ক্রমবর্ধমান খাদ্য মূল্যস্ফীতি ও নতুন করে টাকা ছাপানো বাংলাদেশের অর্থনীতির এ দুই ইস্যুতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এই উদ্বেগ কাটাতে সরকারকে ছয়টি পরামর্শও দেওয়া হয়েছে সংস্থাটির পক্ষ থেকে।
আইএমএফ যে দুটি বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, তা হলো বাংলাদেশের বাজারে অব্যাহতভাবে খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি এবং নতুন টাকা ছাপিয়ে বাজারে ছাড়া। এজন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে দ্রব্যমূল্য কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়াসহ কর অব্যাহতি অপসারণ, অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের রাশ টেনে ধরা, মুদ্রা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ, বিনিময় হার আরও নমনীয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখার পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। গতকাল বৃহস্পতিবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সভাকক্ষে বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন আইএমএফের সফররত প্রতিনিধিদলের প্রধান ক্রিস পাপাজর্জিও।
ক্রিস পাপাজর্জিও বলেন, বাংলাদেশের বাজারে অব্যাহতভাবে খাদ্যমূল্য বাড়ছে, এজন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সংস্থাটি মনে করে, মূল্যস্ফীতির চাপে আছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। এজন্য প্রবৃদ্ধি কমবে। রাজস্ব আদায়ও কমেছে। রিজার্ভের অবস্থাও চাপের মুখে রয়েছে।
নতুন টাকা ছাপিয়ে বাজারে ছাড়াতেও সংস্থাটি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তবে আইএমএফ বিশ্বাস করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেছেন, তারা যে টাকাটা নতুন করে বাজারে ছেড়েছেন, সেটা তারা দ্রুত বাজার থেকে তুলেও নেবেন। তবে সেটা যদি না করে তাহলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে, যা দেশের সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়াবে।
আইএমএফ বলছে, বাংলাদেশে কর-রাজস্ব অনুপাত কম। তাই একটি স্বচ্ছ ও ন্যায্য রাজস্বব্যবস্থা গড়ে তুলতে জরুরি ভিত্তিতে রাজস্বসংক্রান্ত সংস্কার করতে হবে। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দূর করার পরামর্শ দিয়ে আইএমএফ বলেছে, দ্রুত যেসব কাজ করতে হবে, তার মধ্যে রয়েছে সঠিকভাবে খেলাপি ঋণ চিহ্নিত করা, বর্তমানে যেসব নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা রয়েছে তার কার্যকর বাস্তবায়ন এবং আর্থিক খাত পুনর্গঠনের জন্য একটি রোডম্যাপ বা পথনকশা তৈরি করা। আর্থিক খাতের সংস্কার কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও সুশাসন খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে সংস্থাটি।
এ ছাড়া বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করা, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং তৈরি পোশাকশিল্পের বাইরে রপ্তানি খাত আরও বৈচিত্র্যময় করতে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের পাশাপাশি সুশাসন বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে আইএমএফের পক্ষ থেকে।
আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাহী বোর্ডের বৈঠকে অনুমোদনের পর চলমান ঋণ কর্মসূচির চতুর্থ কিস্তির ৬৪৫ মিলিয়ন ডলার ছাড় করবে আইএমএফ।
আইএমএফ প্রতিনিধিদলের প্রধান বলেন, আগামী ৫ ফেব্রুয়ারি আইএমএফের নির্বাহী বোর্ডের সভায় অর্থ ছাড়ের প্রস্তাব উঠবে। সেখানে অনুমোদন পেলে অচিরেই তা বিতরণ করা হবে।
এর আগে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের জন্য ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ঋণ অনুমোদন করে আইএমএফ। এ পর্যন্ত তিন কিস্তিতে ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার ঋণ ছাড় করেছে সংস্থাটি।
চতুর্থ কিস্তি ঋণ দেওয়ার আগে গত ৩ থেকে ১৮ ডিসেম্বর আইএমএফের ১৩ সদস্যের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করে। সংস্থাটির কর্মকর্তা ক্রিস পাপাজর্জিও দলটির নেতৃত্ব দেন। সফরে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স ও বিদ্যমান ঋণের চতুর্থ কিস্তির কাঠামোগত সংস্কারের শর্ত পালন নিয়ে পর্যালোচনা করে দলটি। ওই সফরের শেষে গত বুধবার আইএমএফের দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, চতুর্থ কিস্তির অর্থ ছাড় করতে সংস্থাটি বাংলাদেশের সঙ্গে কর্মকর্তা পর্যায়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে।
এর আগে আইএমএফ বলেছিল, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হবে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। অক্টোবরে প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুকে এমন প্রাক্কলন করা হয়েছিল। আরও আগে চলতি অর্থবছরের জন্য আইএমএফের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ছিল ৬ দশমিক ৬ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের বাজেটে গত আওয়ামী লীগ সরকার ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল।
আইএমএফ জানিয়েছে, বাংলাদেশের কর্র্তৃপক্ষ চলমান ঋণ কর্মসূচির আকার আরও ৭৫ কোটি মার্কিন ডলার বাড়ানোর জন্য অনুরোধ করেছে। এর ফলে বর্ধিত ঋণসহায়তা (ইসিএফ) এবং বর্ধিত তহবিল সহায়তা (ইএফএফ) বাবদ ঋণের আকার দাঁড়াবে ৪০০ কোটি ডলারে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ফ্যাসিলিটি (আরএসএফ) কর্মসূচির আওতায় ১৩০ কোটি ডলার ঋণ পেয়েছে।
বাংলাদেশের কর্মকর্তারা এর আগে জানিয়েছিলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশ যে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে, তা মোকাবিলার জন্য অতিরিক্ত অর্থ প্রয়োজন। কর্মকর্তারা আশা করেছিলেন যে, আইএমএফের কাছ থেকে অতিরিক্ত ৩০০ কোটি ডলার পাওয়া যাবে। চলমান ঋণ কর্মসূচির আওতায় অতিরিক্ত অর্থের জন্য বাংলাদেশের কর্র্তৃপক্ষ যে অনুরোধ করেছে, তা পাওয়া গেলে এ কর্মসূচির আকার দাঁড়াবে ৫৩০ কোটি ডলার।