উচ্চ সুদেও ‘বিলাসী ঋণের’ ঊর্ধ্বগতি

দেশে টানা মূল্যস্ফীতির কারণে চিড়েচ্যাপ্টা মধ্যবিত্ত-নিম্ন আয়ের মানুষ। দুই বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দেশের পরিবারগুলোর আয় কমেছে। মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংকোচননীতির কারণে বড় প্রভাব পড়েছে ব্যাংক খাতে। বেশি সুদ দিয়েও আমানত টানতে পারছে না ব্যাংকগুলো। আমানতে টান পড়েছে ব্যাংকে। কিন্তু আমানত কমলেও ব্যাংকগুলোয় উচ্চ সুদেও বেড়েছে ঋণপ্রবাহ। বাড়ি-গাড়ি কিংবা এসি-ফ্রিজ কেনার ঋণে চলছে মহোৎসব। এক বছরের ব্যবধানে ভোক্তাঋণ বেড়েছে ৯ হাজার ১০৩ কোটি টাকা।

মূল্যস্ফীতি ঠেকাতে বারবার নীতি সুদহার (পলিসি রেট) বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে বেড়েছে সব ধরনের সুদহার। ভোক্তা ঋণেও ব্যাংকগুলোয় সুদের হার বেড়ে হয়েছে ১৫ শতাংশের বেশি। সাধারণত মানুষ অভিজাত পণ্য, বিলাসবহুল পণ্য ও পরিষেবার জন্য ঋণ নিয়ে থাকে। এ ছাড়া দৈনন্দিন নানা কাজে, অনুষ্ঠান, জমি বা বাড়ি-গাড়ি ক্রয়, বড় আয়োজন, ভ্রমণসহ নানা কাজে ভোক্তাঋণ নেয়। বিলাসী পণ্য কিনতে লোন দেওয়ার ক্ষেত্রেও ব্যাংগুলোর আগ্রহ বেশি। বাড়ি, গাড়ি, এসি, ফ্রিজ ইত্যাদি কেনার জন্য ঋণ বিতরণ বেড়েছে ব্যাংকগুলোর। অন্যদিকে শিক্ষা চিকিৎসার ক্ষেত্রে ঋণ বিতরণ কমেছে।

চলতি বছরের ২২ অক্টোবর নীতি সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ১০ শতাংশে পুনর্নির্ধারণ করা হয়। ২০২২ সালের মে মাসের পর থেকে ১১ বারের মতো নীতি সুদহার বাড়ানো হলো। নীতি সুদহার বাড়ানোর মূল উদ্দেশ্য হলো বাজারে অর্থের সরবরাহ কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি মনে করে, বাজারে অর্থের সরবরাহ বেশি এবং সে কারণে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, তাহলে অর্থপ্রবাহ কমাতে নীতি সুদহার বৃদ্ধি করে।

গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের শুরুতে ব্যাংক ঋণের সুদহার নির্ধারণে ‘স্মার্ট’ পদ্ধতি চালু করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই অর্থাৎ গত চলতি বছরের মে মাসে সে নীতি প্রত্যাহার করা হয়। সুদহার পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। পাশাপাশি নীতি সুদহার বাড়ানোয় বেড়ে যায় সব ঋণের সুদহার। তবে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের বড় প্রভাবও পড়েছে ব্যাংক খাতে। ব্যাংকগুলোর আর্থিক অনিয়মের তথ্য ও প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ পাওয়ার পর গ্রাহকদের আস্থা কমেছে। তিন মাসের ব্যবধানে ব্যাংক খাতে আমানত কমেছে প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। বিপরীতে একই সময়ে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ বেড়েছে প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া এক বছরের ব্যবধানেও আমানতের চেয়ে ঋণ প্রবৃদ্ধি বেশি দেখা গেছে। ঋণ বিতরণ বেড়েছে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৭৯১ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে মোট আমানতের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা, যা গত জুন পর্যন্ত থাকা ১৮ লাখ ৩৮ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকার তুলনায় ১৩ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা কম।

