জনগণের জয় মনে করছে রাজনৈতিক দলগুলো

নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্তি-সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের দুটি ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। তারা বলেন, এ রায়ের মাধ্যমে জনগণের বিজয় হয়েছে। সাধারণ মানুষ এখন তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে সরকারে পাঠাতে পারবে। আর জনগণের ভোটে যে সরকার ক্ষমতায় আসবে তারা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে।

এদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা ‘অপ্রাসঙ্গিকভাবে’ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের জন্য সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হককে দায়ী করে তার গ্রেপ্তার ও বিচার দাবি করেছেন। পাশাপাশি তারা নতুন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনলে সে সরকারের মেয়াদ কতদিন হবে, কাদের কাছে জবাবদিহি করবে এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে কি না, সে বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করার তাগিদ দিয়েছেন।

নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্তি-সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের দুটি ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করে গতকাল মঙ্গলবার হাইকোর্টের রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আদালত থেকে যে রায় এসেছে তাতে জনগণের বিজয় হয়েছে বলে আমরা মনে করি। জনগণের এ বিজয় আনতে আমরা দীর্ঘদিন আন্দোলন করেছিলাম। আমাদের দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া চেয়েছিলেন জনগণ যাতে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে নিজেদের পছন্দের সরকার গঠন করতে পারে। কিন্তু বিগত আওয়ামী লীগ সরকার গণতন্ত্র হত্যা ও গায়ের জোরে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য আদালতকে ব্যবহার করে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেছিল।’

বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা আরও বলেন, ‘হাইকোর্টের এই রায়ের ফলে গণতন্ত্র সুসংহত হবে, দেশ পরিচালনায় স্বচ্ছতা আসবে এবং মানুষের মতামত প্রাধান্য পাবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকায় ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছিল, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছিল এবং সর্বশেষ ২০০১ সালে বিএনপি আবার ক্ষমতায় এসেছিল। প্রমাণ হয়েছিল একমাত্র তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকলে জনগণ তাদের পছন্দের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে।’

অন্যদিকে সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক অপ্রাসঙ্গিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের রায় দিয়েছিলেন অভিযোগ করে তাকে গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবি জানান বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এবিএম খায়রুল হককে গ্রেপ্তার করে তার বিচার করা দরকার। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে বাংলাদেশে ভোটারবিহীন, একতরফা ও রাতের নির্বাচনের সুযোগ করে দিয়েছিলেন তিনি। তার বিচার করলে ভবিষ্যতে কেউ অবিচার করার সাহস পাবে না।’

একই দাবি জানান বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দায়িত্বশীল এক নেতা। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হককে গ্রেপ্তার করে তার বিচার করা উচিত। কারণ তিনি আওয়ামী লীগকে অবৈধভাবে ক্ষমতায় থাকা, দেশে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের খুন, গুম করার অধিকার দিয়েছিলেন অন্যায়ভাবে ক্ষমতায় গিয়ে।’

পঞ্চদশ সংশোধনী রায়ের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার। তাতে তিনি বলেন, ‘দেশের উচ্চ আদালতের রায়ে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের মাধ্যমে জনগণের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ রায় জনগণের আরেকটি বিজয়। ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হয়। এ সংশোধনীর মাধ্যমে জনগণের ভোট ও নির্বাচনব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করা হয়েছিল। এ সংশোধনীর মাধ্যমে বিনা ভোটে ক্ষমতা দখলের প্রবণতা তৈরি হয়।’

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হয়। ২০১১ সালের ৩ জুলাই এ-সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করা হয়। এর আগে সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি গঠন করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। ওই কমিটিতে আওয়ামী লীগসহ ১৪ দল এবং বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে মত দিয়েছিল।

পঞ্চদশ সংশোধনী রায়ের প্রতিক্রিয়ায় নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল হয়েছিল অগণতান্ত্রিক, অসাংবিধানিকভাবে। আগে কোর্টের রায় আসত সরকারের জবরদস্তির মাধ্যমে। এখন কোর্ট স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে বিধায় জনগণের পক্ষে রায় দিতে পারছে। মানুষ যেভাবে চেয়েছিল সেভাবেই রায় এসেছে।’

সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করে ১৯৯৬ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনী জাতীয় সংসদে গৃহীত হয়। প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ ২০১১ সালের ১০ মে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করে রায় দেয়। এর মাস দেড়েক পরেই ৩০ জুন সংসদে গৃহীত সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়।

আদালতের গতকালের রায়কে স্বাগত জানিয়ে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিগত সরকার জনগণের প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দেয়নি। তাই তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করেছিল ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করতে। এর মাধ্যমে তারা তাদের নিজেদের পতন নিশ্চিত করেছিল। বর্তমানে দেশে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, তাতে বেশ কয়েকটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হওয়া উচিত। কারণ এখানে ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের মধ্যে দূরত্ব অনেক বেশি।’

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির এ নেতা আরও বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরে আসলে তার ধরন কেমন হবে, তা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা। সরকারের মেয়াদ তিন নাকি চার মাস হবে, তা নির্ধারণ করা। আগে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল সে সরকার জবাবদিহিমূলক ছিল না। তাদের পরবর্তী সরকারের কাছে জবাবদিহির বিধান সংযুক্ত করা উচিত। তাদের এখতিয়ার কী হবে তা নির্ধারণ করা উচিত। এ ছাড়া ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার হিসেবে কাজ করবে কি না, তা ঠিক করা উচিত।’

হাইকোর্টের গতকালের রায়ের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা কীভাবে ফিরিয়ে আনা যায় সে বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যৌক্তিক হবে বলে মনে করেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সুপারিশ অগ্রাহ্য করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছিল। তৎকালীন সরকার জনআকাক্সক্ষার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছিল সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থে। জনগণের অভিপ্রায় হওয়া উচিত সংবিধান। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। এখন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। এ অবস্থায় কীভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা যায় সে বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যৌক্তিক হবে।’