মধ্যবিত্ত। কথাটা বললেই আমাদের সামনে কোন চিত্র ভেসে ওঠে? সংজ্ঞা অনুসারে বিত্ত বা সম্পদে যারা মধ্য শ্রেণিতে বসবাস করেন তাদেরই বলা হয় মধ্যবিত্ত। তবে, কেবল অর্থবিত্তের পরিমাণই নয়, সামাজিক, রাজনৈতিক অবস্থান দিয়েও মধ্যবিত্ত নির্ণয় করা হয়। যে কারণে, মধ্যবিত্ত ব্যাপারটা কেবল আর্থিক অবস্থা নয় বরং একটা জীবনবোধের ধারণা।
এই জীবনবোধটা আসলে কী রকম? মধ্যবিত্ত বলতেই আমাদের চোখের সামনে যা ভেসে ওঠে তা হচ্ছে এই মানুষগুলো একটা ন্যূনতম পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষা অর্জন করবে, পড়ালেখা করাকে জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায় বলে ভাববে যা দিয়ে বিত্ত ও সামাজিক মর্যাদা দুই-ই অর্জন করা যাবে। পোশাকে, চলনে, খাদ্যাভ্যাস, সামাজিকতা এ সবেই একটা সীমিত কিন্তু পরিপাটি ছাপ থাকবে। সর্বোপরি, একটা নীতিবোধ থাকবে। বইপুস্তক ও সমাজ থেকে পাওয়া নৈতিকতার বাহক হিসেবে মধ্যবিত্ত গৌরব করে। এ ব্যাপারটা দিয়ে সে দরিদ্র ও ধনীদের থেকে নিজেকে পৃথক ভাবার শ্লাঘা অনুভব করে। যদিও অর্থবিত্ত উপার্জনের টানটা সবসময়েই তার থাকে, সামাজিক সোপান বেয়ে সে ওপরে উঠতে চায়, কিন্তু নৈতিকতার পরাকাষ্ঠা হয়ে থাকার প্রবল সামাজিক ও মানসিক টানকেই সে সবচেয়ে শক্তিশালী ভাবে। সে ভাবে, নিম্নবিত্তের হারানোর কিছু নেই, আর উচ্চবিত্তের বিত্ত থাকলেও তার নীতি নেই, সে বড় দুর্বিনীত, অশ্লীল ও কদর্য তার জীবনযাপন। ফলে, ঐ কথাটা সে মনে মনে আউড়ায় উত্তম নিশ্চিন্তে চলে অধমের সাথে/ তিনিই মধ্যম যিনি চলেন তফাতে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে দুনিয়া জুড়ে মধ্যবিত্তের উত্থান দেখা যায়। কলোনিগুলো ভেঙে নতুন নতুন দেশ স্বাধীন হচ্ছে। দুনিয়া জুড়ে তখন নতুন আশা। শিক্ষার বিস্তার, প্রযুক্তির উন্নয়ন, বিশ্বায়ন মিলিয়ে নতুন দুনিয়ার স্বপ্ন। বিত্তে মাঝারি হলেও আশায় বড় মধ্যবিত্ত এই স্বপনের সারথি হয়ে ওঠে। মধ্যবিত্তের সম্পদ ছিল তার শিক্ষাদীক্ষার প্রতি অনুরাগ, তা ব্যবহার করে সামাজিক সোপান বেয়ে উন্নতি। তা করতে গিয়ে মধ্যবিত্ত নিজের মতো কবিতা, গান, সংস্কৃতির সূচনা করে এবং অন্তত দেখনদারী নৈতিকতার কারইে হলেও সেই সবে মানবমুক্তি, অশুভের সঙ্গে লড়াইয়ে জেতা, নন্দনের মতো বিষয় ছিল মুখ্য। শিল্পবিপ্লবের আগের যুগে এসব করার জন্য পৃষ্ঠপোষকতা লাগত, ফলে সেসব শিল্প জনতার জন্য উন্মুক্ত ছিল না। অন্যদিকে, মধ্যবিত্তের উত্থানের পর এ ব্যাপারগুলো গণচেহারা পায়, কারই গণ-অংশগ্রহণ না থাকলে মধ্যবিত্ত মডেলের এই চর্চা করা সম্ভব না। ফলে, অবধারিতভাবেই নিম্নবিত্তকেও সে এই লড়াইয়ে অংশ নিতে কেবল উদ্বুদ্ধ করে তাই না, রীতিমতো সমাজ পরিবর্তনের উপায় হিসেবেই একে ধরে নেয়। বাংলাদেশের জন্মের মূল জ্বালানিও এই আকাক্সক্ষা। এককালের ভূমিহীনরা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত হয়ে, ভূমিজ এলিটদের থেকে নিজেদের অধিকার বুঝে নিতে চায়। রক্ষণশীল এলিটরা ধর্মকে হাতিয়ার বানালেও, মধ্যবিত্তের রাজনৈতিক দর্শনকেই নিম্নবিত্তরা অধিকতর আপন ভাবেও। মধ্যবিত্ত আর তফাতে চলে না। কিন্তু, কয়েক দশকে এর বড়সড় পরিবর্তন হয়।
