বৃহস্পতিবার দুপুর ১টা। ঢাকার অদূরে কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরার চুনকুটিয়া এলাকায় রূপালী ব্যাংক শাখায় কালো হুডি পরা তিনজন লোক প্রবেশ করেন। ব্যাংকের ভেতরে প্রবেশের প্রায় ৩০ মিনিট পরে কিছু হইচই শুরু হয়। তখনো এলাকার মানুষ কিছু বুঝে উঠতে পারছিলেন না। দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে ওই ভবনের নিচের দোকানিরা টের পান ব্যাংকের মধ্যে কিছু একটা হচ্ছে। ওই ভবনের নিচে বরিশাল ফার্মেসির মালিক মনোয়ার পেছনের একটি জানালা থেকে দেখতে পান ব্যাংকের মধ্যে মাস্ক পরে কয়েকজন অস্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি জানালা থেকে নেমেই আশপাশের লোকদের জানালে হইচই পড়ে যায়, ব্যাংকে ডাকাতি হচ্ছে। দোকানিরা ব্যাংকের নিচের গেটে তালা মেরে দেন। মসজিদের মাইকে জানান দেওয়া হয় ব্যাংকে ডাকাতি হচ্ছে। পুলিশে খবর দিলে তারাও চলে আসে। প্রায় ৫ ঘণ্টা জিম্মির থাকার পর বিকেল সাড়ে ৫টায় ব্যাংক কর্মকর্তাদের উদ্ধার এবং তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছে থাকা জব্দ করা চারটি অস্ত্রই খেলনা পিস্তল। এ ছাড়া দুটি চাকু উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, মুভি দেখে ডাকাতির পরিকল্পনা করেন। গ্রেপ্তারদের বয়স ২০-২৫ বছর।
ডাকাতদের গ্রেপ্তারের পর নিয়ে যাওয়ার সময় র্যাব-১০ সিও ও অতিরিক্ত ডিআইজি খালিদুল হাওলাদার বলেন, ‘পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় চেষ্টা ব্যাংকের ভেতরে গিয়ে আমরা ডাকাতদের সঙ্গে সমঝোতা করার চেষ্টা করেছি। পরে আমাদের কথায় সাড়া দিয়ে ভেতরে থাকা তিন ডাকাত দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করেছে। ব্যাংকের ভেতরে জিম্মি থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাই ভালো আছেন। কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। ব্যাংকের ভেতরে তিন ডাকাত সদস্য ঢুকেছিল। তাদের আরও কিছু সদস্য ব্যাংকের বাইরে ছিল। তবে তাদের শনাক্ত করা যায়নি। উৎসুক জনতার ভিড়ে তারা পালিয়ে যায়।’
ব্যাংকের বিপরীত পাশেই চারতলা একটি আবাসিক ভবন। ভবনের দোতলা থেকে ব্যাংকের ভেতরের চিত্র দেখেছিলেন রুবেল হোসেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুপুরে ব্যাংকে ডাকাতির খবর শুনে হইচই শুরু হলে আমরা ঘরের ভেতর থেকে দেখার চেষ্টা করি। তেমন কিছু বোঝা যাচ্ছিল না। তবে সূর্যের আলো কমে যাওয়ার পর ব্যাংকের মধ্যে আলো জ¦লায় কয়েকজনকে দেখা গেছে। তাদের মুখে মাস্ক ছিল। ব্যাংক কর্মকর্তাদের হাত বাঁধা ছিল। তাদের অস্ত্র দেখিয়ে ভয় দেখানো হচ্ছিল।’
ঘটনাস্থলে থাকা কেরানীগঞ্জ থানার পরির্দশক আল-আমিন বলেন, ‘ভেতরে তিন ডাকাত ছিল। তারা আত্মসমর্পণ করেছে। তাদের বয়স ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। তবে এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি।
কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ওসি সোহরাব আল হাসান বলেন, ‘গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে চারটি পিস্তল ও দুটি চাকু উদ্ধার করা হয়েছে। রূপালী ব্যাংকের জিঞ্জিরা শাখা থেকে যৌথ বাহিনীর হাতে আত্মসমর্পণ করা তিন ডাকাত থানা হেফাজতে আছে। জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা গেছে, তাদের নাম সাফায়েত, নীরব ও সিফাত। নামগুলো সঠিক কি না, যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তাদের মধ্যে দুজনের বয়স ১৪ এবং একজনের বয়স ১৮ বছর বলে ধারণা করছি আমরা।’
ব্যাংক ডাকাতি নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) আহম্মদ মুঈদ। তিনি বলেন, ‘জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর কলে ব্যাংকে ডাকাতি চেষ্টা ও জিম্মির তথ্য পেয়ে আমরা দ্রুত ঘটনাস্থলে যাই। আমরা নানাভাবে তাদের বুঝিয়ে আশ্বস্ত করেছি। প্রথমে আমরা তাদের কাছ থেকে অস্ত্রগুলো নিয়ে নিই। পরে তাদের নানাভাবে বুঝিয়ে পুলিশের জিম্মায় নিই।’
আটকের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে তিনি জানান, তারা কোনো চলচ্চিত্র বা ভিডিও গেমস দেখে একটি ফ্যান্টাসিতে ভুগে এই কাজ ঘটিয়েছে। তারা ১৮ লাখ টাকা ব্যাগে নিয়েছিল। এই টাকা দিয়ে একজন রোগীকে সাহায্য করার কথা জানিয়েছে। পাশাপাশি এই টাকা দিয়ে তাদের আইফোন কেনার পরিকল্পনা ছিল। গ্রেপ্তার তিনজনের মধ্যে দুজন কেরানীগঞ্জ ও আরেকজনের বাড়ি গোপালগঞ্জে বলেও জানা গেছে বলে জানান ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার।