ভোটার হওয়ার বয়স ১৭ বছর এবং সংসদ সদস্য পদে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে ন্যূনতম ২১ বছর- অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও সংবিধান সংস্কার কমিশনের সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজের করা এ দুই মন্তব্য নিয়ে তুমুল আলোচনায় চলছে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেছে দেশ রূপান্তর। তারা প্রায় অভিন্ন সুরে বলেছেন, সংবিধান, প্রচলিত আইন, শিশু সনদ ও বাস্তবতা বিবেচনায় ভোটার হতে ১৮ বছর ও সংসদ সদস্য প্রার্থী হতে ২৫ বছরই যৌক্তিক।
গত শুক্রবার রাজধানীর খামারবাড়িতে আয়োজিত এক জাতীয় সংলাপে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘তরুণরা সংখ্যায় বেশি। দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা আগ্রহী। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে মতামত দেওয়ার জন্য আমি মনে করি, ভোটার হওয়ার বয়স ১৭ বছর নির্ধারিত হওয়া উচিত।’ সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘সংসদ সদস্য হওয়ার বয়স ২৫ থেকে কমিয়ে ২১ করতে চাই।’ এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি তরুণদের অংশগ্রহণের জায়গা তৈরি করতে হবে। যাতে করে তারা সংসদে আসতে পারে। রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে পারে।’
প্রধান উপদেষ্টার মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ইতিমধ্যে বিএনপি নেতারা প্রতিক্রিয়া জানিয়ে এতে আপত্তি ও দ্বিমত পোষণ করে বলেছেন, এমন সিদ্ধান্ত হলে এটি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হবে। তবে, সংসদ সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে ২১ বছর বয়স নিয়ে আলী রীয়াজের মন্তব্যের বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো রাজনৈতিক দল থেকে প্রতিক্রিয়া আসেনি।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমেদ মনে করেন, ১৭ বছর বয়সে ভোটার করা এবং সংসদ সদস্য প্রার্থী হতে ২১ বছরের বিষয়টি বাস্তবায়ন করতে হলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে, যা এ সরকারের আমলে হয়তো সম্ভব হবে না। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘এসব বিষয়ে (ভোটার হওয়া ও সংসদ সদস্য প্রার্থী হওয়ার বয়স) আমরা এখনো চিন্তা-ভাবনা করিনি। তবে, আমার মনে হয় না, সংবিধান সংশোধন না করে এগুলো করা যাবে। কারণ সংবিধানেই বয়সের বিষয়টি স্পষ্ট করা আছে। এখানে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নেই।’ তিনি বলেন, ‘ভোটার হওয়া ও সংসদ সদস্য প্রার্থী হওয়ার বয়সের প্রচলিত বিধান বহুদিন ধরে চলে আসছে। এখন এগুলো পরিবর্তন অপরিহার্য কি না, প্রয়োজন কি না, এটা কেন পরিবর্তন দরকার, এ বিষয়ে তো যাচাই-বাছাই ও সিদ্ধান্ত লাগবে। সংবিধান নিয়ে যারা কাজ করছেন বিষয়টি তারা দেখবেন। তবে, আমার মনে হয় না এই সরকারের আমলে সংবিধান সংশোধন করে এটি করা যাবে।’ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ১৮ ও ২৫ বছর যৌক্তিক কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটি ঠিক আছে। কারণ যারা পড়াশোনা করবে এসএসসি, এইচএসসি পাস করবে, তারা তো একটা পর্যায়ে দাঁড়াবে। বয়সের পরিপক্কতারও একটা প্রয়োজন আছে। আর সংসদ সদস্য হওয়ার বয়সটা বরং আরও বাড়ানো উচিত বলে মনে করি।