সংস্কারেই সম্ভব জনবান্ধব চরিত্র

রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর রাজনৈতিক ব্যবহারের শুরু, ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের কর্র্তৃত্বে পুলিশ ব্যবস্থা গঠনকালেই। এরই ধারাবাহিকতায় ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিশ বাংলায় প্রথম থানাভিত্তিক পুলিশি ব্যবস্থা চালু করেন। যাদের অন্যতম কাজ ছিল, সমাজের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা। তবে ভারতে ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ বজায় রাখতে এবং একই সঙ্গে ভিন্নমত দমনে যথেচ্ছভাবে পুলিশকে ব্যবহার করেছে ব্রিটিশ প্রশাসন।

স্বাধীন ভারতবর্ষ এমনকি পাকিস্তান হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশেও পুলিশের রাজনৈতিক ব্যবহারের মাত্রা এতটুকু কমেনি বরং বেড়েছে। একাত্তর সালে রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে এই জনপদের মানুষ ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ থেকে মুক্তি পেলেও মুক্তি মেলেনি ঔপনিবেশিক আইনকানুন থেকে। বরং স্বাধীন দেশের শাসকরা ‘জনশৃঙ্খলা’ রক্ষার নামে দেশের জনগণের ওপর জারি রেখেছে জেল, জুলুম, নিয়ন্ত্রণ, দমনপীড়ন আর শৃঙ্খলের মতো রাষ্ট্রিক হাতিয়ার। রাষ্ট্র ও সরকারের যাবতীয় জনবিরুদ্ধ কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে পুলিশকে ব্যবহার করা হয়েছে যথেচ্ছভাবে।

জননিরাপত্তা নিশ্চিতের রক্ষক না করে পুলিশকে পরিণত করা হয়েছে জনবিরুদ্ধ এক বাহিনীতে। যা চরমতর মাত্রায় মূর্ত হয় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ‘সরকারদলীয়’ ক্যাডার বাহিনীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার মধ্য দিয়ে। যে অভ্যুত্থানটি ‘ মূলত সরকারি চাকরির কোটা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সৃষ্ট স্ফুলিঙ্গ দ্রুত দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা এবং কাঠামোগত সংস্কারের লক্ষ্যকে সামনে রেখে। এই অভ্যুত্থানে পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত বল প্রয়োগের কারণে প্রাণ হারিয়েছে হাজারো মানুষ, যে কারণে সরকারের প্রতি জনগণের ক্ষোভ ও অনাস্থা চরম আকার ধারণ করে। পুলিশের এমন আচরণ নতুন কিছু নয়। বহু বছর ধরেই বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীকে জনগণের সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়, বরং রাজনৈতিক নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল। পুলিশ প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে জনগণের সঙ্গে সৌহার্দ প্রদর্শনের চেয়ে তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকেই জরুরি মনে করত, যে কারণে বাহিনীটি ক্রমেই অকার্যকর হতে থাকে এবং সমাজে বিভাজনের পরিবেশ ত্বরান্বিত হয়। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও নির্বিচারে গ্রেপ্তারের অভিযোগে ক্রমেই পুলিশের ওপর জনগণের আস্থা নিম্নমুখী। সেবা ও সুরক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশকে হরহামেশাই মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নটিকে উহ্য রেখে একটি সংকীর্ণ রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে সচেষ্ট থাকতে দেখা যায়। এই তেতো সত্যটি বাংলাদেশের পক্ষে আর অমীমাংসিত রাখা সম্ভব নয়’। (দেখুন : জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির ওয়েব পৃষ্ঠায় প্রকাশিত নিবন্ধ ‘পুলিশ বাহিনীর সংস্কার কেন জরুরি’, ১২ নভেম্বর, ২০২৪)।

