবরে রাখার দোয়া, কবর মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়ার দোয়া সবই আরবিতে। তাই আরবি ভাষার সঙ্গে এ দেশের মানুষের সম্পর্ক জন্ম-মৃত্যুর সম্পর্ক। শুধু জন্ম-মৃত্যু নয় বরং জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নিত্যদিনের সম্পর্ক। এ সম্পর্ক সুগভীর এক সম্পর্ক।
তুলনামূলকভাবে বিদেশি ভাষাগুলোর মধ্যে আরবি ভাষা অনেক সহজ। সামান্য উদ্যোগ নিলে মানুষের জন্য আরবি ভাষা শেখার সহজ পথ ও পন্থা বের করা সম্ভব। সঙ্গতকারণেই এবারের আন্তর্জাতিক আরবি ভাষা দিবসের দাবি হোক, শিক্ষার সর্বস্তরে আরবি ভাষার অন্তর্ভুক্তি। ইসলাম ধর্মের পবিত্র কোরআন, হাদিস, মুসলিম মনীষী ও বিজ্ঞানীদের রচনার ভাষা হিসেবে তা ব্যবহৃত হয়। কয়েক হাজার বছর পার হলেও আরবি ভাষা আপন মহিমায় সমুজ্জ্বল হয়ে আছে আজ পর্যন্ত। আরবি ভাষা শেখার প্রয়োজনীয়তার কিছু দিক তুলে ধরা হলো।
এক. আরবি ভাষা কোরআন-হাদিসের ভাষা। দ্বীন ইসলামের ভাষা এবং দ্বীন ইসলামের অংশ। রাসুল (সা.) এ ভাষায় কথা বলেছেন। আরবি ভাষার প্রচার-প্রসার দ্বীন ইসলামের প্রচার প্রসার। ওমর (রা.) বলেন, ‘তোমরা আরবি শিক্ষা করো। কেননা আরবি তোমাদের দ্বীনের অংশ।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘তোমরা আরবি ভাষা শিক্ষা করো, তা জ্ঞান বৃদ্ধি করে।’ ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, ‘আরবি ভাষা দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত। তা শিক্ষা করা আবশ্যক। কেননা কোরআন-সুন্নাহ বোঝা আবশ্যক। আরবি বোঝা ছাড়া কোরআন-সুন্নাহ বোঝা যায় না। আর যার মাধ্যমে আবশ্যকীয় বিষয় জানা যায়, তা জানাও আবশ্যক।’ সুতরাং দ্বীনি দিক লক্ষ্য করে আরবি ভাষা শিখতে হবে। আর বর্তমান সময়ে সবাই তা শেখার জন্য অগ্রসর হচ্ছে।
দুই. কৌশলগত দিক থেকে আরবি ভাষা শিক্ষা করা প্রয়োজন। কেননা আরবি ভাষা পৃথিবীর বিরাট অংশকে দখল করে আছে। সুতরাং আরবি ভাষা আন্তর্জাতিক ভাষা। ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে এর অনেক গুরুত্ব রয়েছে।
তিন. আরবি ভাষা জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সভ্যতা ও ঐতিহ্যের বিরাট এক অংশ বহন করে আছে। ইতিহাস ও সভ্যতার দিক থেকে এটা প্রমাণিত যে, আরবি ভাষার মাধ্যমেই ইউনানি জ্ঞান-বিজ্ঞান ও দর্শনের প্রচার-প্রসার হয়েছে জগৎ জুড়ে।
চার. বিভিন্ন সংস্থা, হাসপাতাল, অফিস-আদালতে আরবি অনুবাদকের প্রয়োজন হয়। তাদের কাজ-কর্ম আরবি ভাষায় অনুবাদ করতে হয়। এ জন্য দরকার দক্ষ আরবি অনুবাদক।
পাঁচ. পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে অসংখ্য শ্রমিক, কর্মচারী ও ব্যবসায়ী মধ্যপ্রাচ্যে যায়। কোম্পানি ও কারখানার মালিকরা আরবি ভাষায় দক্ষ লোকদের খোঁজে। যাদের আরবি ভাষায় মোটামুটি দক্ষতা রয়েছে, তারা ভালো বেতনে ভালো কাজ পেয়ে যাচ্ছে। পক্ষান্তরে যেসব শ্রমিক ও কর্মচারীর আরবি ভাষায় কোনো ধরনের যোগ্যতা ও দক্ষতা না থাকে, তারা বিভিন্ন রকম অসুবিধার মুখোমুখি হয়। ফলে তারা নানা শ্রেণির ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রতারিত হয়।
ছয়. আরব দূতাবাসে ভালো বেতনে চাকরির জন্য লোক খোঁজা হয়। এর জন্য আরবিতে দক্ষ ব্যক্তিদের প্রয়োজন। ইংরেজির পাশাপাশি কেউ যদি আরবিতেও দক্ষ হয়, তাহলে সেখানে উঁচু পর্যায়ের পদ পাওয়া যায়। তাই দেশের রেমিট্যান্স বাড়ানোর স্বার্থে, দেশের অর্থনীতিকে আরও চাঙ্গা করার স্বার্থে, দেশের আয় ও উন্নতির স্বার্থে আরবি ভাষাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্ব দেওয়া দরকার।