পূর্ববাংলার স্বায়ত্তশাসন, স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা ছিল গৌরবোজ্জ্বল। ১৯৫৪ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত তিনি দৈনিক সংবাদে সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। জহুর হোসেন চৌধুরী ‘দরবার-ই-জহুর’ কলামে তৎকালীন সামরিক শাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে আন্দোলনের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়ন ও প্রেস ক্লাবের অন্যতম উপদেষ্টা এই সাংবাদিক ব্যক্তিত্ব ১৯৮০ সালের ১১ ডিসেম্বর ৫৮ বছর বয়সে মারা যান। সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৮২ সালে মরণোত্তর একুশে পদক লাভ করেন। অতীতের সঙ্গে অধুনার সংযোগ ঘটাতে ছাপা হলো তার লেখা উপসম্পাদকীয়
‘আজাদ’ আবার বের হওয়াতে আমি খুশি হয়েছি একান্ত ব্যক্তিগত কারণে। এ পত্রিকাটির সঙ্গে আমার জীবনের বহু স্মৃতি, অনেক তুমুল বিতর্কের কাহিনী বিজড়িত। ‘নীতি’ হিসেবেই স্থানীয় কোনো পত্রিকা আমি কিনি না। ‘সৌজন্য কপি’ হিসেবে পেলে পড়ি, নতুবা পড়ি না। এবার ‘আজাদ’ বের হওয়ার কদিন পর এর অফিসে টেলিফোন করে মুজীবুর রহমান ভাইকে চাইলাম। ওপার থেকে শুনলাম, ‘উনি দোতলায় আছেন, ডাকতে হবে। আপনি কে বলছেন?’ নাম বলায় জবাব পেলাম, ‘আমি জয়নুল বলছি চাচা, খলিল সাহেবের ছেলে। আপনি কেমন আছেন ?’ খলিল ভাইয়ের কন্দর্পকান্তি চেহারাটা (হিন্দু দেবতার চেহারার সঙ্গে তুলনা করায় মুজীবুর রহমান ভাই মাফ করবেন। খলিল ভাই বেঁচে থাকতে এ কথা তাঁকে অনেকবার বলেছি। তিনি আপত্তি করেননি। তাঁর সঙ্গে সম্পর্কটা সত্যি নিবিড় ছিল) চোখের সামনে ভেসে উঠল। জয়নুলকে বললাম, “চিনতে যখন পেরেছ, তখন কথাটা তোমাকে বললেও চলবে। ঢাকা থেকে ‘আজাদ’ যেদিন প্রথম বের হয়, সেদিন থেকে এক কপি করে কাগজ পেতাম।” কথাটা শেষ করার আগেই শুনলাম ‘এখনও নিশ্চয়ই পাবেন। কাল থেকেই কাগজ যাবে। আপনার বাসার ঠিকানাটা বলুন।’ খুব ভালো লাগল। সাধারণ সৌজন্য, যেটাকে আমরা আদব-তমিজ বলি, এ জেনারেশনে একটু অসাধারণ অর্থাৎ দুষ্প্রাপ্য ব্যাপার হয়ে গেছে বলেই শুনি। সৌজন্যবোধটা কি সামন্ততান্ত্রিক সমাজ-ব্যবস্থারই একটা মূল্যবোধ?