পুলিশের জন্য তেতো সত্য তথা এই বাহিনীর জনবিরুদ্ধ ও অনৈতিক চরিত্র নতুন না হলেও এবারের ৩৬ জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তা অন্য এক রূপে ধরা দিয়েছে দেশের মানুষের কাছে। বলা যায়, বিগত ১৫ বছরের আওয়ামী কর্র্তৃত্ববাদী শাসনের অন্যতম রাজনৈতিক অংশীজন হয়ে উঠেছিল পুলিশ। যে কারণে অভ্যুত্থান-পরবর্তীকালে শারীরিক ও মানসিকভাবে নিজেদের অবস্থান থেকে সরে যেতে বাধ্য হয় তারা। সঙ্গতকারণেই স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকেই জনবিরুদ্ধ ধনিক শ্রেণির স্বার্থরক্ষাকারী রাষ্ট্রটির পরিচালন আইন তথা সাংবিধানিক সংস্কারের পাশাপাশি দাবি উঠেছে, নিপীড়নমূলক হাতিয়ারগুলোরও জনমুখী সংস্কারের।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি-ইউএনডিপি বলছে, ‘বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীর সংস্কার করতে হলে অবশ্যই ১৮৬১ সালের ঔপনিবেশিক আমলের পুলিশ অ্যাক্ট থেকে সরে আসতে হবে যে আইনে সেবার চেয়ে নিয়ন্ত্রণেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।’ ২০০৭ সালে এবং ২০১৩ সালে, একটি পুলিশ সংস্কার প্রকল্পের অধীনে নতুন একটি পুলিশ অধ্যাদেশের খসড়া তৈরিতে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সরকারকে সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। এর কাজ চলমান ছিল ২০০৬ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত। এই খসড়া অধ্যাদেশটিতে গণতান্ত্রিক, জনবান্ধব পুলিশিংয়ের লক্ষ্যে, একটি স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে একটি প্রাতিষ্ঠানিক অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থাসহ জনসাধারণের পক্ষ থেকে তদারকি এবং জবাবদিহিতা আদায়ের বিধান রাখা হয়। মূলত প্রশিক্ষণ উন্নয়ন এবং বাহিনীর কিছু বিষয়ে পেশাদারিত্ব সৃষ্টির কথা বলা হলেও, সেই অধ্যাদেশে টেকসই সংস্কারের অন্তরায় ও বহুকাল ধরে চলে আসা রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর প্রসঙ্গও উঠে আসে। একই সঙ্গে গুরুত্ব পায় স্থায়ী পরিবর্তন নিশ্চিত করার জন্য অবিচল রাজনৈতিক অভিপ্রায় এবং জনসাধারণের সত্যিকারের অংশগ্রহণের অপরিহার্যতা। কিন্তু প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও খসড়া অধ্যাদেশ এবং ২০১৩ সালের পর্যালোচনা রাজনৈতিক পর্যায়ে সিদ্ধান্তের অভাবে থমকে যায়।

এবারের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান অতীতের জনবিরুদ্ধ ও দুর্বৃত্ত রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে প্রত্যাখ্যানের সুযোগ করে দিয়েছে। ইতিমধ্যেই অন্যসব সংস্কারের পাশাপাশি পুলিশ বাহিনীর সংস্কারের লক্ষ্যে কমিশন গঠন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন, আইনি কাঠামো সংস্কার, পুলিশের জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ, পুলিশের পেশাদারি দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, পোশাক পরিবর্তন এবং পুলিশের কল্যাণসংক্রান্ত কার্যক্রমকে মুখ্য রেখে ৪৩টি সংস্কার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে খোদ বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে। সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ দেশের প্রতিনিধিত্বশীল রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। অনেকে বলছেন, পুলিশের কেন্দ্রীয় স্ট্রাকচার ভেঙে দিয়ে সত্যিকারের স্বাধীন স্থানীয় সরকার গঠন করে জননিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত এই বাহিনীকে তাদের (স্থানীয় সরকার) অধীনে ন্যস্ত করতে হবে। অগ্রগণ্য হয়ে উঠেছে পুলিশকে রাজনৈতিক বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের প্রভাবমুক্ত রাখার প্রস্তাবনা। সেই সঙ্গে পুলিশের জবাবদিহি নিশ্চিত এবং বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থাপনা তৈরির দাবিও জোরেসোরে উচ্চারিত হচ্ছে। 

উল্লেখ্য, প্রায় বিশ কোটি মানুষের এ দেশে জননিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্বে নিয়োজিত এই বাহিনীর বর্তমান সদস্য সংখ্যা মাত্র দুই লাখ বারো হাজার। সেই হিসাবে বর্তমানে দেশে এক লাখ মানুষের নিরাপত্তায় নিয়োজিত রয়েছেন মাত্র ৩২ জন পুলিশ সদস্য। পুলিশের সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি পুলিশকে জনবান্ধব ও জনগ্রাহ্য করতে কমিউনিটি পুলিশিংকে কার্যকর ও অপরিহার্য করার কথাও বলেছেন অনেকে। এক্ষেত্রে যুক্তি হচ্ছে, স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ার মাধ্যমে পুলিশ বাহিনী আরও তৎপর এবং কার্যকর হয়ে উঠবে।

যেকোনো পরিবর্তন কিংবা সংস্কারে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়াই যেতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের সংস্কার হতে হবে এখানকার নিজস্ব বাস্তবতার নিরিখে। যেখানে তরুণদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলন থেকে স্পষ্ট বার্তা উচ্চারিত হয়েছে অচলাবস্থা আর সহ্য করা হবে না, সেখানে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আগামী দিনের অবয়ব নির্ধারিত হতে হবে তরুণদের ভাবনাকে প্রাধান্য দিয়ে। শিক্ষার্থী, নারী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং পুলিশের অসদাচরণের শিকার ব্যক্তিদের সঙ্গে দেশব্যাপী সংলাপ আয়োজন করা হলে অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা সম্ভব, যেখানে বাংলাদেশের সব নাগরিকের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটবে।

লেখক: সাংবাদিক ও সদস্য, রাষ্ট্রচিন্তা 

khoborjibi@gmail.com