নিলামের দীর্ঘসূত্রতায় নষ্ট হচ্ছে হাজারো কনটেইনার। ৩০ দিনের মধ্যে কনটেইনারে থাকা পণ্য নিলাম করে কনটেইনার খালি করার বিধান থাকলেও তা বছরের পর বছর পড়ে থাকছে বন্দরের জেটিতে। এতে পণ্যের পাশাপাশি শিপিং লাইনগুলোকে হাজার কোটি টাকা গচ্চা দিতে হচ্ছে। বর্তমানে নিলামের অপেক্ষায় বন্দরের জেটিতে ৯ হাজারের বেশি কনটেইনার রয়েছে।
কয়েক হাজার কোটি টাকা মূল্যের পণ্য বোঝাই এসব কনটেইনার বছরের পর বছর ধরে আটকে থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এগুলো অনেক জায়গা দখল করে রাখায় বন্দরের কার্যক্রম যেমন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে তেমনিভাবে বৈদ্যুতিক ফ্রিজার কনটেইনারের (রেফার কনটেইনার) কারণে অপচয় হচ্ছে বিদ্যুৎ। তবে এই বিদ্যুৎ বিলের টাকা শিপিং লাইন কোম্পানি থেকে আদায় করে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট সৈয়দ মোহাম্মদ আরিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বছরের পর বছর কনটেইনার আটকে থাকায় এমনিতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিপিং কোম্পানিগুলো। তাদের ওপর আবার রেফার কনটেইনারের বিদ্যুৎ বিল বাড়তি বোঝা। আবার কখনো রেফার কনটেইনারগুলো দীর্ঘদিন পড়ে থাকার কারণে অকেজো হয়ে যায় তখন তো শিপিং কোম্পানিগুলোর পুরোটাই লস।’
এই লসের বর্ণনা দিতে গিয়ে এমএসসি শিপিং লাইনের হেড অব অপারেশনস আজমির হোসাইন চৌধুরী বলেন, ‘একটি কনটেইনার মাসে গড়ে একটি করে ভয়েস (ভাড়ায় যাওয়া) করতে পারে। সে হিসেবে বছরে ১২টি ভয়েস করতে পারার কথা। সে হিসেবে গড়ে বছরে প্রায় ৭০ থেকে ৭২ লাখ টাকা ভাড়ায় আয় হওয়ার কথা। এখন বছরের পর বছর বন্দরের ইয়ার্ডে পড়ে থাকার কারণে কনটেইনার মালিক এই আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আবার যদি কনটেইনারটি নষ্ট হয়ে যায় তাহলে তো সবই ক্ষতি।’
তিনি আরও বলেন, ‘শুধু আমাদেরই প্রায় সাড়ে তিনশ’র বেশি কনটেইনার প্রায় ১৩ বছর ধরে আটকা রয়েছে। এতে শিপিং কোম্পানিগুলো দুই দিক দিয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা ভাড়া থেকে যেমন বঞ্চিত হচ্ছি তেমনিভাবে আমাদের কনটেইনারগুলো নষ্টও হয়ে যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দর সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ড এবং শেডে পণ্য বোঝাই অবস্থায় ২ হাজার ৮৩৫টি ২০ ফুট সাইজের এবং ৩ হাজার ৮০৬টি ৪০ ফুট সাইজের এফসিএল (পণ্যভর্তি) কনটেইনার বছরের পর বছর নিলামের অপেক্ষায় পড়ে রয়েছে। এর বাইরে ৭২ হাজার ৪৮৪ প্যাকেজ এলসিএল খোলা পণ্য এবং ৬ হাজার ৭৮৪ প্যাকেজ বাল্ক কার্গো নিলামে বিক্রির জন্য রাখা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী আমদানির ৩০ দিনের মধ্যে ছাড় না হওয়ায় নিলামে বিক্রির জন্য বাই পেপার চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের কাছে হস্তান্তর হলেও বিক্রি দূরে থাকুক নানা জটিলতায় নিলামেও তোলা যায়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক বলেন, ‘আমরা নির্ধারিত সময়ের (৩০ দিন) পর কাস্টমসের কাছে পণ্যসহ কনটেইনারগুলোর ডকুমেন্টারি হস্তান্তর করি। কিন্তু বাস্তবে এগুলো বন্দরের জেটিতে রয়ে যায়। পদ্ধতিগত নানা জটিলতায় পণ্যগুলো নিলাম বা ধ্বংস প্রক্রিয়া বিলম্বের কারণে বন্দর কর্তৃপক্ষ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তেমনিভাবে এর সঙ্গে জড়িত শিপিং কোম্পানিসহ সংশ্লিষ্টরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