সাদা কালো দুটি রঙ মিলিয়েই জীবন। তত্ত্ব কথা থাকুক, পরদিন থেকেই ‘আজাদ’ নিয়মিত পেতে থাকলাম। দু-একদিন অবশ্য হকার ফাঁকি দেয়। সেদিন দিনটা একটুখানি শূন্য মনে হয়। কারণ, ৬টা দৈনিকের মধ্যে দিনের ডামাডোলে সময় না পেলেও রাতে শোয়ার আগে আদ্যোপান্ত পড়ি এবং উপভোগ করি। আমার মন চলে যায় তিন-চার যুগ আগে, মনে হয় কাল যেন স্থির হয়ে রয়েছে। আমার কিছু বন্ধু ‘আজাদ’ নিয়মিত পড়েন এবং বলেন, “‘আজাদ’ই এদেশের মুসলিম মানসের প্রতিনিধিত্বের সত্যিকার দাবিদার, বাকি সব কাগজই আস্ত ভেজাল।” আমি এ তর্কের মধ্যে এখন যেতে নারাজ। এমন এক যুগ ছিল যখন ‘আজাদ’-এর শীর্ষেই লেখা থাকত ‘মোছলেম বাংলার একমাত্র দৈনিক’ এবং তখন এ দাবি বাস্তব সত্য ছিল। ১৯৪৬ সালে শহীদ সাহেব আবুল মনসুর সাহেবকে সম্পাদক করে দৈনিক ‘ইত্তেহাদ’ বের করার পরও কিছুদিন যাবৎ উপরোক্ত দাবি বহাল ছিল। ‘আজাদ’-এর পুনরুজ্জীবনের পর সম্পাদকম-লীর সভাপতি হিসেবে জনাব মুজীবুর রহমান খাঁর নাম দেখে আমি সত্যি আনন্দিত হয়েছি। আমার মনে পড়ে গেল প্রায় চল্লিশ বছর আগেকার চিকন শ্যামল সুদর্শন এক যুবকের কথা, যিনি একদিন রবীন্দ্রনাথের ‘বিজয়িনী’ কবিতার ‘অচ্ছোদসরসী-নীরে রমণী যেদিন নামিলা স্নানের তরে’ থেকে শুরু করে ‘নিরস্ত্র মদনপানে চাহিলা সুন্দরী শান্ত প্রসন্ন বয়ানে’ পর্যন্ত প্রায় এক নিঃশ্বাসে আবৃত্তি করে আমাকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। কাব্যে তার আসক্তি ছিল সত্যি প্রচন্ড। রবীন্দ্রনাথের অসংখ্য কবিতা তিনি যেভাবে অনর্গল আবৃত্তি করতে পারতেন, তাতে আমার সত্যি ঈর্ষা হতো। গত কয়েক দিন ধরে ‘আজাদ’-এ কবি হিসেবে রবীন্দ্রনাথের মূল্য ক’পয়সা এবং কীরূপ নিপুণভাবে তিনি ইংরেজের দালালি ও মুসলমানের দুশমনি করেছেন, সে সম্বন্ধে ‘কাল পুরুষ’-এর যে মূল্যবান গবেষণামূলক লেখা বের হচ্ছে, বিভাগ-পূর্ব যুগে পাকিস্তান আন্দোলন যখন উচ্চতম পর্যায়ে পৌঁছেছে, তখনো এবং পাকিস্তান আমলের চব্বিশ বছরেও রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে এমন জোরালো কোনো লেখা ‘আজাদ’ বা অন্য কোনো পত্রিকায় পড়েছি বলে মনে পড়ে না। মুজীবুর রহমান ভাইয়ের সঙ্গে চার যুগের সম্পর্কের মধ্যে বহু তর্কবিতর্ক হয়েছে। কিন্তু তার সঙ্গে মতান্তর একদিনের জন্যও মনান্তরে পরিণত হয়নি। বহুদিন তাঁর সঙ্গে দেখা হয় না। ভাবছি একদিন ‘আজাদ’-এ যেয়ে আবার নতুন করে তর্কে প্রবৃত্ত হব ও কিছু চা-নাশতা-সিগারেট ধ্বংস করে আসব। সম্ভব হলে তাঁর কাছে আবার রবীন্দ্রনাথ, ম্যাথু আর্নল্ড এবং নজরুলের কবিতা শুনতে চাইব। ইংরেজির ছাত্র ছিলেন তিনি। ‘আজাদ’ সম্পর্কে আলোচনা করা আজ আমার এ লেখার উদ্দেশ্য নয়।
