নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে তল্লাশির জন্য পুলিশের চেকপোস্টে থামানো মোটরসাইকেলে বেপরোয়া গতির প্রাইভেট কারের ধাক্কায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। তার নাম মুহতাসিম মাসুদ (২২)। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন মুহতাসিমের সঙ্গে থাকা তার আরও দুই সহপাঠী। গত বৃহস্পতিবার রাত ৩টার দিকে ঢাকার কাছের পূর্বাচল উপশহরের রূপগঞ্জ অংশের ৩০০ ফুট সড়কে (কুড়িল-কাঞ্চন সড়ক) এ ঘটনা ঘটে।
পুলিশ বলছে, মোটরসাইকেলে ধাক্কা দেওয়া প্রাইভেট কারটি সাবেক এক সেনা কর্মকর্তার, চালাচ্ছিলেন তার ছেলে। দুর্ঘটনার পর প্রাইভেট কারটি জব্দ করে তল্লাশি করা হলে এক ক্যান বিয়ার ও মদের একটি খালি বোতল পাওয়া যায়। প্রাইভেট কারটির চালকসহ তিন আরোহীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
নিহত মুহতাসিম মাসুদ বুয়েটের সিএসই ডিপার্টমেন্টের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গার মাসুদ মিয়ার ছেলে। আর তার দুই আহত সহপাঠী হলেনÑ কুমিল্লা সদরের মফিজুর রহমান খানের ছেলে মেহেদী হাসান খান (২১) এবং ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার তপন কুমার সাহার ছেলে অমিত সাহা (২২)। তারা দুজনই একই বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র।
সহপাঠী ফাইয়াজ বলেন, নিহত মুহতাসিমের বাসা রাজধানীর কলাবাগানের গ্রিনরোডে। আর আহত অমিত ও মেহেদী হাসান বুয়েটের আহসানউল্লাহ হলে থাকেন। তারা তিনজন বৃহস্পতিবার রাতে একটি মোটরসাইকেলে ৩০০ ফুট সড়ক এলাকায় ঘুরতে যান। সেখানে একটি প্রাইভেট কার তাদের মোটরসাইকেলে ধাক্কা দেয়। এতে তিনজনই গুরুতর আহত হন। পরে পথচারীরা তাদের কুর্মিটোলা হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মুহতাসিমকে মৃত ঘোষণা করেন।
মাসুদ মিয়া ও রাইসা সুলতানা দম্পতির একমাত্র ছেলে সন্তান ছিলেন মুহতাসিম। এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে সংসারে দুই সন্তানের পড়াশোনাকেই সবচেয়ে গুরুত্ব দিতেন মা-বাবা। গতকাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে অ্যাম্বুলেন্সে করে মুহতাসিমের মরদেহ নেওয়া হয় গ্রিনরোডের ওই বাসায়। সেখানে আত্মীয়স্বজনের কাঁধে ভর করে একমাত্র ছেলেকে শেষবারের মতো দেখতে অ্যাম্বুলেন্সের সামনে আসেন রাইসা সুলতানা। মুহতাসিমের মুখের ওপর থেকে কাপড় সরাতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। আত্মীয়স্বজনদের কোনো সান্ত¡নাই তাকে শান্ত করতে পারছিল না। পরে একই অ্যাম্বুলেন্সে করে লাশ দাফনের জন্য মিরপুরের দিকে নেওয়া হয়। তখন কান্নাজড়িত কণ্ঠে ছেলেকে শেষ বিদায় দিয়ে মা রাইসা সুলতানা বলেন, ‘বাবা তুমি শান্তিতে ঘুমাও। আবার আমাদের দেখা হবে।’
এ দুর্ঘটনায় একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে শোকে মুহ্যমান মুহতাসিম মাসুদের বাবা মাসুদ মিয়াও। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ে সহকারী রেজিস্ট্রার পদে চাকরি করেন। অ্যাম্বুলেন্সে ছেলের লাশের পাশে বসে মাসুদ মিয়া বলেন, পুলিশের তল্লাশিচৌকিতে ছেলের মোটরসাইকেল থামিয়ে কাগজপত্র চাওয়া হয়। মোটরসাইকেল থেকে নেমে মুহতাসিম কাগজপত্র বের করছিল। ঠিক তখনই মদ্যপ অবস্থায় চালিয়ে এসে তার ছেলেকে চাপা দেয় প্রাইভেট কারের চালক। মাসুদ মিয়া বলেন, ‘সাবেক সেনা কর্মকর্তার ছেলে আমার ছেলেকে হত্যা করেছে। আমি ছেলে হত্যায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের সহকারী সুপার (গ সার্কেল) মেহেদী ইসলাম জানান, এ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার ও প্রাইভেট কারটি জব্দ করা হয়েছে। গ্রেপ্তাররা হলেনÑ মুবিন আল মামুন (২০), তার বন্ধু মো. মিরাজুল করিম (২২) ও আসিফ চৌধুরী। প্রাইভেট কারটি চালাচ্ছিলেন মুবিন আল মামুন, তিনি সেনাবাহিনীর সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহ আল মামুনের ছেলে। গাড়িটির রেজিস্ট্রেশনও সাবেক ওই সেনা কর্মকর্তার নামে। এ ঘটনায় সড়ক পরিবহন আইনে রূপগঞ্জ থানায় মামলা করেছেন নিহতের বাবা মাসুদ মিয়া।
