পাসপোর্ট সমস্যা দূর হোক

সারা বিশ্বেই পাসপোর্টের প্রচলন রয়েছে। এই পাসপোর্ট বিভিন্ন সময় বিবর্তিত হয়েছে। সেই হিসেবে বাংলাদেশের পাসপোর্টের ধরনও পাল্টেছে। একাত্তরে স্বাধীন হওয়ার পর দেশে হাতে লেখা পাসপোর্ট চালু হয়েছিল। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে এখন পাসপোর্ট আধুনিক হয়েছে। এই আধুনিক ভার্সন ই-পাসপোর্ট। ন্যাশনাল ভোটার আইডি কার্ডে যে স্মার্টকার্ড দেওয়া হয়, সেটিতে যেমন চিপ থাকে, ই-পাসপোর্টেও তাই করা হয়েছে। সেই চিপে একটি ইলেকট্রনিক ডেটাবেজ যুক্ত রয়েছে। সেই ডেটাবেজে পাসপোর্ট বাহকের তিন ধরনের ছবি, দুই হাতের আঙুলের ছাপ ও চোখের আইরিশ থাকে। ফলে পাসপোর্টধারী যে দেশেই ভ্রমণ করতে যাক, সে দেশের কর্তৃপক্ষ খুব সহজেই অল্প সময়ে পাসপোর্টের মাধ্যমে বাহক সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য জানতে পারেন। কিন্তু এমআরপিতে সেই সুযোগ নেই।

বিশে^র ১১৯তম এবং দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ই-পাসপোর্ট যুগে প্রবেশ করেছে ২০২০ সালের ২২ জানুয়ারি। ই-পাসপোর্টের এই সময়েও আমাদের দেশ চলছে সেই এমআরপির সময়কে ধরে। এর কারণ আসলে কী? সমস্যা কোথায়! এ বিষয়ে শনিবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। শিরোনামে বলা হচ্ছে, ‘ই-পাসপোর্টের যুগেও এমআরপি’। জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশ ২০২৫ সাল পর্যন্ত মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (যন্ত্রপাঠ্য পাসপোর্ট বা এমআরপি) সেবা বহাল রাখতে চাইছে। ডিজিটালাইজেশনের সুবিধা নিতে চাচ্ছে না বাংলাদেশ। অন্যদিকে এমআরপি যথেষ্ট ব্যয়বহুল সেবাও বটে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই ‘ব্যয়বহুল সেবা’কে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কেন টেনে নেওয়া হচ্ছে! এখানে কি কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য রয়েছে নাকি পুরোটাই বাস্তবসম্মত সমস্যা? 

সৌদি আরব, কাতার, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, লেবানন প্রভৃতি দেশে নানা পেশায় নিয়োজিত প্রায় দুই লাখ বাংলাদেশি এ বছরের মাঝামাঝি পাসপোর্ট-জটিলতায় পড়েছেন। জন্মসনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টে তথ্যের বিভিন্নতা থাকায় ই-পাসপোর্ট করতে পারছেন না তারা। ‘পাসপোর্ট’ মূল দালিলিক প্রমাণ হিসেবে গ্রাহ্য হওয়ায় অনেকে বিদেশে বৈধভাবে থাকার সুযোগ হারাচ্ছেন। এমআরপি থাকলে ই-পাসপোর্ট করার সুযোগ পাবেন প্রবাসী শ্রমিকরা। ওয়ার্ক পারমিট-সংক্রান্ত জটিলতায় পড়তে হবে না তাদের। তারপরও ব্যয়বহুল সেবাকে দীর্ঘায়িত করার কারণ অনেকটাই রহস্যজনক। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন সংকট প্রকট হওয়ায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং পাসপোর্ট অধিদপ্তর ও অংশীজনদের নিয়ে গত ৩ ও ১০ ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে মালয়েশিয়া, কাতার ও সৌদি আরবের কয়েকটি মিশনে পাসপোর্ট-জটিলতার কথা বলা হয়েছে। সেসব মিশন জানিয়েছে, পাসপোর্ট-জটিলতায় শ্রমিকদের ফেরাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে শ্রমিকরা এআরপিকেই মূল দালিলিক প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেন। তাদের অনেকের জাতীয় পরিচয়পত্র নেই, নেই পাসপোর্টের সঙ্গে সামঞ্জস্য। জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে মিল রেখে পাসপোর্ট করতে গেলে কাজ করার অনুমতি থাকবে না। বিশাল জনগোষ্ঠী কর্মহীন হয়ে পড়বে, রেমিট্যান্স আসা বন্ধ হয়ে যাবে। এসব ক্ষেত্রে জন্মসনদই ভরসা। আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের ডিজি নূরুল আনোয়ার জানান, মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৮ সালে শেষ হয়ে গেছে। এর যন্ত্রপাতি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়বহুল ও জটিল। এ প্রকল্প চালু রাখা কঠিন। মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের প্রবাসী ও শ্রমিকদের পাসপোর্ট নবায়ন প্রসঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেছিলেন, ‘বিষয়টি আমরা অবগত। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র সচিব, পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা জানিয়েছেন, পাসপোর্ট ছাপানোর জন্য ফয়েল পেপার আনা হচ্ছে। আশা করছি, ১০ ডিসেম্বর থেকে পাসপোর্ট পৌঁছানোর কাজ শুরু হবে।’ হয়েছে কি? আজ ২২ ডিসেম্বর। এতদিনে অধিকাংশ দেশে পাসপোর্ট পৌঁছে যাওয়ার কথা। যেসব প্রবাসী শ্রমিক পাসপোর্ট জটিলতায় রয়েছেন, তাদের সমস্যাটি আন্তরিকতার সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। অতিদ্রুত সমস্যা সমাধানে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া না হলে, জটিলতা আরও বাড়বে। প্রবাসীদের এই সমস্যা সমাধানের জন্য সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করা এখন মূল দায়িত্ব। স্ব স্ব দেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোকে এ ব্যাপারে আন্তরিক হওয়ার আহ্বান জানাই।