সে সময়ের মধ্যবিত্তের রাজনৈতিক দর্শনে নেতৃত্ব দেওয়ার বড় কারণ ছিল নিম্নবিত্তের মতো তাকে প্রতিদিনের খাবারের চিন্তা করতে হতো না। শিক্ষিত মানুষ, মাসকাবারি চাকরি, মাস গেলে মোটামুটি খেয়ে-পরে চলার একটা নিশ্চয়তা এই ছিল মধ্যবিত্তের সাধারণ একটা ছবি। উচ্চবিত্তের মতো বিলাসী জীবন না কাটাতে পারলেও পাতে ভাত-মাছটা নিয়মিতই ছিল। এ কারণেই তারা ছিলেন বিত্তের তালিকার মধ্যে। ধীরে ধীরে, অবশ্য বিশ্ব জুড়েই অবস্থার পরিবর্তন হয়, বাংলাদেশে এর প্রভাব পড়ে। মধ্যবিত্ত এক সময় মাছেভাতে বাঙালি এই আয়েশ ছেড়ে ডালভাতে বাঙালি হয়ে পড়ে। আর এখন আর্থিক বৈষম্য আরও প্রকট হতে থাকায় মধ্যবিত্ত এক সময় ডালভাত জোগাড় করতেও হিমশিম খাওয়া শুরু করেছে। মধ্যবিত্ত শব্দটিই চিড়েচ্যাপ্টা হয়ে হারিয়ে যাওয়ার জোগাড়।
বাংলাদেশে প্রায় তিন বছর ধরে গড় মজুরির চেয়ে গড় মূল্যস্ফীতি বেশি। বাজারের তালিকা প্রায় অর্ধেকে নেমেছে অধিকাংশ পরিবারে। পর্যাপ্ত খাবার কিনতে না পারায় অধিকাংশ পরিবারই আছে পুষ্টিহীনতার ঝুঁকিতে। বিশেষ করে এটি প্রভাব ফেলছে শিশুদের পুষ্টিতে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, ২০২২ সালের জানুয়ারিতে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ। আর মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ৯২ শতাংশ। পরের মাস ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ; মজুরি বেড়েছিল ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। এরপর থেকে মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি বৃদ্ধির হার কম হওয়ার তথ্য দিচ্ছে বিবিএস। সবশেষ নভেম্বর মাসে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশ। আর জাতীয় মজুরি হার ছিল ৮ দশমিক ১০ শতাংশ। এর মানে মূল্যস্ফীতি যে হারে বেড়েছে, মজুরি সেই হারে বাড়েনি।
আয়ের চেয়ে ব্যয় বাড়ায়, শিশুসহ মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যদের খরচ কমাতে হচ্ছে, এমনকি খাবার কমিয়ে দিতে হচ্ছে। পাত থেকে মাছ-মাংস তো কমে গেছেই, শীতের ভরা মৌসুমে শাক-সবজি পর্যন্ত নিয়মিত উপযুক্ত পরিমাণে কিনতে পারছেন না স্বল্প আয়ের চাকরিজীবীরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, এভাবে মানিয়ে চলার, কম খাওয়ার দীর্ঘস্থায়ী বিরূপ প্রভাব আছে। দীর্ঘসময় যথাযথ ক্যালরির অভাব মানুষের কর্মক্ষমতা ও স্বাস্থ্যকে ধ্বংস করে দেয়। সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ে শিশুদের ওপর। তারা একদমই সঠিকভবে বেড়ে ওঠে না।
ফলত, মধ্যবিত্ত আদতে নিম্নবিত্তের মতোই টিকে থাকা নিয়েই সংশয়ে পড়ে গেছে। যেই নিরাপত্তার কারণে সে সংস্কৃতি আর রাজনীতিতে রাজ করতে পারত সেই নিরাপত্তার চাদর উবে গেছে। বিশ্ব জুড়ে নিও-লিবারেল জোয়ার, রাজনীতিতে লিবারেলদের ব্যর্থতা মধ্যবিত্ত শ্রেণিটিকেই সংকটের মুখে ফেলে দিয়েছে। এর ফলে, তার সেই ধীরস্থির, স্থিতধি অবস্থা নেই। সংস্কৃতি, সামাজিকতায় পরিপাটি ভাবটা টিকিয়ে রাখার মতো নিশ্চিত পাটাতন নেই। নিরাপত্তাহীনতার অনুভব তাকে অস্থির, অসহিষ্ণু করে তুলেছে। ফলত, যে কোনো প্রকারে টিকে থাকা, যে কোনো উপায়ে বিত্তের সংকুলান করাই উদ্দেশ্য। মধ্যবিত্তের পরিপাটি মধ্য অবস্থানের অভাবে উত্থান হচ্ছে উগ্র জনতুষ্টিবাদের।
মধ্যবিত্তের পাঁচালী কবিতায় শামসুর রাহমান বলেছিলেন, ‘একি মরীচিকা বিলাসে মজেছি/ যুগসন্ধ্যায় যৌথ ভ্রমে,/ বিস্মৃত কিছু প্রাণীর মতোই/ আমরা লুপ্ত হচ্ছি ক্রমে।’ কবি হয়তো রোমান্টিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কথাটা বলেছিলেন। তবে, তিনি হয়তো ভাবেননি এমন এক সময় আসবে যখন মধ্যবিত্ত আসলেই লুপ্ত হয়ে যাবে। এই লুপ্ত হওয়া সমাজের ভারসাম্যের জন্য বিরাট এক হুমকি।
লেখক : সাংবাদিক ও অনুবাদক
faiz@dhaka.net