সরকারকে ১৫ দিন সময় দিল ছাত্ররা

‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র’ জারি করতে অন্তর্বর্তী সরকারকে ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির নেতারা। একই সঙ্গে গণহত্যার দায়ে শেখ হাসিনা, তার মন্ত্রিসভা এবং আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-েরও দাবি জানিয়েছেন তারা। গতকাল মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী এই প্ল্যাটফর্মের ডাকা মার্চ ফর ইউনিটি কর্মসূচিতে এসব দাবি জানানো হয়েছে।

জাতীয় নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘ছাত্র-জনতার দাবির মুখে অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র জারির উদ্যোগ নিয়েছে। এটি আমাদের বিজয়। এ ঘোষণাপত্রে একাত্তর, নব্বই এবং চব্বিশের মানুষের গণআকাক্সক্ষা থাকতে হবে। সরকারকে হুঁশিয়ার করতে চাই, অতিদ্রুত ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপে সক্রিয় হোন।’

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘এতদিন আমাদের কোনো ঘোষণাপত্র ছিল না। আগামী ১৫ জানুয়ারির মধ্যে ঘোষণাপত্র জারি করতে হবে। মুজিববাদীদের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই সংগ্রাম জারি থাকবে।’ গত রবিবার এক সংবাদ সম্মেলনে ‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র’ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশের মাধ্যমে পাঠ করার ঘোষণা দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। ঘোষণাপত্রকে নতুন সংবিধান হিসেবে অভিহিত না করলেও এটিই যে বাহাত্তরের সংবিধান রিপ্লেসের প্রক্রিয়া, সে বিষয়ে ওই সংবাদ সম্মেলনে মন্তব্য করেছিলেন আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ। তবে ওই ঘোষণা নিয়ে রাজনৈতিক দল ও অংশীজনদের মধ্যে নানা দ্বিমত দেখা দেয়। এ পরিস্থিতিতে গত সোমবার রাতে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র তৈরির ঘোষণা দেওয়া হয়। পরে কর্মসূচি পরিবর্তন করে ঘোষণাপত্রের পক্ষে মার্চ ফর ইউনিটি (ঐক্যের জন্য যাত্রা) কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

গতকাল সকাল থেকেই কর্মসূচিতে যোগ দিতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মিছিল নিয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জড়ো হন ছাত্র-জনতা। মিছিল থেকে শেখ হাসিনার বিচারের দাবি এবং ‘মুজিববাদ মুর্দাবাদ, ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ইত্যাদি স্লোগান দেয় তারা। বেলা সাড়ে ৩টার মধ্যে শহীদ মিনার এলাকা মার্চ ফর ইউনিটি কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া অন্তত কয়েক হাজার মানুষের জমায়েত হয়। বেলা ৪টায় জুলাই আন্দোলনে নিহতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালনের মধ্যে দিয়ে শুরু হয় কর্মসূচি।

এদিকে পূর্বঘোষিত ‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র’ পাঠের কর্মসূচি শেষ মুহূর্তে স্থগিত হওয়ায় নেতাকর্মীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এ সিদ্ধান্তে অনেকে মর্মাহত হয়েছেন। আবার কেউ বলছেন এটাও একটা বিজয়। সরকারের হাত দিয়ে প্রকাশ পেলে ঐক্যবদ্ধ ঘোষণা হবে। রাজশাহী থেকে আসা সমন্বয়ক হামিদুল ইসলাম বলেন, ‘ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে আমরা গতকাল সন্ধ্যায় রওনা দিই। কিন্তু শেষমুহূর্তে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসায় সেটা থেকে বঞ্চিত হলাম। আমরা কিছুটা মর্মাহত। আমরা মনে করি কারও ষড়যন্ত্রে এটা বাতিল হয়েছে। আশা করি অতি শিগগিরই তা প্রকাশ করা হবে।’

নোয়াখালী থেকে আসা আরেক সমন্বয়ক আশরাফ উদ্দিন বলেন, ‘এ ঘোষণাপত্র আরও আগেই প্রকাশ করা দরকার ছিল। দেরিতে হলেও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সেই উদ্যোগটা নিয়েছে। ফলে সরকার এখন নিজেই এ দায়িত্ব নিয়েছে। এটাও আমাদের বিজয়। তবে কোনো টালবাহানা আমরা মানব না। ১৫ জানুয়ারির মধ্যেই তা প্রকাশ করতে হবে।’

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র উমামা ফাতেমা বলেন, ‘আমরা রীতিমতো বাধ্য হয়ে এখানে উপস্থিত হয়েছি। পাঁচ মাস পর এ ঘোষণাপত্রের উদ্যোগ নিতে হলো। আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, গণহত্যার দায়ে আওয়ামী লীগের বিচার নিশ্চিতের আগে কোনো নির্বাচন হবে না।’

জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখপাত্র সামান্তা শারমিন বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের পাঁচ মাস পরেও কেউ জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্রের উদ্যোগ নেয়নি। তাদের ১৫ জানুয়ারির মধ্যে এটি ঘোষণা করতে হবে। কোনো ধরনের ষড়যন্ত্র আমরা বরদাশত করব না। এ সময় তিনি ছাত্র-জনতাকে একতাবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।

নতুন সংবিধান প্রণয়নে গণপরিষদ নির্বাচনের দাবি জানিয়ে জাতীয় নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ জুলাই বিপ্লবের ঘোষণা চায়। নতুন সংবিধান চায়। নতুন সংবিধান বাংলাদেশের মানুষের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমেই হবে। আগামী নির্বাচন হবে গণপরিষদ নির্বাচন।’

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্য সচিব আরিফ সোহেল বলেন, ‘আমরা অভ্যুত্থানে ঘোষণা দিয়েছিলাম নতুন বন্দোবস্তের জন্য। এ জনআকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে আমাদের ঘোষণাপত্র। এর মাধ্যমে দেশের ঐক্য আরও শক্তিশালী হবে বলে আমরা মনে করি। দেশের স্বার্থে সব দল মতের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। ফ্যাসিস্টরা এখনো ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে এক থাকা সবচেয়ে বেশি জরুরি।

গোপালগঞ্জে মার্চ ফর ইউনিটি কর্মসূচি অংশ নিতে আসা বাসে হামলার ঘটনায় ক্ষোভ জানিয়ে জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারকে স্পষ্ট করে বলতে চাই, যেসব খুনি বিদেশে পালিয়ে গেছে তাদের ফেরত আনতে হবে, তাদের পাচার করা অর্থ ফেরত আনতে হবে। গোপালগঞ্জে লুকিয়ে থাকা তাদের দোসরদের গ্রেপ্তার করতে হবে।’

কর্মসূচিতে উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শহীদ শাহরিয়ার হাসান আলভীর বাবা আবুল হাসান, পুলিশের গুলিতে আহত খোকন চন্দ্র বর্মণ, আতিকুল গাজীসহ শহীদ পরিবারের সদস্য এবং আহতরা। ছাত্র আন্দোলনে শহীদদের পরিবারের পক্ষে বক্তব্য দিয়ে শহীদ মীর মুগ্ধের বাবা অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহত সবাইকে ‘বিপ্লবী যোদ্ধা’ হিসেবে ঘোষণার দাবি জানান। আরও বক্তব্য রাখেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নুসরাত তাবাসসুম, খান তালাত মাহমুদ রাফি, রিফাত রশীদ, মাহিন সরকার, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক শ্যামলী সুলতানা, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ক রফিকুল ইসলাম আইনী প্রমুখ।