গাজার দুঃখের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন খালেদ নাভান, ইসরায়েল কেড়ে নিল তাকেও

ইসরায়েলের হামলায় নাতনি রিমের মৃত্যুর পর গাজায় দুঃখ আর ত্যাগের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন তার দাদা খালেদ নাভান। ২০২৩ সালের ২৯ নভেম্বর রিমের মৃত্যুর পর নিথর নাতনিকে বুকে জড়িয়ে "আত্মার আত্মা" বলে পুরো বিশ্বকে কাঁদিয়েছিলেন তিনি।

এবার নাতনির মতই ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন খালেদ নাভান। তার মৃত্যু গাজার সাধারণ মানুষের উপর চলমান নির্যাতনের এক হৃদয়বিদারক উদাহরণ। খবর আল জাজিরা।

সোমবার (১৬ ডিসেম্বর)গাজার নুসাইরাত শরণার্থী শিবিরেই ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন খালেদ নাভান। গাজায় যুদ্ধের ৪৩৭তম দিনে তিনি শহীদ হলেন।

২০২৩ সালের ২৯ নভেম্বর, গাজার দেইর আল-বালাহ অঞ্চলে ইসরায়েলি বিমান হামলায় খালেদ নাভানের তিন বছর বয়সী নাতনি রীম এবং পাঁচ বছর বয়সী নাতি তারেক নিহত হন। সেই সময় তিনি রীমের নিথর দেহ কোলে নিয়ে বলেন, “রূহ আল-রূহ” (soul of his soul) আত্মার আত্মা। এই হৃদয়স্পর্শী মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দি হয়ে সারা বিশ্বের হৃদয়ে দাগ কেটেছিল।  

এক সাক্ষাৎকারে খালেদ বলেছিলেন, ‘আমি বুঝতেও পারিনি, ওই কথাগুলো অজান্তেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। আমি শোকের গভীরে ডুবে ছিলাম।’

নাতনি ও নাতির মৃত্যুর পর খালেদ শোককে শক্তিতে পরিণত করেন। তার পরিবার এবং সমাজের জন্য একজন আশ্রয়স্থল ছিলেন তিনি। শিশুদের জন্য একটি প্রকল্প চালু করেছিলেন, যার নাম ‘Reem: Soul of the Soul’, যেখানে যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনে ছোট ছোট শিশুদের খেলনা বিতরণ ও আনন্দ দেয়ার চেষ্টা চালানো হয়।

নাতনি রীমের মৃত্যুর পর তিনি শুধু তার শোক বহন করেননি, বরং নিজের দুঃখ দূরে সরিয়ে গাজার দুর্দশাগ্রস্ত মানুষদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তার মানবিক কাজগুলো তাকে “এক ব্যক্তির ত্রাণ সংস্থা”তে পরিণত করে। তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য খাবার, কাপড় এবং আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতেন।

ঘরে বসে নীরবে কাঁদছিলেন মায়সা নাভান। বার বার ফোনে তার মৃত সন্তানদের সাথে বাবা খালেদ নাভানের ছবি দেখছিলেন তিনি।

তিনি বলেন, “তিনি (খালেদ নাভান) আমাদের কাছে সবকিছু ছিলেন। তিনি এই পরিবারকে একসাথে ধরে রেখেছিলেন। যখন আমার বাচ্চারা মারা যায়, তখন তিনিই আমাকে প্রতিদিন সান্ত্বনা দিতেন।”

নাভানের ছেলে দিয়া জানান, ‘নিজে ক্ষুধার্ত এবং অপুষ্টি থাকা সত্ত্বেও অন্যদের খাওয়ানোর জন্য যখনই কাজ পেতেন তখনই তিনি শ্রমিক হিসাবে কাজ করতেন।‘

তিনি আরও বলেন, “তার পিতা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বিশ্বজুড়ে সমবেদনা ও ভালোবাসাকে কাজে লাগিয়ে সাহায্য পৌঁছে দিয়েছিলেন। গাজার অভাব-অনটন তাকে ব্যথিত করত।” গাজায় মানবতার চূড়ান্ত অপমান হলো জীবনধারণের জন্য ন্যূনতম চাহিদাগুলোও পূরণ না হওয়া, বলেন তিনি।

খালেদের স্ত্রী আফাফ বললেন, “তিনি ছিলেন একজন পুণ্যবান এবং মানবিক ব্যক্তি। তিনি আমাদের ভালোবাসা, উষ্ণতা, এবং আশা দিয়েছেন। বোমা বর্ষণের মধ্যেও আমাদের নিরাপত্তার অনুভূতি দিতেন। এখন শুধু জানতে চাই—আর কত নিরীহ জীবন এভাবে হারাতে হবে?”

খালেদ নাভানের মৃত্যু গাজার মানবিক সংকটের এক করুণ উদাহরণ। তার সাহস, ভালোবাসা, ন্যায়বিচারের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবেন তিনি। তার জীবন আর ত্যাগ গাজার মানুষের সংগ্রামকে তুলে ধরে।

আর কতকাল ইসরায়েলের আগ্রাসনের শিকার হবে গাজা? আর কত রক্ত ঝরলে বন্ধ হবে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ? সবার মনেই এই প্রশ্ন।