অগ্নিকান্ডের রহস্য জানা গেল!

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ৫৩ বছরে অসংখ্য অগ্নিকা- ঘটেছে।  প্রাণহানি যেমন হয়েছে, তেমনি সম্পদ নষ্ট হয়েছে প্রচুর। এরপর সরকারের পক্ষ থেকে তৈরি হয়েছে তদন্ত কমিটি। তারা নির্দিষ্ট সময় পর তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে। কিন্তু কোনো প্রতিবেদনই সর্বমহলে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। ফিরে আসেনি আস্থা। শুধু দোষ চাপানোর অদ্ভুত প্রতিযোগিতা এবং কোনো না কোনো ক্রটি চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু আগুনের মূল কারণ জানা যায়নি। যে কারণে অপরাধী চক্রও থেকে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।  গত ২৫ ডিসেম্বর গভীর রাতে সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনে আগুন লেগে ষষ্ঠ  থেকে নবমতলায় থাকা পাঁচটি মন্ত্রণালয়ের দপ্তর পুড়ে যায়। এর মধ্যে অষ্টম ও নবমতলার অধিকাংশ নথি পুড়ে গেছে। ভয়াবহ এ আগুন নেভানোর কাজ করতে গিয়ে পানির সরবরাহ লাইন সংযোগ দেওয়ার সময় ফায়ার সার্ভিসের একজন কর্মী ট্রাকচাপায় নিহত হন। প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে দীর্ঘ ১০ ঘণ্টা সময় ধরে জ্বলা এ আগুন লাগার পর তা দুর্ঘটনা নাকি নাশকতা, সেই আলোচনাও সামনে আসে। সরকারের উপদেষ্টাদের পক্ষ থেকেও ষড়যন্ত্র ও নাশকতার বিষয়টি সামনে আনা হয়। এরপর অগ্নিকাণ্ডের কারণ খতিয়ে দেখতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবের  নেতৃত্বে আট সদস্যের কমিটি গঠন করে সরকার। এবার তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে আগুনের সূত্রপাত ‘বৈদ্যুতিক গোলযোগ’ হিসেবে উঠে এলো। কিন্তু এর ফলে কি সত্যিকার অর্থেই অগ্নিকান্ডের মূল কারণ চিহ্নিত হলো? এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে বুধবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

এই আগুনের পেছনে কোনো ব্যক্তি সংশ্লিষ্টতা পায়নি তদন্ত কমিটি। বিদ্যুতের দুর্বল সংযোগের কারণে এই আগুনের ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ভবনের ডিজাইন এবং বাতাসের গতির কারণে আগুন ছড়িয়ে পড়ে বলে জানানো হয়েছে। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তদন্ত কমিটির প্রধান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনি প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বিদ্যুতের ‘লুজ কানেকশনের’ কারণে। আগুনের কারণ খুঁজে বের করতে একাধিক দল কাজ করেছে। এমনটা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বুয়েটের একটি বিশেষজ্ঞ দল ছিল, দমকল বাহিনীর যারা ফায়ার হ্যান্ডেল করে তাদের এক্সপার্ট ছিল, সেনাবাহিনী থেকে তাদের বম্ব স্কোয়াড ছিল, তাদের বিশেষায়িত কুকুরগুলো ডগ স্কোয়াডও কাজ করেছে। পুলিশের সিআইডি থেকে তারা কাজ করেছে। সবাই মিলে একত্রে একটি বিষয়ে একমত হয়েছি যে, এটি একটি লুজ কানেকশনের কারণে ইলেকট্রিসিটি থেকে আগুনের উৎপত্তি হয়েছে। এটি আমাদের প্রাথমিক অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত। এতে অন্য কোনো ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা আমরা খুঁজে পাইনি।’ সরকারের পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র চাওয়ার পরই সচিবালয়ে আগুনের ঘটনায় জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছিলেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। আবার রাত থেকে সকাল পর্যন্ত সচিবালয়ে আগুন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য গোয়েন্দা সংস্থা ও সরকারের দায় আছে বলে মনে করে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি। বাংলাদেশ সচিবালয়ের অগ্নিকাণ্ডকে ভয়াবহ ও নজিরবিহীন আখ্যায়িত করে এ ঘটনা ‘পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র’ বলে মনে করছে জাতীয় নাগরিক কমিটি। প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে নিরাপত্তা জোরদার এবং অগ্নিপ্রতিরোধ সুরক্ষা বাড়াতে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসকে চিঠি দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন।

সবচেয়ে বড় কথা, প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয় যদি অগ্নিকান্ডের শিকার হয়, তাহলে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান কতটুকু সুরক্ষিত, সে বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হতেই পারে। বিভিন্ন সময় তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে মানুষের মধ্যে এক ধরনের আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। এটি দূর করতে হবে। যে কারণে বর্তমান তদন্ত প্রতিবেদনও প্রশ্নের বাইরে নয়। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, এই প্রতিবেদন নিয়ে কোনো ধরনের প্রশ্ন উঠবে না।