হেনস্তার পর এলাকা ছাড়তে হলো মুক্তিযোদ্ধাকে

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের কুলিয়ারা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে রবিবার দুপুরে হেনস্তার শিকার হন বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই কানু (বীর প্রতিক)। এই সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশ জুড়ে সমালোচনা চলছে। এ ঘটনার পর লজ্জায় এলাকা ছেড়েছেন তিনি। হেনস্তাকারীরা জামায়াত শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে দাবি করেছেন তিনি। এদিকে মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হাই কানুকে মানহানির ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং। গতকাল সোমবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে এ কথা বলা হয়েছে।

প্রেস উইংয়ের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ঘটনা তদন্ত করে দোষী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার জন্য পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, আবদুল হাই হত্যাসহ ৯টি মামলার আসামি।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং সবাইকে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে।

এদিকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদর দপ্তরে বিজিবি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, ‘কিছু সংখ্যক দুষ্কৃতকারী সব জায়গায় রয়ে গেছে। যে দুষ্কৃতকারীরা মুক্তিযোদ্ধাকে হেনস্তা করেছে, তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে।’

মুক্তিযোদ্ধা কানুকে হেনস্তা : গত রবিবার দুপুরে উপজেলার কুলিয়ারা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে হেনস্তার শিকার হন বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই কানু। ওই ঘটনার ১ মিনিট ৪৬ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ওইদিন রাতে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

স্থানীয়রা বলছেন, মুক্তিযোদ্ধা কানু কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি মুজিবুল হকের রোষানলে পড়ে বিগত ৮ বছর এলাকায় যেতে পারেননি। বাড়িঘরে হামলা করাসহ একাধিক মামলা দেওয়া হয় তার বিরুদ্ধে।

রবিবার দুপুরে বাড়ির পাশের গ্রামে তাকে একা পেয়ে স্থানীয় অন্তত ১৫-২০ জন ব্যক্তি হেনস্তা করে গলায় জুতার মালা পরিয়ে দেয়। পরে তাকে লাঞ্ছিত করা হয়। তাদেরই একজন ঘটনার ভিডিও করে।

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওতে দেখা যায়, দুজন ব্যক্তি মুক্তিযোদ্ধার কানুর হাত টেনে সামনে নিয়ে যাচ্ছেন। কানুর গলায় রশি দিয়ে বাধা কয়েকটি জুতা দেখা যায়। তার আশপাশে ঘিরে ছিল আরও ১৫-২০ জন লোক। একপর্যায়ে কানু জুতার মালা সরিয়ে এলাকায় থাকার আকুতি জানালেও তাকে এলাকা ছাড়ার হুমকি দিতে থাকেন ঘিরে থাকা লোকজন।

ওই ব্যক্তিদের একজনকে বলতে শোনা যায় ‘এক গ্রাম লোকের সামনে মাফ চাইতে পারবেন কি না? তখন কানুকে দুই হাত ওপরে তুলে মাফ চাইতে দেখা যায়।

ঘটনার পর অসুস্থ অবস্থায় ওই মুক্তিযোদ্ধাকে ফেনীর একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘স্থানীয় প্রবাসী আবুল হাসেমের নেতৃত্বে অহিদ, রাসেল, পলাশসহ ১০ থেকে ১২ জন আমাকে একা পেয়ে জোর করে জুতার মালা গালায় দিয়ে ভিডিও করে। আমি বিগত সময়ে তাদের কোনো ক্ষতি করিনি।

থানায় অভিযোগ কেন দিতে চাইছেন না এই প্রশ্নে আব্দুল হাই কানু বলেন, ‘বিচার কার কাছে চাইব, মামলা দিয়ে আর কী হবে? এমন বাংলাদেশের জন্যই কী জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিলাম? যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সেই আবুল হাসেম বা অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।’

চৌদ্দগ্রাম থানার ওসি এটিএম আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘বীর মুক্তিযোদ্ধাকে যারা লাঞ্ছিত করেছে, তাদের বিষয়ে খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে। ৭৮ বছর বয়সী আব্দুল হাই কানুর বাড়ি চৌদ্দগ্রামের বাতিসা ইউনিয়নের লুদিয়ারা এলাকায়। তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। হেনস্তাকারীরাও একই এলাকার বাসিন্দা। ঘটনার পর ওই মুক্তিযোদ্ধা মোবাইল ফোনে বিষয়টি আমাকে জানিয়েছিলেন। তবে এ বিষয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন না বলেও জানিয়েছেন। রাতে ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ায় আবারও তাকে অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে। আমরা ঘটনায় জড়িতদের নাম-পরিচয় সংগ্রহ করছি। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এলাকা ছাড়লেন মুক্তিযোদ্ধা : মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই কানু নিরাপত্তাহীনতার কারণে এলাকা ছেড়েছেন বলে জানিয়েছেন। গতকাল বিকেলেই তিনি কুমিল্লা থেকে ফেনীতে চলে যান। গতকাল দুপুরে মোবাইল ফোনে আব্দুল হাই জানান, তিনি এখন ফেনীতে তার ছেলের সঙ্গে অবস্থান করছেন। মারধর করায় সেখানে চিকিৎসা নিয়েছেন। পুলিশ ও প্রশাসন নিরাপত্তা নিশ্চিত করলে চৌদ্দগ্রামে বাড়িতে ফিরবেন।