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া মনে করেন, ভোটার হওয়ার বয়স ১৭ করতে গেলে শিশু আইনে শিশুর বয়স (১৮ বছর পর্যন্ত) যা উল্লেখ করা হয়েছে তা পরিবর্তন করতে হবে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা এটি যেহেতু বলেছেন, তাহলে ধরে নিতে হবে যে, শিশু আইনে শিশুর যে বয়সসীমা সেটাও উনার চিন্তায় রয়েছে। এখন শিশু আইনে শিশুর বয়সসীমা কমিয়ে এটি করলে কোনো প্রশ্ন থাকবে না। কিন্তু সেটা না করে ১৭ বছর করলে আন্তর্জাতিক সনদ ও শিশু আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে। কেননা বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন শিশু সনদে স্বাক্ষর করেছে। এসব সনদে শিশুদের বয়স কেন ১৮ বছর তার অনেক যৌক্তিক কারণ বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ও গবেষণা রয়েছে। তাই হঠাৎ করেই শিশুকে বড় বানিয়ে ফেলা যাবে না।’ তিনি বলেন, ‘যখন বয়সটা কমানো হবে, তখন কিন্তু শিশুর সুরক্ষার বিষয়টা কমে যাবে। শিশু হিসেবে অন্যান্য অধিকারের স্বীকৃতিগুলো বাতিল হয়ে যাবে, যা আইন ও শিশু সনদ সমর্থন করে না।’ এক প্রশ্নে ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে হলে প্রার্থীর পরিপক্কতার বিষয়টি সামনে চলে আসে। ২১ বছর বয়সে একজন ব্যক্তির শিক্ষাগত যোগ্যতা কী হবে, সেটি দেখতে হবে। আগে কোনোরকম শিক্ষাগত যোগ্যতা দিয়ে চালিয়ে নেওয়া হয়েছে। এখন তো আমরা সেটা চাইছি না। কেননা সংসদ সদস্যদের কাজ আইন প্রণয়ন এবং সেই পরিপক্কতা ২৫ বছর বয়সের আগে আসে না। তাই এসব বিষয়ে আবেগি না হয়ে বাস্তবসম্মত হতে হবে।’
বিশ্লেষকরা বলেন, ভোটার হওয়ার বয়স নির্ধারণের মাধ্যমে রাষ্ট্রের একজন ব্যক্তিকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়া সারাবিশ্বে সর্বজন স্বীকৃত বিষয়। তবে, ভোট দিতে একেক দেশে একেক রকম বয়সসীমা নির্ধারণ করা হলেও আন্তর্জাতিক শিশু সনদে স্বাক্ষরকারী বিভিন্ন দেশে ১৮ বছর বছরের নিচে বয়সীদের শিশু এবং এর ওপরের বয়সীদের প্রাপ্ত বয়স্ক হিসেবে গণ্য করা হয়। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক শিশু সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ। বাংলাদেশে শিশু আইন, ২০১৩ অনুযায়ী ১৮ বছরের নিচে যারা তারা শিশু হিসেবে গণ্য হবে। সংবিধানের ১২২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সী কোনো ব্যক্তি ভোটাধিকারপ্রাপ্ত হবেন না। এ ছাড়া ভোটার তালিকা আইন, ২০০৯ অনুযায়ী ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হলে যেকোনো ব্যক্তি ভোট দিতে পারবেন। অন্যদিকে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে সংসদ সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে ন্যূনতম ২৫ বছর বয়সসীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
বিভিন্ন মাধ্যম থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ভারতে ভোটার হতে হলে ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর, চীনে ১৮ বছর, জাপানে ১৮ বছর, দক্ষিণ কোরিয়ায় ১৮ বছর, থাইল্যান্ডে ১৮ বছর, মালয়েশিয়ায় ১৮ বছর, সিঙ্গাপুরে ২১ বছর, সৌদি আরবে ১৮ বছর, ইরাকে ১৮ বছর, কুয়েতে ২০ বছর, যুক্তরাষ্ট্রে ১৮ বছর (প্রাইমারি ইলেকশন বা প্রার্থী বাছাইয়ে ১৭ বছর), ব্রাজিলে ১৬ বছর, কানাডায় ১৮ বছর, জার্মানিতে ১৬ বছর, যুক্তরাজ্যে ১৮ বছর, নিউজিল্যান্ডে ১৮ বছর এবং আর্জেন্টিনা ১৬ বছর নির্ধারণ করা আছে।