একদিকে আমানত কমছে, কিন্তু উল্টো ধারা ঋণ বিতরণে। সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ১৯ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা, যা জুন মাস পর্যন্ত ছিল ১৫ লাখ ৯৭ হাজার ১০১ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ২২ হাজার ৮১৬ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানেও আমানতের চেয়ে ঋণ বিতরণের প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।

উল্লেখযোগ্য ঋণ বেড়েছে ভোক্তাঋণে। তথ্য বলছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ভোক্তাঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৬১৩ কোটি টাকা। গত জুন মাসে এই খাতে স্থিতি ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসের এই খাতে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকারও বেশি।

এ ছাড়া এ খাতের ঋণ গত বছরের একই সময়ে স্থিতি ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার ৫১০ কোটি টাকা। সে হিসেবে এক বছরে এই খাতে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৯ হাজার ১০৩ কোটি টাকা। এসব ঋণের মধ্যে বাড়ি-গাড়ি, টিভি, ফ্রিজ, এসি অর্থাৎ বিলাসবহুল পণ্য কেনার জন্যই বেশি ঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকগুলো।

গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের অর্থনীতির যে অবস্থা, তাতে নতুন করে বিনিয়োগ খুব একটা হচ্ছে না। মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। ডলারেও অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। সবকিছুতেই একটা অস্থিতিশীলতা অনুভূত হচ্ছে। এখন তো আমানতের সুদের হার বেড়ে গেছে। এখন ব্যাংকগুলোকে তাদের বিনিয়োগ করতে হবে। এ কারণে ব্যাংকগুলো ভোক্তাঋণে ঝুঁকছে। এর মধ্যে উচ্চবিত্ত শ্রেণি বা উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণি তাদের জীবনমান বাড়ানোর জন্য ঋণের দিকে ঝুঁকছে। ব্যাংকগুলোও তাদের ঋণ দিচ্ছে। যদিও সত্যিকারার্থে এগুলো উৎপাদনশীল বিনিয়োগ নয়। তবে ব্যাংকগুলোর তো আয় করতে হবে। মুনাফা আয় না করতে পারলে তো গ্রাহকদের মুনাফা দিতে পারবে না। তাই ব্যাংকগুলো সেদিকেই আগ্রহী হচ্ছে।

তথ্যবিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাড়ি কেনার জন্য গত তিন মাসে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৬ হাজার কোটিরও বেশি। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে এই খাতে বিতরণ করা ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ৯১ কোটি টাকা। জুন পর্যন্ত এই খাতের বিতরণ করা ঋণ ছিল ২২ হাজার ৮০৫ কোটি টাকা। সে হিসেবে তিন মাসেই এই খাতের ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৬ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা। এ ছাড়া গত বছরের একই সময়ে এই খাতে ঋণ বিতরণের স্থিতি ছিল ২১ হাজার ৭৭৩ কোটি টাকা। সে হিসেবে এক বছরে বেড়েছে ৭ হাজার ৩১৮ কোটি টাকা।

শুধু বাড়ি কেনার জন্যই নয়, তিন মাসে ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার জন্যও ঋণ বিতরণ হয়েছে প্রায় ১৭০ কোটিরও বেশি। গত সেপ্টেম্বর শেষে কার, মোটরসাইকেল ইত্যাদি কেনায় ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের স্থিতি ছিল ৪ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা। জুন পর্যন্ত এই খাতের বিতরণ করা ঋণ ছিল ৪ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা। সে হিসেবে তিন মাসে এই খাতে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ১৭০ কোটি টাকা। এ ছাড়া গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে কার, মোটরসাইকেল ইত্যাদি কেনা বাবদ ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের স্থিতি ছিল ৩ হাজার ৪৭৮ কোটি টাকা। সে হিসেবে এক বছরের ব্যবধানে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৮৫৯ কোটি টাকা।

এদিকে যত দিন যাচ্ছে, আরও আধুনিক হচ্ছে মানুষ। একটা সময় ছিল যখন শুধু শহরে টিভি, ফ্রিজ ও এসির ব্যবহার দেখা যেত। এখন প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও এসব পণ্য নিয়মিত হয়ে যাচ্ছে। ঋণ করে মানুষ এসি, ফ্রিজ, কম্পিউটারসহ আধুনিক পণ্যের চাহিদা মেটাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, এক বছরের ব্যবধানে টিভি, ফ্রিজ, এসি, ফার্নিচার ইত্যাদি ভোগ্যপণ্য কেনার জন্যও ঋণ বিতরণ বেড়েছে। গত সেপ্টেম্বর শেষে এই খাতে ঋণ বিতরণের স্থিতি ছিল ৩৫ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৩৪ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা। এক বছরে এই খাতে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ১ হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘ভোক্তাঋণের প্রধান ক্ষেত্র হচ্ছে গৃহঋণ, ব্যক্তিগত ঋণ, গাড়িঋণ ও ক্রেডিট কার্ড ইত্যাদি। আমরা ভোক্তাঋণের পরিধি বাড়িয়ে চলছি। পেশাজীবীরা এ ধরনের ঋণ নিয়ে থাকেন। মানুষের উপার্জন ক্ষমতা বেড়ে যাওয়া ও জীবনমানের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভোক্তাঋণ প্রসারিত হচ্ছে।’

অন্যদিকে ঋণ বিতরণ কমেছে শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে। অনেক শিক্ষার্থী শিক্ষার ওপর ঋণ নিয়ে পড়াশোনার খরচ চালায়। কিন্তু এখন এসব খাতে ঋণ বিতরণে আগ্রহ কম দেখা গেছে ব্যাংকগুলোর। এ ছাড়া অনেকেই চিকিৎসার খরচ মেটানোর জন্যও ব্যাংক ঋণ নিয়ে থাকেন। তবে এই ঋণেরও প্রবণতাও কম দেখা গেছে। তথ্য বলছে, গত সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোয় শিক্ষার খরচ বাবদ নেওয়া ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৮ কোটি। তিন মাস আগেও অর্থাৎ গত জুন শেষেও যা ছিল ১ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা। তিন মাসে এই খাতে ঋণ কমেছে ৪৪১ কোটি টাকা। গত বছরের সেপ্টেম্বরে এই খাতে ঋণ স্থিতি ছিল ১ হাজার ২৪০ কোটি টাকা। এ ছাড়া চিকিৎসা খাতে গত সেপ্টেম্বরে চিকিৎসা বাবদ নেওয়া ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২২১ কোটি টাকা, যা তিন মাস আগেও ৩০৫ কোটি ছিল।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মুদ্রানীতি দিয়ে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা অনেক কঠিন। আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। অনেক করণীয় আছে, সেগুলা সমন্বয় না করে নীতি সুদহার-সুদহার বাড়িয়ে অর্থপ্রবাহ কমবে না, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ হবে না। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকে রিজার্ভ সমস্যার কারণে এলসি খোলার ক্ষেত্রে অনেক ধরনের নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিল। এখন রিজার্ভ কিছুটা স্বস্তিদায়ক হওয়ার ফলে এলসি খোলার ব্যাপারে তারা কিছুটা নমনীয়তা দেখাচ্ছে। আগে যেসব আমদানি নিয়ন্ত্রিত ছিল, সেখানে এলসি খোলা হচ্ছে। পণ্য আমদানি বাড়ছে। মানুষ চাহিদা মেটাতে এসব পণ্য কিনতে ঋণ নিচ্ছেন। তবে এসব পণ্য আমদানি বেড়ে গিয়ে যেন ডলারের ওপর চাপ না পড়ে, সে বিষয়টাও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের খেয়াল রাখা উচিত।