আজ একটি গুরুতর ত্রুটি স্বীকারের পালা। আজকের ‘আজাদ’-এর পৃষ্ঠা উল্টাতে উল্টাতে জনাব শাহীন রেজার ‘মওলানা আকরম খাঁ সাহেবের জন্মবার্ষিকী প্রসঙ্গে ‘আমরা তাঁকে প্রাপ্য মর্যাদা দিয়েছি কি?’ শীর্ষক প্রবন্ধ নজরে পড়ল। লেখক মন্তব্য করেছেন, ‘রাজনৈতিক মতাদর্শের পার্থক্য যাই থাকুক না কেন, এ কথা কি বিস্মৃত হওয়া উচিত যে, মওলানা আকরম খাঁ একজন জ্ঞানী সাধক ও নির্ভীক সেনানী ছিলেন, উপরন্তু তিনি এদেশের সাংবাদিকতার জনক ছিলেন তাঁর আবির্ভাব না হলে আমরা যারা আজ নিজেদেরকে ‘সাংবাদিক’ বলে দাবি করি ও ‘সদর্পে মেদিনী কাঁপিয়ে ফিরি’ তাদের এ দর্প চূর্ণ হয়ে যেত বহু আগেই। লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যায় যখন দেখি দেশের কোনো দৈনিক পত্রিকায় মরহুম আকরম খাঁর জন্মদিনের ছোট্ট খবরটি ছাপার সামান্যতম তাগিদ বোধ করেন না কেউ ।’ সাংবাদিকদের ব্যাপারে লেখকের মন্তব্য সম্বন্ধে আমার বক্তব্য নেই। নিজেকে আমি সাংবাদিক মনে না করার চেষ্টাই ক্রমাগত করে এসেছি। তবে আমি বিনা দ্বিধায় স্বীকার করব যে, মওলানা আকরম খাঁ সাহেবের কাগজেই আমার সাংবাদিকতার হাতে-খড়ি এবং ‘আজাদ’ অফিসে আমার যৌবনের বহু সন্ধ্যা কেটেছে। এ অফিসে বসেই মুসলিম বাংলার রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক জীবনের বিভিন্ন দিকের বাঁকা-সোজা নানা গতি-প্রকৃতি কাছে থেকে লক্ষ্য করার সুযোগ ঘটেছে এবং এ অভিজ্ঞতার মূল্যের সীমা নেই। এ জন্য আমি মরহুম মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ ও তাঁর কাগজের কাছে কৃতজ্ঞ।
মওলানা সাহেবকে কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। তাঁর যৌবনকাল থেকেই তাঁর ধর্মীয়, রাজনৈতিক মতামত ও বক্তব্য নিয়ে প্রবল ও তিক্ত তর্ক চলেছে প্রায় তাঁর জীবনের শেষকাল পর্যন্ত । তিনি বহু লোককে ‘কুফরী’ ফতোয়া দিয়েছেন, আর নিষ্ঠাবান সুন্নীরাও তাঁকে এই খেতাবে আখ্যায়িত করেছে। রাজনৈতিক জীবনে তাঁর আবির্ভাব হয় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের অনুরক্ত ভক্ত হিসেবে, আগাগোড়া খদ্দরে ভূষিত কংগ্রেসী মওলানারূপে, ইংরেজভক্ত আলেএঁদের ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন মুসলিম সমাজের মৌলিক সংস্কারের প্রয়োজনের অকুতোভয় তেজস্বী প্রবক্তা হিসেবে। বোধহয় কৃষ্ণনগরে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবে মওলানা আকরম খাঁ সাহেব স্বদেশপ্রেমের ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে যে জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়েছিলেন, তা আমার বালকমনে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। ১৯৩৮-৩৯ সালেও কলকাতার মুসলিম ইনস্টিটিউটে এমএন রায়ের এক সংবর্ধনা সভায় তাঁকে বক্তৃতা করতে আমি নিজেই শুনেছি, ‘যদি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের অকালমৃত্যু না হতো, তবে হয়তো আমরা কংগ্রেস ছাড়তাম না।’ এসব এখন ইতিহাসের অন্তর্গত; তবে একটি কথা অন্তত আমি বিশ্বাস করি যে, যদি মওলানা আকরম খাঁ সাহেবের ‘আজাদ’ পত্রিকা না থাকত, তবে পাকিস্তানের উদ্ভব হতো কি-না সন্দেহ। মওলানা সাহেব ও ‘আজাদ’ উগ্র মুসলিম লীগ ও পাকিস্তানপন্থি হওয়া সত্ত্বেও কলকাতার ‘আজাদ’ অফিসে কমিউনিস্ট, রায়পন্থি ও অন্যান্য প্রগতিপন্থি অমুসলমান বুদ্ধিজীবীদেরও যে ভিড় ছিল, এ কথা আমি এ কলামে আগেও একবার লিখেছি। মওলানা সাহেব সম্বন্ধে আলোচনা করতে শুরু করলে একটা বিরাট আকারের বই-ই লিখে ফেলতে হয়। আমাদের আরও অন্য অনেক নেতার ন্যায়ই মওলানা সাহেবের একটা প্রামাণ্য কেন, কোনো ধরনের জীবনীই কেউ লিখলাম না, এটা সত্যি দুর্ভাগ্যের কথা। প্রায় সত্তর বছর ধরে এদেশের জীবনকে যিনি প্রভাবান্বিত করে গেছেন, তাঁর জীবন-কথা যদি হারিয়ে যায়, তবে ভবিষ্যতে যাঁরা আমাদের একটা বাস্তবভিত্তিক নিরুত্তাপ ইতিহাস লিখতে যাবেন, তাঁরা সে ইতিহাসের অনেক অমূল্য মালমসলা পাবেন না। মওলানা সাহেবের জন্মদিবস একরূপ অলক্ষ্যে চলে যাওয়াটা নিঃসন্দেহে দুঃখের বিষয়। তবে এ সম্বন্ধে খেদের বিশেষ কোনো কারণ নেই। রাজনৈতিক নেতা মওলানা আকরম খাঁর চাইতেও ‘মোস্তফা চরিতের’ লেখক, কোরান শরীফের অনুবাদক, অনুপম বাংলা গদ্য লেখক হিসেবে মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ বাংলা সাহিত্যে চিরদিন বেঁচে থাকবেন। এবং তাঁর বাংলা তথাকথিত ‘এছলামী বাংলা’ ছিল না। বর্তমানে আমি ‘মোস্তফা চরিত’ পড়ছি। তবে কাজটা সহজ হচ্ছে না। এর পান্ডিত্যের গভীরতায় আমি হাবুডুবু খাচ্ছি। ‘মোস্তফা চরিতের’ ‘প্রাথমিক কথার’ একটা দীর্ঘ উদ্ধৃতি দিয়ে আমি অসামান্য শক্তিধর পুরুষ মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছি
‘মানুষের দেহের ন্যায় তাহার অভ্যন্তরীণ প্রবৃত্তিগুলিও খুব বাবু। এই বাবুগিরির খাতিরে আমাদের জ্ঞান ও বিবেক স্বাধীন আলোচনা ও গবেষণার দ্বারা অসত্যের পুঞ্জীভূত ন্যক্কারজনক আবর্জনারাশির নিম্ন হইতে সত্যের উদ্ধারসাধন করার জন্য পরিশ্রম স্বীকার করিতে বড় একটা চাহে না। এই সহজিয়া মানসিকতা কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের গাড়ি-পাল্কিগুলিতে চড়িয়া পরম আনন্দে গা এলাইয়া শুইয়া পড়ে। ইহা মানবীয় দুর্বলতার মারাত্মক দিক। মহাপুরুষগণের জ্ঞানের গভীরতা, তাঁহাদের চরিত্রের মহিমা, তাঁহাদের জীবনের ব্রত ও সাধনা এসব লইয়া আলোচনা করিতে গেলে অনেক হাঙ্গামা উপস্থিত হয়। পক্ষান্তরে মহাপুরুষকে ভক্তি করিতে গেলে, তাঁহার জীবনকে একেবারে বাদ দিয়া গেলেও চলে না। তাই ভক্তগণ খুব সহজে উভয়কুল রক্ষার জন্য কতকগুলি আজগুবি, অনৈতিহাসিক গল্পগুজব এবং কতকগুলি অলৌকিক ও অস্বাভাবিক উপকথার আবিষ্কার করেন এবং সেগুলির মধ্য দিয়া তাঁহার জয়-জয়কার করিয়া মনে করিয়া লন যে, তাঁহাকে যথেষ্ট ভক্তি করা হইল । কালক্রমে তাহাই শাস্ত্র হইয়া দাঁড়ায় এবং সেগুলি সম্বন্ধে সাধারণ সংস্কারের বিপরীত কোনো কথা বলিতে চেষ্টা করিলে তাহাকে শাস্ত্রদ্রোহী, ধর্মদ্রোহী ও কাফের বলিয়া নির্ধারণ করা হয়। যুক্তির দিক দিয়া কোনো কথা বলিয়া উদ্ধার পাইবার আশাও এক্ষেত্রে খুবই কম। কি বাংলা, মুক্তবুদ্ধি, স্বাধীন চিন্তার কি জবরদস্ত নিশানবরদারী। ধর্মের ক্ষেত্রে মওলানা সাহেব আটত্রিশ বছর আগে যা বলেছেন, আজ রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক বিষয়েই এ ধরনের কোনো কথা বললে নানা কথা কোনো কোনো মহলে ওঠে। (ঈষৎ সংক্ষেপিত)