মামলার এজাহারে বলা হয়, বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে বাসা থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হন বুয়েট ছাত্র মুহতাসিম মাসুদ। পরে তার দুই বন্ধুসহ ৩০০ ফুট সড়কে বেড়াতে যান। সেখানে নীলা মার্কেটে তারা রাতের খাবার খান। রাত আনুমানিক ৩টার দিকে বাসায় ফেরার সময় নীলা মার্কেটের অদূরে একটি পুলিশ চেকপোস্টে তাদের থামানো হয়। ওই সময় বেপরোয়া গতির একটি গাড়ি চেকপোস্ট অতিক্রম করে বুয়েট ছাত্রদের মোটরসাইকেলটিকে ধাক্কা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান মুহতাসিম মাসুদ। আহত হন বাকি দুজন। ঘটনার পর প্রাইভেট কার তল্লাশি করে এক ক্যান বিয়ার ও একটি খালি মদের বোতল পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে মামলার এজাহারে।
সহকারী পুলিশ সুপার মেহেদী ইসলাম বলেন, গ্রেপ্তার তিনজনকে ডোপ টেস্টের (মাদক পরীক্ষা) জন্য পাঠানো হয়। তার মধ্যে দুজন ডোপ টেস্টে পজিটিভ হয়েছে। গাড়ি চালানোর সময় তিন আসামির মধ্যে দুজন মদ্যপ ছিলেন। গতকাল দুপুরে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতালে তাদের ডোপ টেস্ট করা হয়।
জেলার সিভিল সার্জন ডা. এএফএম মশিউর রহমান বলেন, ‘ওই দুজনের ডোপ টেস্টের পরীক্ষার ফল পজিটিভ পাওয়া গেছে। তারা অ্যালকোহল নিয়েছিল। এ বিষয়ে রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে।’
নারায়ণগঞ্জ কোর্ট পুলিশের পরিদর্শক কাইউম খান জানান, গ্রেপ্তার এ তিনজনকে রবিবার (আগামীকাল) আদালতে তোলা হবে। গ্রেপ্তার তিনজনই শিক্ষার্থী।
এদিকে প্রাইভেট কার চাপায় বুয়েট শিক্ষার্থী মুহতাসিম মাসুদের মৃত্যুকে ‘হত্যাকাণ্ড’ দাবি করে দায়ীদের সর্বোচ্চ শাস্তিসহ ছয় দফা দাবি জানিয়েছেন সহপাঠীরা। গতকাল শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর পলাশীর মোড় এলাকায় সংবাদ সম্মেলন করে এসব দাবি তুলে ধরা হয়। এ সময় শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘আমরা আমাদের ভাইয়ের হত্যার সুষ্ঠু ও অতিসত্বর বিচার চাই; যেকোনো মূল্যে ক্ষমতার বিপরীতে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা হোক। অতীতেও দেখা গেছে, অপরাধী যদি প্রভাবশালী হয়, তাহলে বিভিন্নভাবে প্রভাব খাটিয়ে, ভিকটিমের পরিবারকে ভয়ভীতি দেখিয়ে, হুমকি-ধমকি দিয়ে, ভিকটিমের পরিবারকে মামলা না করার জন্য চাপ প্রয়োগ করে। আবার প্রাথমিকভাবে মামলা হলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন ধাপে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রভাব খাটায় কিংবা আরও নানাভাবে ছাড় পেয়ে যায়। আমাদের সহপাঠীর মৃত্যুতে এটা আমরা হতে দিতে পারি না।’
বুয়েট শিক্ষার্ক্ষীদের দাবিগুলো হলো যেকোনো মূল্যে এই ‘হত্যাকাণ্ডের’ সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা; আহতদের চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয়ভার বিবাদী পক্ষকে বহন করতে হবে; নিহত মাসুদের পরিবারকে যথোপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে বিবাদী পক্ষকে বাধ্য করতে হবে; তদন্তে কাজে বাধা দেওয়ার চেষ্টা হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে; আহতদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর বিষয়ে বুয়েট কর্র্তৃপক্ষকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে হবে; সড়ক দুর্ঘটনার কারণে যাতে আর কারও প্রাণ না ঝরে, সেজন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।