‘অ্যাক্সিডেন্টাল’ প্রধানমন্ত্রী বলা হয় ড. মনমোহন সিংকে

ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও প্রবীণ অর্থনীতিবিদ ড. মনমোহন সিং মারা গেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার ৯২ বছর বয়সে দিল্লির এইমস হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। প্রধানমন্ত্রী পদে তারই উত্তরসূরি, দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গতকাল রাত ১০টা ৩৭ মিনিটে টুইট করে এ খবর জানান।

নরেন্দ্র মোদির টুইটের আগে দিল্লির এইমস হাসপাতালের মিডিয়া সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. রিমা ডাডার সই করা এক বিবৃতিতে বলা হয়, মনমোহন সিং  বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বাড়িতেই অজ্ঞান হয়ে যান। এরপর বাড়িতেই তার জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করা হয়। পরে এইমস হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আনা হয় মনমোহন সিংকে। কিন্তু সব প্রচেষ্টা করা সত্ত্বেও তার জ্ঞান ফিরিয়ে আনা যায়নি এবং রাত ৯টা ৫১ মিনিটে তিনি মারা যান।

ড. মনমোহন সিং ১০ বছর (২০০৪-২০১৪) ভারতের প্রথম শিখ প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। জওহরলাল নেহরুর পরে ড. মনমোহন সিংই প্রথম ভারতীয় নেতা, যিনি প্রথমবার প্রধানমন্ত্রীর সম্পূর্ণ মেয়াদ পূর্ণ করার পরে দ্বিতীয়বার আবারও নির্বাচিত হয়ে এসেছিলেন। ১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার পরে শিখ-বিরোধী দাঙ্গায় প্রায় তিন হাজার শিখকে হত্যা করা হয়। ওই দাঙ্গায় অভিযোগের আঙুল ওঠে তারই দল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। এ ঘটনার জন্য প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীনই ক্ষমা চেয়েছিলেন মনমোহন সিং। দ্বিতীয় দফায় প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন তার সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। সেসব অভিযোগের কারণেই ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তার দল কংগ্রেসের ভরাডুবি হয়েছিল বলে মনে করা হয়।

১৯৩২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর অবিভক্ত পাঞ্জাব (বর্তমান পাকিস্তান) প্রদেশের এক ছোট্ট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মনমোহন সিং। তখন ওই গ্রামে না ছিল বিদ্যুৎ, না ছিল খাওয়ার পানির ব্যবস্থা। এ রকমই একটা গ্রাম থেকে উঠে আসা মনমোহন সিং পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করার পর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পান কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এরপরে ডি ফিল উপাধি পান অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

শিক্ষায় আর পেশায় অর্থনীতিবিদ মনমোহন সিং রাজনীতির ময়দানে পরিচিত হন ১৯৯১ সালে, ভারতের অর্থমন্ত্রী হিসেবে। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন ভারতের অর্থমন্ত্রী। তখন ভারতের অর্থনীতির ছিল ভয়াবহ। হঠাৎ করেই মন্ত্রী হওয়ার আগে তিনি একসময়ে ছিলেন সরকারের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা আর ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া’র গভর্নর। এখনও ভারতীয় কিছু নোটে গভর্নর হিসেবে তার সই দেখতে পাওয়া যায়।

ড. মনমোহন সিং খুব ভাল করেই জানতেন তিনি রাজনীতিবিদ নন। ১৯৯৯ সালে ভারতের সংসদের নিম্ন-কক্ষ লোকসভার ভোটে দাঁড়িয়ে হেরে যান তিনি। তার কথায়, ‘একজন রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠা যায়, কিন্তু সেটা হতে হলে তো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটে জিততে হবে!’

এরপরে তিনি উচ্চ-কক্ষ রাজ্যসভার সংসদ সদস্য হয়েছিলেন আসাম থেকে। ২০০৪ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। কিন্তু কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী প্রধানমন্ত্রী পদ নিতে অস্বীকার করলেন। সম্ভবত তিনি যেহেতু জন্মসূত্রে ইতালিয়, তাই প্রবল সমালোচনার মুখে পড়তে হতে পারে, এটা ভেবেই সম্ভবত তিনি প্রধানমন্ত্রী হতে চাননি।

সমালোচকরা বলে থাকেন- মনমোহন সিংয়ের প্রধানমন্ত্রীত্বের সময়কালে সোনিয়া গান্ধীই ছিলেন আসল ক্ষমতার উৎস। তার নিজের কোনো ক্ষমতাই ছিল না। এ কারণে তাকে ‘অ্যাক্সিডেন্টাল’ প্রাধানমন্ত্রী বলা হয়ে থাকে।