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আব্দুল হাই বলেন, দুপুরে তিনি ওষুধ কিনতে বাড়ির কাছের বাজারে গিয়েছিলেন। ওই সময় স্থানীয় জামায়াত কর্মী আবুল হাসেমের নেতৃত্বে ১০-১২ জন তাকে ধরে জুতার মালা পরিয়ে দেন। সেই সঙ্গে তাকে দ্রুত এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়।

আব্দুল হাইয়ের স্ত্রী রেহানা বেগম জানান, আত্মসম্মানে আঘাত পেয়েছেন তার স্বামী। এ কারণে ঘটনার পরপরই তিনি এলাকা ছেড়ে ফেনী চলে যান। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দুই দফায় তাদের বাড়িতে হামলা হয়। হামলাকারীরা তাদের এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য হুমকি দিয়েছিলেন।

অভিযোগের বিষয়ে চৌদ্দগ্রাম উপজেলা জামায়াতের আমির মো. মাহফুজুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, এ ঘটনার সঙ্গে স্থানীয় জামায়াতের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। প্রবাসী আবুল হাসেম আমাদের দলের কেউ না। তবে সমর্থক কিংবা অনুসারী হলেও হতে পারে। এ বিষয়ে আরও খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে সিলেটে এক অনুষ্ঠানে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেছেন, ‘আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াটা কোনো অবস্থাতেই যুক্তিসঙ্গত কাজ নয়। মুক্তিযোদ্ধাকে অসম্মান করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। যারা এ কাজ করেছে, সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।’

বীর মুক্তিযোদ্ধাকে লাঞ্ছিত করায় নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না ও সাধারণ সম্পাদক শহীদুল্লাহ্ কায়সার নিন্দা জানিয়েছেন। বিবৃতিতে বলা হয়, নিজের জীবনকে তুচ্ছজ্ঞান করে দেশকে স্বাধীন করার জন্য যারা রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, শত্রুর মোকাবিলা করে দেশ স্বাধীন করেছে ও বিশ্বের মানচিত্রে রচনা করেছে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। স্বাধীনতার ৫৩ বছরে এসে আজ যখন এদেশের জনগণ নতুনভাবে দেশ গড়ার দৃঢ় অঙ্গীকারবদ্ধ সেই সময়ে এসে মুক্তিযোদ্ধার প্রতি এমন অসম্মান আচরণ করা প্রকারান্তরে ‘৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাকে ভূলুণ্ঠিত করার শামিল। আমরা এই ঘৃণ্য, বর্বরোচিত, ন্যক্কারজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই এবং এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।

লাঞ্ছনায় জড়িতদের বহিষ্কার জামায়াতের : কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হাই কানুকে লাঞ্ছনার ঘটনাকে দুঃখজনক আখ্যায়িত করে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বহিষ্কার করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। একই সঙ্গে এ দুঃখজনক ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের হাতে সোপর্দ করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে দলটি।

গতকাল সোমবার জামায়াতে ইসলামী কুমিল্লা দক্ষিণ জেলার আমির অ্যাডভোকেট মু. শাহজাহান, জেলা সেক্রেটারি ড. সরওয়ার উদ্দিন ছিদ্দিকী, চৌদ্দগ্রাম উপজেলা আমির মু. মাহফুজুর রহমান ও উপজেলা সেক্রেটারি মু. বেলাল হোসাইন প্রদত্ত এক যুক্ত বিবৃতিতে এ কথা জানানো হয়।

তারা বিবৃতিতে বলেন, ‘আমরা মু. আবুল হাশেম, পিতা-মৃত আবদুল বারেক, সাং-কুলিয়ারা এবং মু. ওহিদুর রহমান, পিতা-মৃত শফিকুর রহমান, সাং-কুলিয়ারাসহ এ ঘটনায় যারা জড়িত তাদের শাস্তি দাবি করছি এবং জামায়াতে ইসলামীর শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও ভাব-মর্যাদা ক্ষুন্ন করায় সমর্থক হওয়া সত্ত্বেও তাদের জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কার ঘোষণা করছি।’