ক্ষতি হচ্ছে কত টাকা : বিশে^র সব বন্দরে কনটেইনার থেকে পণ্য নামিয়ে কনটেইনার খালি করে দিলেও আমাদের দেশে ব্যতিক্রম বলে জানায় শিপিং কোম্পানিগুলো। শুধু তাই নয়, এসব কনটেইনার নিলামে বিক্রি না হলে পণ্য ধ্বংস করার পর কনটেইনার ভাড়া বাবদ শিপিং কোম্পানিগুলো কোনো টাকা পায় না। আবার নিলামে বিক্রি করা হলে বিক্রির একটি অংশের টাকা শিপিং কোম্পানি পেয়ে থাকে। কিন্তু নিলামের চেয়ে ধ্বংসই বেশি হয় তখন উল্টো টাকা দিয়ে ধ্বংস করতে হয়। বর্তমানে ২০ ফুটের একটি কনটেইনারের বাজারমূল্য প্রায় চার লাখ টাকা ও ৪০ ফুট কনটেইনারের মূল্য ৬ লাখ টাকা। অপরদিকে ২০ ফুটের একটি ফ্রিজার কনটেইনারের মূল্য ৫০ লাখ টাকা ও ৪০ ফুটের ফ্রিজার কনটেইনারের মূল্য প্রায় ৬০ লাখ টাকা। কনটেইনারটি নষ্ট হলে আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কোম্পানিগুলো। নষ্ট হলে একটি কনটেইনার থেকে ক্ষতি গড়ে ৬ লাখ টাকা। তাহলে ৯ হাজার কনটেইনারে ক্ষতি ৫৪০ কোটি। আবার এক বছর ভয়েস করতে না পারলে একটি কনটেইনার বঞ্চিত হচ্ছে গড়ে ৭০ লাখ টাকা। তাহলে ৯ হাজার কনটেইনার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ৬ হাজার ৩০০ কোটি টাকা বছরে। ১৩ বছর আটকে থাকলে ক্ষতি ৮১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। তাহলে মোট ৮২ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে কনটেইনারগুলো যথাসময়ে খালি করতে না পারায়। এর সঙ্গে রয়েছে আবার পণ্যের মূল্য।
নিলাম বা ধ্বংস প্রক্রিয়ায় কাজটি করে থাকে চট্টগ্রাম কাস্টমস। এ বিষয়ে কাস্টমসের পণ্য ধ্বংসের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী কমিশনার সাকিব হোসেন বলেন, সাধারণত প্রথম নিলামে ভিত্তি মূল্যের ৬০ শতাংশ দাম পাওয়া না গেলে ওঠে দ্বিতীয় নিলামে। দ্বিতীয় নিলামে আবার প্রথম নিলামের সমান মূল্য পাওয়া না গেলে তৃতীয় নিলামে যেতে হয়। এতে বিলম্বিত হচ্ছে। আবার কোনো পণ্যের ওপর মামলা থাকলে তা নিলামও করা যায় না। সব মিলিয়ে আমরা চাইলেও পণ্য নিলাম বা ধ্বংস করতে পারি না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পণ্য সরিয়ে কনটেইনার খালি করে দেওয়ার উদাহরণ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘কনটেইনার নিয়ে গেলে পণ্যটি উন্মুক্ত হয়ে যাবে। তখন পণ্যের নিরাপত্তা কে দেবে? এছাড়া পণ্যগুলো রাখার পর্যাপ্ত জায়গারও বিষয় রয়েছে। সব মিলিয়ে তা সম্ভব নয়। তবে আমরা চেষ্টা করছি নিলাম আইনটি সহজ করার জন্য। আর তা করা গেলে দ্রুত কার্যক্রম শেষ করা যাবে।’
উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের আমদানি-রপ্তানির ৯২ শতাংশ পণ্য পরিবাহিত হয়ে থাকে। দেশের অর্থনীতিতে এই বন্দরের গুরুত্ব অনেক। এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি এবং রপ্তানি পণ্য থেকে বছরে প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ। বিধি অনুযায়ী কোনো পণ্য খালাসের পর ৩০ দিনের মধ্যে আমদানিকারক ডেলিভারি না নিলে তা নিলামযোগ্য হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে এগুলো নিলাম বা ধ্বংস করার এখতিয়ার রয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টমসের।