মহান সংস্কারক ও চিন্তক আলেম

সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলি নদভি (রহ.), মুসলিম বিশ্বে সুবিদিত একটি নাম। একাধারে তিনি ছিলেন যুগশ্রেষ্ঠ আলেম, চিন্তক, সংস্কারক, লেখক, গবেষক, ঐতিহাসিক, জীবনীকার, আরবি ভাষা ও সাহিত্যের প্রাণপুরুষ, দুই শতাধিক কালজয়ী গ্রন্থের রচয়িতা এবং অসংখ্য আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভকারী সফল ব্যক্তিত্ব। উপমহাদেশে তিনি আলি মিয়া নামেও খ্যাত।

আরবি ভাষা ও সাহিত্যে অসাধারণ পাণ্ডিত্য থাকায় আসীন হয়েছেন মর্যাদার সর্বোচ্চ আসনে। এশিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে পূর্ব-পশ্চিম সর্বত্র তার সুনাম-সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। তিনি ছিলেন সভ্যতা ও সংস্কৃতির সংস্কারক। তার সংস্কারের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের আনাচে-কানাচে। মুসলিম বিশ্ব যখন পাশ্চাত্য সভ্যতার মোকাবিলায় দুর্বল হয়ে পড়ে তখন তিনি নতুনভাবে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনকে মোকাবিলা শুরু করেন। মুসলিম বিশ্বকে স্বনির্ভর অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজনীতির দিকে এগিয়ে নিতে তিনি আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যান।

শিক্ষা সিলেবাস সংস্কারে তার অবদান অনস্বীকার্য। তিনি সবসময় যুগোপযোগী সিলেবাসের কথা বলতেন। ইসলামের মানদণ্ডে আধুনিকতার দিকে এগিয়ে যেতেন। মৌলিকত্ব ধারণ করে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা ছিল তার মধ্যে শতভাগ। তিনি কখনো তার মিশন থেকে পিছপা হননি। ইসলাম, উম্মাহ ও মানবতার কথা ভাবতেন সব সময়। তার নতুন দিন শুরু হতো উম্মাহর সমস্যা সমাধানের কর্মসূচি হাতে নিয়ে। তার মাধ্যমেই মধ্যপ্রচ্যে দাওয়াত ও তাবলিগের কর্মপদ্ধতির বেশ প্রচার-প্রসার ঘটে। দ্বীনের দাওয়াত ছিল তার কর্মময় জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইসলামের দাওয়াত নিয়ে আজীবন চষে বেড়িয়েছেন দিগ্দিগন্তে।

মুসলিম উম্মাহর এই যুগ শ্রেষ্ঠ রাহবারের জন্ম হিন্দুস্তানের রায়বেরেলিতে। ১৯১৩ সালের ৫ ডিসেম্বরে আবদুল হাই (রহ.)-এর ঘরকে আলোকিত করে পৃথিবীতে আগমন করেন এই মহান সংস্কারক। তার মা খায়রুন নেসা ছিলেন একজন পরহেজগার নারী। মা-বাবা উভয় দিক থেকেই তিনি সাইয়েদ হাসান (রা.)-এর বংশধর। দশ বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে এতিম হন। বেড়ে ওঠেন মমতাময়ী মায়ের স্নেহ ও নিবিড় তত্ত্বাবধানে। মায়ের কাছেই পড়াশোনার হাতেখড়ি। শায়েখ খলিল বিন মুহাম্মদ আনসার ও ড. তকি উদ্দিন হেলালি (রহ.)-এর কাছ থেকে আরবি ভাষা ও সাহিত্যের উচ্চতর জ্ঞান লাভ করেন। ইসলামের দাওয়াতকে ব্যাপক করার লক্ষ্যে তিনি ইংরেজি ভাষাও শিক্ষা করেন। তিনি ১৯২৯ সালে নদওয়াতুল ওলামায় বিশেষভাবে মুহাদ্দিস হায়দার হোসেন খান (রহ.)-এর দরসে অংশগ্রহণ করেন এবং তার কাছ থেকেই সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, তিরমিজি ও সুনানে আবু দাউদের দরস গ্রহণ করেন। তাফসিরও তার কাছে পড়েন। এছাড়া হুসাইন আহমদ মাদানি ও আহমদ আলি লাহরি (রহ.)-এর শিষ্যত্ব লাভ করেন। দারুল উলুম দেওবন্দেও কিছুদিন পড়াশোনা করেন। শিক্ষাজীবন শেষে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে তার কর্মজীবন শুরু হয়। ১৯৩৪ সালে দারুল উলুম নদওয়াতুল ওলামায় শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। এখানেই আমৃত্যু শিক্ষকতা করেন। তাফসির, হাদিস, আরবি ভাষা-সাহিত্য, মানতেক শাস্ত্রসহ আরও বিভিন্ন বিষয়ের পাঠদান করেন। একই বছর তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

