আইন অনুযায়ী সর্বশেষ আদম শুমারির পর এবং জাতীয় নির্বাচনের আগে সীমানা পুনর্নির্ধারণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নির্বাচনী এলাকাগুলোতে (আসন) ভোটারদের মধ্যে ভারসাম্য আনতে সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কিন্তু গত কয়েকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে পক্ষপাতদুষ্টতার অভিযোগ রয়েছে খোদ নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে। সীমানা পুনর্নির্ধারণে ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য (এমপি) ও মন্ত্রীদের তদবিরকেই প্রাধান্য দেওয়া হতো। সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন করে সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর পরামর্শ বা মতামত নিতে হবে। তা না হলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সীমানা নির্ধারণে পক্ষপাতদুষ্টতার পুরনো বিতর্ক নতুন করে সৃষ্টি হতে পারে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আসনগুলোর সীমানা পুনর্নির্ধারণের পদক্ষেপ নিয়েছে ইসি। এজন্য একজন নির্বাচন কমিশনারের নেতৃত্বে ইতিমধ্যে কমিটিও করা হয়েছে। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে এই কমিটির আলাপ-আলোচনার পর সীমানা পুনর্নির্ধারণের কাজ পুরোপুরি শুরু হবে বলে জানা গেছে। কী কী বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সীমানা পুনর্নির্ধারণ হবে সে বিষয়ে এখনো কোনো রূপরেখা না হলেও সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এবার অন্তত আগের মতো কোনো নির্দিষ্ট দলকে সুবিধা দেওয়ার জন্য সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হবে না।
তারা বলছেন, সীমানা পুনর্নির্ধারণে ভৌগোলিক অবস্থানকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি গুরুত্ব দিতে হবে ভোটার সংখ্যাকেও। ভোটার অনুপাতে সীমানা নির্ধারিত হলে অনেক জটিলতা ও সংকট কাটবে। কমবে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাব বিস্তারের সুযোগও।
২০০১ সালের আদম শুমারির পর নির্বাচনী এলাকার প্রথম সীমানা নির্ধারণ হয় ২০০৮ সালে। এটিএম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন ওই সময় ১৩৩টি নির্বাচনী এলাকায় ব্যাপক পরিবর্তন আনে। এরপর কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে তৎকালীন কমিশন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালে ৮৭টি আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে। আর নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন ২০১৮ সালে ২৫টি নির্বাচনী এলাকার সীমানায় পরিবর্তন আনে।
বিভিন্ন সময়ে এসব সীমানা নির্ধারণ নিয়ে অভিযোগ আনে রাজনৈতিক দলগুলো। এমনকি সরকারি দলের একাধিক সংসদ সদস্যও পক্ষপাতদুষ্টতার অভিযোগ আনেন কমিশনের বিরুদ্ধে। এখনো বেশ কিছু আসনের সীমানা নির্ধারণ নিয়ে অভিযোগের নিষ্পত্তি হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বচ্ছতা ও বাস্তবতার নিরিখে এসব সংসদীয় আসনগুলোর সংকট সমাধান করতে হবে।
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা : সুজনের সম্পাদক ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন প্রধান বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বিগত সময়গুলোতে সীমানা নির্ধারণে অসংগতি ছিল। সুস্পষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে নতুন করে সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা দরকার। সীমানা পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা, প্রতিনিধিত্ব, ভোটার সংখ্যার সমতা ও স্বচ্ছতা দরকার। সংসদীয় আসনগুলোতে ভোটার সংখ্যায় যত দূর সম্ভব সমতা আনতে হবে।
তিনি বলেন, ‘সীমানা নির্ধারণের বিষয়টি নিয়ে আমরা কতগুলো নীতিমালা দেব সরকারকে। সেই নীতিমালা অনুযায়ী যেন সীমানা নির্ধারণ করা হয়।’
জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক পরিষদের (জানিপপ) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ বলেন, “সীমানা নিয়ে পাবলিক ডিবেট (বিতর্ক) হতে হবে। আমেরিকায় একটা কনসেপ্ট আছে ‘জেরিমেন্ডারিং’ বা পক্ষপাতদুষ্টতা। অর্থাৎ কোনো দল বা ব্যক্তিকে সুবিধা দেওয়ার নিমিত্তে সীমানা সেভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় দেখেছি, নির্বাচনের ফল নির্দিষ্ট হয়ে গেছে সীমানা যেভাবে বণ্টন করা হয়েছে তার ওপর ভিত্তি করে। এ বিষয়টা নিয়ে পাবলিক ডিবেট করতে হবে। নির্বাচন কমিশন যদি শপথ ভঙ্গের কাজ করে সেটা নিয়ে কথা বলতে হবে। কিন্তু জেরিমেন্ডারিং বা পক্ষপাতদুষ্টের কোনো সুযোগ দেওয়া যাবে না।”
সংসদীয় আসনগুলোর সীমানা ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে যেমন ছিল তা পুনর্বহালের পক্ষে মত দেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০০৮- এর পর থেকে পরবর্তী তিনটা নির্বাচনে কেউ ভোট দিতে পারেনি। এই ভোটাররা তো অপেক্ষায় আছে। ফলে আগের সীমানায় নিয়ে গেলে ভালো হয়। এটাই আমাদের পর্যালোচনা। বরিশাল বিভাগে দুটো আসন কেটে নেওয়া হয়েছে। বরিশাল বিভাগে যদি দুটো আসন বেশি থাকত তাহলে আমরা আমাদের শরিকদের নিয়ে ভালো বন্দোবস্ত করতে পারতাম। এরকমটা আরও কিছু জায়গায় ২০০৮-এ হয়েছে। সেগুলো আবার ফিরিয়ে আনা নির্বাচন কমিশনের কাজ বলে মনে করি। এগুলো আগের জায়গায় ফেরত যাবে কি না, তা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সমীক্ষাও একটা আছে।’
এই বিএনপি নেতা আরও বলেন, ‘৩১ ডিসেম্বর নির্বাচন সংস্কার কমিশন তাদের প্রস্তাব জমা দেওয়ার কথা। এরপর হয়তো নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করবে। তাতে কাজটি আরও ভালো হয়। তাহলে সীমানা নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সহজ হবে।’
অন্যদিকে সংসদে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা চালুর তাগিদ দেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা মনে করি জাতীয় সংসদে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা চালু হওয়া দরকার। তাহলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সীমানা নির্ধারণ নিয়ে সংকট থাকবে না। যতদিন না পর্যন্ত সংখ্যানুপাতিক ব্যবস্থা প্রবর্তন হচ্ছে, ততদিন নির্বাচনী সীমানা নির্ধারণের জন্য প্রকাশ্য শুনানির ব্যবস্থা করার বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। এর আগে একটা নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। তারপর শুনানির ব্যবস্থা গ্রহণ করে স্বচ্ছ উন্মুক্ত ও কার্যকরভাবে সীমানা নির্ধারণের কাজ সম্পন্ন করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভোটার সংখ্যার ভিত্তিতে নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ করা। এ দৃষ্টিভঙ্গিটাকেই প্রধান ধরে এগোনো এখনকার জন্য ভালো বলে মনে হয়।’
এ প্রসঙ্গে বাম গণতান্ত্রিক জোটের শীর্ষ নেতা সাইফুল হক বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে বিভিন্ন নেতার জন্য কোন কোন এলাকা বা কোন কোন ইউনিয়ন যুক্ত করলে জেতা সহজ হবে, তা বিবেচনা করে অনেক সংসদীয় আসন ঠিক হয়েছে। এখন যে সরকার এসেছে তাদের রাজনৈতিক কোনো পক্ষপাত নেই। তাই তাদের উচিত হবে গণতান্ত্রিক একটা খোলামেলা আলোচনা করে যথার্থ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয় এমন একটা সংসদীয় আসন করা। এটার সঙ্গে সবার যুক্ত হওয়া দরকার। সবার সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচনী এলাকা কীভাবে নির্ধারিত হবে সে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। অনেক আসন পুনর্নির্ধারণ নিয়ে প্রশ্ন আছে। দলীয় প্রার্থী বিবেচনা করে আসন নির্ধারণ করা হয়েছে।’
এ বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এমএম নাসীর উদ্দীন বলেছেন, ‘সীমানা পুনর্নির্ধারণ হবে ন্যায্যতার ভিত্তিতে। অতীতে সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে যদি কোনো অনিয়ম হয়, কোনো প্রার্থীকে জেতানোর জন্য বা কাউকে হারানোর জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কোনো সীমানা পুনর্নির্ধারণ হয়ে থাকলে আমরা সেটা অবশ্যই দেখব। ২০০১ সালের সীমানায় হবে না। বর্তমানেরটার ভিত্তিতে হবে, বিষয়টি তাও নয়; আমরা ন্যায্যতার ভিত্তিতে এটা করব।’