দুই কোটির জীবিকায় টান

শিক্ষক শ্যামলী আক্তার। প্রায় ১৮ বছর ধরে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে থাকেন রাজধানীর মিরপুরের একটি ভাড়া বাসায়। সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং শেষ জীবনে একটু নির্ভার থাকার জন্য তাদের বহুদিনের স্বপ্ন ঢাকায় নিজেদের একটি ফ্ল্যাটের। রাজধানীতে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই পেতে বাবার বাড়ির সম্পত্তি বিক্রির টাকা আর স্বামী-স্ত্রীর সঞ্চয় জমা করেছেন। কিন্তু দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে গত দেড় বছর ধরে ফ্ল্যাট কেনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি তারা।

আলাপকালে শ্যামলী জানান, স্বামী ফরহাদ হোসেন বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা। দুজন মিলে ফ্ল্যাট কেনার জন্য টাকা জমিয়েছিলেন। কিন্তু এখন বিনিয়োগ করতে সাহস পাচ্ছেন না। গত দেড় বছরে অন্তত তিনটি ডেভেলপার কোম্পানির সঙ্গে কথা হয়েছে। দাম-দর ঠিক হলেও ফ্ল্যাট কেনা হয়নি। তিনি বলেন, ‘অর্থনীতিতে টালটামাল অবস্থা, কিছুদিন পরপর বাড়ছে জিনিসপত্রের দাম। এই মুহূর্তে ফ্ল্যাটে ইনভেস্ট (বিনিয়োগ) করলে টাকা আটকে যাবে। কোনো কারণে যদি ফ্ল্যাট না পাই, তাহলে আমাদের আর করার কিছু থাকবে না।’

একই ধরনের টানপড়েনে আছেন রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার হারুন শিকদার। জমানো টাকায় কয়েকবার ফ্ল্যাট কেনার পরিকল্পনা করেও বিনিয়োগের সাহস পাচ্ছেন না। আবার অনেকে ব্যাংক ঋণের জটিলতার কারণেও ফ্ল্যাট কেনার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্রেতা বা বিনিয়োগকারীদের এমন অনিশ্চয়তা ছাড়াও রাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ নিবন্ধন ফি, ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি, নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়া এবং রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষের (রাজউক) তৈরি ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) নিয়ে নানা জটিলতায় আবাসন খাত খাদের কিনারায় অবস্থান করছে। এমনিতেই গত কয়েক বছর ধরে এ খাতের ব্যবসায় মন্দা চলছে। এর ওপর সরকার পরিবর্তনের প্রভাবে আরও ধাক্কা লেগেছে। এতে জীবন-জীবিকায় টান পড়েছে অন্তত দুই কোটি মানুষের।

আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, জমি বিক্রেতা থেকে শুরু করে নির্মাণশ্রমিক (রাজমিস্ত্রি ও তাদের সহকারীরা) এবং ইট, বালু, রড, সিমেন্ট, টাইলস ও ফিটিংসসহ এ খাতসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কারখানায় প্রায় ৫০ লাখ মানুষ কর্মরত। এ অর্ধকোটি পরিবারের জীবিকা নির্মাণ খাতের ওপর নির্ভর করে। এখানে সমস্যা দেখা দিলে প্রতিটি পরিবারে গড়ে চারজন সদস্য হিসাবে অন্তত দুই কোটি মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে।

রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকায় ইট-বালু ও খোয়ার ব্যবসা করেন আমিনুল ইসলাম। আলাপকালে দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘এখন বেচাকেনা নেই বললেই চলে। এক বছর আগের তুলনা করলে বর্তমানে বিক্রি ৩০ থেকে ২৫ শতাংশে নেমে এসেছে।’

একই এলাকায় ইট-বালু ও খোয়ার ব্যবসা করেন সিদ্দিকুর রহমান। তিনিও ব্যবসায় মন্দার তথ্য তুলে ধরে জানান, তার প্রতিষ্ঠানে পাঁচজন শ্রমিক ছিল। তারা দিন-রাত কাজ করেও হিমশিম খেত। কিন্তু গত বছর বেচাকেনা কমে গেলে প্রথমে একজনকে বিদায় করে দেন। এ বছর আরও একজন শ্রমিককে কাজ থেকে বাদ দিয়েছেন। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, এখন অবশিষ্ট তিন শ্রমিককেও পুরো দিনের কাজ দিতে পারছেন না।

কেন মন্দা : গত বছর রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় কিস্তিতে একটি ফ্ল্যাট কেনেন তাসলিমা জাহান। দিয়েছিলেন ডাউন পেমেন্টও। কিন্তু কয়েক মাস ধরে তিনি কিস্তির অর্থ দিতে পারছেন না। তাসলিমা বলেন, ‘ব্যাংকে আমাদের কিছু জমানো অর্থ ছিল। এখন সেখান থেকে টাকা তুলতে পারছি না। ব্যাংকের লোকজন সময় চেয়েছে। এ অবস্থায় আমাদের পক্ষে ফ্ল্যাটের কিস্তি চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কারও কাছে যে বিক্রি করব, সেই ক্রেতাও পাচ্ছি না।’

ক্রেতাদের ভাষ্য, যেখানে ব্যাংক থেকে নিজের জমানো টাকাই পাওয়া যাচ্ছে না, সেখানে ব্যাংক লোন পাওয়ার কথা চিন্তা করা যায় না। যে কারণে ফ্ল্যাট কেনার চিন্তা থেকে সরে আসছেন অনেকেই। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যায় বৃদ্ধি পেয়েছে। যার প্রভাবে মানুষ আবাসন খাতে বিনিয়োগ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে না। রাজনৈতিক অস্থিরতা, কালো টাকা বিনিয়োগে ভয়, ড্যাপে নানা জটিল নিয়মকানুন এবং ব্যাংক খাতে অস্থিরতা আবাসন খাতে মন্দার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন তারা।

চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ফ্ল্যাট-প্লটে ১৫ শতাংশ কর দিয়ে ‘কালো টাকা’ বিনিয়োগের যে সুযোগ রাখা হয়েছিল, অন্তর্বর্তী সরকার সে বিষয়ে এখনো তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেনি। ফলে সব শ্রেণির ক্রেতার মধ্যে সংশয় কাজ করছে।

ফ্ল্যাট বিক্রি কমেছে ৫০ শতাংশ : গত এক বছরে ফ্ল্যাট বিক্রি অন্তত ৫০ শতাংশ কমেছে বলে দাবি করছে আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে ১৫ হাজারের কাছাকাছি ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি হয়েছে। এরপর ২০১৩ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত তা নেমে বছরে গড়ে ১২ হাজারের কিছু বেশিতে ঠেকে। ২০১৭-২০ পর্যন্ত ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রির সংখ্যা প্রতি বছর গড়ে ১৩ থেকে ১৪ হাজারে দাঁড়ায়। ২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত প্রতি বছর ১৫ হাজারের কাছাকাছি ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি হয়েছে। এরপর নির্মাণ উপকরণের মূল্য বেড়ে যায়, যার প্রভাব পড়তে দেখা যায় ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রিতে। একই সময়ে শুরু হয় করোনা মহামারী। ফের কমে যায় ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্ট কেনাবেচা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিক্রি হয় ১০ হাজারের কাছাকাছি এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সংখ্যাটি ১০ হাজারের নিচে নেমে যায়।

রিহ্যাবের প্রেসিডেন্ট মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেছেন, উচ্চ নিবন্ধন ব্যয় ও সুদের হার বৃদ্ধি এবং নতুন ত্রুটিপূর্ণ ও বৈষম্যমূলক ড্যাপের কারণে দেশে আবাসন খাতে বিনিয়োগে স্থবিরতা চলছে। এর ফলে কর্মসংস্থান বাড়ছে না। অসংখ্য মানুষ বেকার হয়ে পড়ছেন। নতুন প্রকল্প গ্রহণ করতে সমস্যা হওয়াতে তলানিতে এসে ঠেকেছে ফ্ল্যাট তৈরি। এই মুহূর্তে আবাসন খাতের কয়েকটা সমস্যার মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা নতুন বৈষম্যমূলক ড্যাপ। এজন্য দ্রুত ড্যাপ (২০২২-২০৩৫) সংশোধন করে ২০০৮-এর বিধিমালা কার্যকর করতে হবে।

রিহ্যাবের সিনিয়র সহসভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মৌচাক, মালিবাগ, মিরপুর, পুরান ঢাকাসহ ঢাকার বেশিরভাগ এলাকাতেই ফার (ফ্লোর এরিয়া রেশিও) কম। এ কারণে ডেভেলপাররা প্ল্যান পাস করানোর সাহস করছেন না। তাছাড়া এ ব্যবসার সঙ্গে ২৫০ থেকে ৩০০টি ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ব্যবসা জড়িয়ে আছে। নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে, লেবার কস্টও বেড়েছে, সব মিলিয়ে এ ব্যবসায় প্রভাব পড়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘পাশর্^বর্তী দেশের মতো ফ্ল্যাট নিবন্ধন ফি যদি ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা হয়, তাহলে বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বর্তমানে সব মিলিয়ে নিবন্ধন ফি ও অন্যান্য খরচ মিলে এটি ১৮ শতাংশে যায়। এটিকে সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনা উচিত।’

আবাসন ও নির্মাণ খাতে মন্দার ধাক্কা লেগেছে রড উৎপাদন শিল্পেও। গত আগস্ট মাসের পর থেকে কোম্পানি ভেদে রডের বিক্রি ৫০ শতাংশ কমেছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ) সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলন করে এ শিল্প টিকিয়ে রাখতে নীতি সহায়তা চেয়ে সরকারের কাছে দাবি জানায়। উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে বাজার মূল্যের অসংগতিতে ব্যবসা কমেছে বহু উদ্যোক্তার। ডলারের মূল্যবৃদ্ধিতে ইস্পাত উৎপাদনে খরচ বেড়েছে ৬৫ শতাংশ। পাশাপাশি গ্যাসের দামও বেড়েছে। একই অবস্থা সিমেন্ট, বালু, ইট-পাথরের ক্ষেত্রেও।

এদিকে আবাসন ব্যবসায় মন্দা কাটাতে আজ সোমবার থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ দিনের আবাসন মেলা আয়োজন করেছে রিহ্যাব। রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এবারের মেলায় ২২০টি স্টল থাকবে। তাছাড়া ৭টি গোল্ড স্পন্সর, ১৮টি কো-স্পন্সর, ১৮টি বিল্ডিং ম্যাটেরিয়ালস ও ১০ অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করবে। এবারের মেলায় অ্যাপার্টমেন্টের পাশাপাশি গৃহঋণ ও বাড়ি নির্মাণের প্রয়োজনীয় উপকরণ যাচাই করতে পারবেন ক্রেতারা। একই সঙ্গে মেলায় বুকিং দিলেই মিলবে নানা অঙ্কের ছাড় ও উপহার। এবারের মেলায় এক হাজার কোটি টাকার অ্যাপার্টমেন্ট ও প্লট বুকিং হবে বলে প্রত্যাশা করছেন আয়োজকরা।