১৯৪৯ সালে ভারতের বিভিন্ন জায়গায় সফরকালে তিনি শায়েখ আবদুল কাদের রায়পুরি এবং মাওলানা ইলিয়াস কান্ধলভি (রহ.)-এর সাক্ষাৎ লাভ করেন। তাদের নিজের কর্মজীবনের পরামর্শদাতা হিসেবে গ্রহণ করেন। সারা জীবন এই দুই মহান ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখেন। দ্বীনি শিক্ষা প্রচার-প্রসারের লক্ষ্যে ১৯৪৩ সালে ‘আঞ্জুমানে তালিমাতে দ্বীন’ নামক একটি অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠা করেন। অ্যাসোসিয়েশনের বিভিন্ন সভা-সেমিনারে কোরআন-সুন্নাহর আলোকে দেওয়া তার বক্তব্য আধুনিক শিক্ষিত সমাজে খুব সাড়া ফেলে। তিনি ১৯৪৫ সালে নদওয়াতুল ওলামার প্রশাসনিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫১ সালে নদওয়াতুল ওলামার তৎকালীন শিক্ষা বিভাগের পরিচালক সাইয়্যেদ সুলাইমান নদভি (রহ.)-এর অনুরোধে শিক্ষা বিভাগের উপপরিচালকের পদ গ্রহণ করেন এবং ১৯৫৪ সালে তার ইন্তেকালের পর শিক্ষা বিভাগের পরিচালক নির্বাচিত হন। ১৯৬৫ সালে নদওয়াতুল ওলামার মহাসচিব নির্বাচিত হন।

তার বিখ্যাত আন্দোলন ‘পায়ামে ইনসানিয়্যাত’ শুরু করেন ১৯৫১ সালে। ১৯৫৫ সালে আরবি পত্রিকা ‘আল-বাস’ এবং ১৯৫৯ সালে ‘আর-রায়িদ’-এর সম্পাদক নির্বাচিত হন। একই বছর লখনৌতে ইসলামি গবেষণা ও প্রকাশনা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৫৬ সালে দামেস্ক আরবি ভাষা ইনস্টিটিউটের সদস্য নিযুক্ত হন। ১৯৬২ সালে তিনি মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরামর্শ কমিটির সদস্য নিযুক্ত হন। ১৯৬৮ সালে সৌদি শিক্ষামন্ত্রীর পক্ষ থেকে রিয়াদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শরিয়া বিভাগের পাঠ্যসূচি প্রণয়নে পরামর্শ দেওয়ার জন্য তাকে আমন্ত্রণ করা হয়। ১৯৮০ সালে জর্ডান আরবি অ্যাকাডেমির সদস্য নির্বাচিত হন। একই বছর ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক সেন্টারের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮৪ সালে বিশ্ব ইসলামি সাহিত্য সংগঠনের মহাপরিচালক নিযুক্ত হন।

