অন্তর্র্বর্তী সরকারের বেসামরিক বিমান ও পর্যটন এবং ভূমি উপদেষ্টা এএফএম হাসান আরিফ (৮৩) আর নেই। গতকাল শুক্রবার রাজধানী ঢাকার ল্যাবএইড হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। উপদেষ্টা হাসান আরিফের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তার সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) মো. আবেদ চৌধুরী। তিনি স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়ে, অসংখ্য আত্মীয়স্বজন, সহকর্মী ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
এর আগে উপদেষ্টা হাসান আরিফের ছেলে মুয়াজ আরিফ গণমাধ্যমকে জানান, তার বাবা দুপুরের খাবার খেতে বসে হঠাৎ করে মেঝেতে পড়ে যান। এরপর তাকে রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। তবে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এএম শামীম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘হাসান আরিফকে বেলা ৩টার দিকে হাসপাতালে আনা হয়। হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে। হার্ট অ্যাটাকের কারণে তার মৃত্যু হতে পারে। হাসপাতালে আসার পর চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।’ হাসান আরিফের মৃত্যুর খবর পেয়ে মিসরের রাজধানী কায়রো থেকে ফেরা প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সরাসরি হাসপাতালে ছুটে যান। এ ছাড়া পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও গৃহায়ন ও গণপূর্ত, শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এএসএম সালেহ আহমেদ, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ হাসপাতালে ছুটে যান।
এদিকে গতকাল শুক্রবার বাদ এশা ধানমন্ডি ৭ নম্বর বায়তুল আমান মসজিদে উপদেষ্টা এএফ হাসান আরিফের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। তার দাফনের বিষয়ে রিজওয়ানা হাসান জানান, উপদেষ্টা হাসান আরিফের মেয়ে কানাডায় আছেন। প্রথমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল তার জন্য অপেক্ষা করা হবে। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। তাই শনিবার সকালে হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে দ্বিতীয় দফা জানাজা শেষে বাদ জোহর মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হবে।
হাসান আরিফের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বিবৃতিতে আইনজীবী হিসেবে হাসান আরিফের ভূমিকার কথা স্মরণ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেছেন, ‘হাসান আরিফ একজন উজ্জ্বল আইনজীবী হিসেবে এবং ভিন্নমতাবলম্বী, ভিন্নমতের কণ্ঠস্বর ও আমাদের সমাজের প্রান্তিক মানুষের মানবাধিকার রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকার জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।’
এ ছাড়া শোক প্রকাশ করেছেন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ওয়াহিদ উদ্দিন আহমেদ, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল, তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজ সম্পাদক এবং রেল মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এএসএম সালেহ আহমেদসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টারা।
এদিকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক শোক বার্তায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘হাসান আরিফের মৃত্যুতে তার শোকাহত পরিবার-পরিজনদের মতো আমিও গভীরভাবে সমব্যথী। তিনি দেশের একজন অভিজ্ঞ, নামকরা ও বিশিষ্ট আইনজীবী হিসেবে সর্বমহলে সুপরিচিত ছিলেন। আইনজীবী হিসেবে তিনি তার ন্যায়নীতি থেকে কখনোই বিচ্যুত হননি। তার মৃত্যুতে দেশে গণতন্ত্রে উত্তরণে এক শূন্যতা সৃষ্টি হলো।
এ ছাড়া হাসান আরিফের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে বিএনপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, নাগরিক ঐক্য, গণসংহতি আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল।
গত ৮ আগস্ট গঠিত অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকারে প্রথমে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব পেয়েছিলেন হাসান আরিফ। পরে তাকে ভূমি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
হাসান আরিফ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী। তিনি ১৯৭০ সাল থেকে আইন পেশার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ২০০১ সালের অক্টোবর থেকে ২০০৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তিনি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০০৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়, ভূমি এবং ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ছিলেন।
এএফ হাসান আরিফ ১৯৪১ সালে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপর স্নাতক এবং কলকাতা বিশ^বিদ্যালয় থেকে এলএলবি ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।
হাসান আরিফ তার কর্মজীবন শুরু করেন ১৯৬৭ সালে ভারতের পশ্চিম বাংলার কলকাতা হাইকোর্ট থেকে। এরপর ১৯৭০ সালে তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং হাইকোর্টে আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন।
এর আগে হাসান আরিফ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আইন উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ, সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ, বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এবং গ্রামীণফোন বাংলাদেশ। তিনি বর্তমানে ঢাকেশ^রী জাতীয় মন্দির কমপ্লেক্সের উপদেষ্টা।