তিনি ১৯৮৪ ও ৯৪ সালে বাংলাদেশ সফর করেন। এ সময় শায়েখ সুলতান যওক নদভিকে জামিয়া দারুল মাআরিফের যাত্রা শুরু করার পরামর্শ দেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে আলেমদের ব্যাপকহারে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। প্রচণ্ড দরদ নিয়ে তিনি বলেন, ‘আল্লাহর ওয়াস্তে বাংলা ভাষার বাগডোর অন্যদের হাতে ছেড়ে দেবেন না। আপনারা চিরকাল পাঠক হবেন, আর অন্যরা লেখক হবে, এটা কাম্য নয়। বাংলাভাষা চর্চায় শিথিলতা আলেমদের বাংলাদেশে একঘরে করে রাখবে। সুতরাং সতর্ক থাকুন সবসময়।’

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অনেক পুরস্কার লাভ করেছেন তিনি। সেসব পুরস্কার থেকে প্রাপ্ত সব অর্থ ব্যয় করে দেন আল্লাহর রাস্তায়। তার এক পুরস্কার গ্রহণকে কেন্দ্র করে বিশ্ব মিডিয়ায় ব্যাপক আলোড়ন তৈরি হয়। ১৯৯৮ সালে দুবাই সরকার তাকে শ্রেষ্ঠ ইসলামি ব্যক্তি হিসেবে মনোনীত করে এবং পুরস্কার গ্রহণের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানায়। তিনি বিনয়ের সঙ্গে জানিয়ে দেন, পুরস্কার গ্রহণের জন্য তিনি কোথাও যান না। তার এই সিদ্ধান্তে দুবাই সরকারের জন্য একটি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। তার মতো একজন মহৎ ব্যক্তিত্বকে সম্মান জানাতে তারা তৎপর হয়ে ওঠে এবং সরাসরি ভারত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে। দুবাই থেকে একটি বিশেষ বিমান পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়, যা ভারতের উত্তর প্রদেশের লখনৌ এসে সেখান থেকে তাকে নিয়ে দুবাই যাবে। অনুষ্ঠান শেষে একই বিমান আবার তাকে লখনৌতে নিয়ে আসবে। কিন্তু লখনৌর অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরটি আন্তর্জাতিক ছিল না। দুবাই সরকারের অনুরোধে ভারত সরকার এক নজিরবিহীন উদ্যোগ গ্রহণ করে। লখনৌর অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপান্তরিত করে। জরুরি বহির্গমন ও ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে দিল্লি থেকে বিশেষ ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের লখনৌতে পাঠানো হয়। এমন আয়োজন ইতিহাসে বিরল, যা আগে কখনো দেখা যায়নি।

লেখালেখি ও গ্রন্থ রচনায় তিনি ছিলেন নিরবচ্ছিন্ন। কৈশোর জীবন থেকেই তিনি লেখালেখি করে পাঠকের হৃদয়ে স্থান করে নেন। ১৭ বছর বয়সেই তার লিখিত প্রবন্ধ মিসরের পত্রিকায় ছাপানো হয়। তার রচিত প্রথম গ্রন্থ ‘সিরাতে সাইয়েদ আহমদ শহিদ (রহ.)’। তার রচিত ‘মাজা খাসিরাল আলামু বি-ইনহিতাতিল মুসলিমিন’ (মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কী হারাল?) গ্রন্থটি পৃথিবীব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে। এছাড়াও মনীষী জীবনী, ইতিহাস, সাহিত্য ও রাসুল (সা.)-এর সিরাত নিয়ে তিনি রচনা করেছেন প্রায় দুই শতাধিক কালজয়ী গ্রন্থ।

মুসলিম উম্মাহর এই নিষ্ঠাবান রাহবার ১৯৯৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর সুরা ইয়াসিন  তেলাওয়াত অবস্থায় পরকালের পথে যাত্রা করেন। রায়বেরেলির মাকবারায় তাকে দাফন করা হয়। মহান আল্লাহ তাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন।