‘ধার করে পেঁয়াজ রোপণ করেছিলাম। পেঁয়াজ রোপণের পরেই বৃষ্টি হয়। এতে অনেক পেঁয়াজ পচে যায়। এখন ধারের টাকা পরিশোধ করতে হবে। আরও ১৫দিন পরে এই পেঁয়াজ তুলতে পারতাম। কিন্তু বাজারে পেঁয়াজের দাম যে হারে কমে যাচ্ছে এখন আমার লাভ তো দূরের কথা বিঘাপ্রতি ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা লোকসান হবে।’ এমনটাই বলছিলেন রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার মহেন্দ্রপুর গ্রামের পেঁয়াজ চাষি আব্দুর রব।
রাজবাড়ীতে আব্দুর রবের মত হাজারো পেঁয়াজ চাষিরা লোকসানের দুশ্চিন্তায় দিন পার করছেন। ইতিমধ্যে আগাম রোপণকৃত পেঁয়াজ বাজারে উঠতে শুরু করেছে। চলতি বছরের অসময়ে বৃষ্টি হওয়ায় পেঁয়াজ রোপণে দেরি হয়েছে প্রায় এক মাস। এ কারণে কমেছে পেঁয়াজের উৎপাদন। খরচের তুলনায় কাক্সিক্ষত দাম না পেলে বড় ধরনের লোকসান গুনতে হবে পেঁয়াজ চাষিদের।
পেঁয়াজ চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি বছরে এক বিঘা (৩৩ শতাংশ) জমিতে পেঁয়াজ রোপণ করতে খরচ হয়েছে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা। পেঁয়াজ রোপণ পিছিয়ে যাওয়াও বিঘাপ্রতি উৎপাদন কম হতে পারে ৮ থেকে ১০ মণ। এক দিকে উৎপাদন কম হওয়া ও বাজারে দাম কমে যাওয়ায় বিঘাপ্রতি লোকসান গুনতে হবে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। কৃষকদের দাবি এ সময়ে সরকার যেন পেঁয়াজ আমদানি না করে।
রাজবাড়ী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর জেলায় মুড়িকাটা পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে ৫ হাজার ৮৭০ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ আবাদ হয়েছে গোয়ালন্দ উপজেলায় ২ হাজার ২৩০ হেক্টর জমিতে। এরপরই রয়েছে কালুখালী উপজেলা ১ হাজার ৬৬৫ হেক্টর । আর সবচেয়ে কম আবাদ হয়েছে সদর উপজেলায় ৩৫০ হেক্টর জমিতে। এ ছাড়া বালিয়াকান্দি উপজেলায় ১ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে ও পাংশা উপজেলায় ৪২৫ হেক্টর জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। কালুখালী উপজেলার রতনদিয়া ইউনিয়নের মহেন্দ্রপুর মাঠে গিয়ে দেখা যায়, যত দূর চোখ যায় শুধু পেঁয়াজের খেত। কিছু কিছু জমিতে পেঁয়াজ তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা। পুরুষ শ্রমিকরা মাটি থেকে পেঁয়াজ টেনে তুলছেন। আর নারী শ্রমিকরা সেই পেঁয়াজ থেকে আগাছা পরিষ্কার করছেন। জমিতে চট বিছিয়ে পেঁয়াজ রোদে শুকানোর জন্য দেওয়া হয়েছে। উপরন্তু স্তর শুকিয়ে গেলেই নেওয়া হবে বাজারে।
পেঁয়াজ চাষি আব্দুল রব বলেন, আমি এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করেছিলাম। পেঁয়াজ আবাদ করতে আমার ১ লাখ ১০ হাজার টাকার কাছাকাছি খরচ হয়েছে। যে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে তাকে ৫০ থেকে ৫৫ মণ পেঁয়াজ হবে। বাজারে প্রতিমণ পেঁয়াজ এখন ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এতে আমার প্রায় ২৫ হাজার টাকা লোকসান হবে।
একই এলাকার চাষি মজিবর রহমান বলেন, এ বছর চার বিঘা জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজ রোপণ করেছি। উৎপাদন খরচ গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু উৎপাদন গত বছরের তুলনায় অনেক কম হয়েছে। বর্তমান পেঁয়াজের দাম অনেক কমে গেছে, এভাবে চলতে থাকলে লাভ তো দূরের কথা আসলই উঠবে না।
স্বপন খান নামে আরেক চাষি বলেন, কয়েক দিন আগেও বাজারে এক কেজি পেঁয়ারে দাম ছিল ১০০ টাকার উপরে। এক কেজি বীজ কিনতে হয়েছে আমাদের ২০০ থেকে ৩০০ টাকায়। অথচ এখন আমাদের ফসল ঘরে ওঠার সময় হয়েছে। আর এখন পেঁয়াজ আমদানি করে বাজারে পেঁয়াজের দাম কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। কৃষক বাঁচল না মরল এইটা কোনো সরকারই দেখে না। সরকারের কাছে দাবি জানাই এখন যেন আর কোনো পেঁয়াজ আমদানি না করা হয়।
পেঁয়াজ কাটতে আসা রাবেয়া নামে এক নারী বলেন, মৌসমের প্রথম পেঁয়াজ কাটছেন তারা। গত বছর প্রতিমণ ৫০ টাকা করে পেঁয়াজের আগাছা পরিষ্কার করেছেন তারা। কিন্তু এ বছর পেঁয়াজের দাম কম হওয়ায় পেঁয়াজ কাটাবাবদ তাদের দিচ্ছে ৪০ টাকা।
গত মঙ্গলবার রাজবাড়ী শহরের বড় বাজারে গিয়ে দেখা যায় পাইকারি পর্যায়ে প্রতিমণ পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, এ বছর আগাম পেঁয়াজ রোপণের পরে বৃষ্টি হওয়ায় কিছু পেঁয়াজ বীজ পচে গিয়েছিল। এ কারণে যারা আগাম পেঁয়াজ উৎপাদন করেছিল তাদের উৎপাদন কিছুটা কম হচ্ছে। কিন্তু যারা পরে রোপণ করেছিল তাদের উৎপাদনে ঘাটতি হবে না। বাজারে পেঁয়াজের দাম কিছুটা কমেছে। এই মুহূর্তে বাজারে যথেষ্ট পেঁয়াজ আছে। এখন পেঁয়াজ আমদানি করলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। আজও আমাদের মিটিং আছে। আমি সেখানেও বিষয়টি উত্থাপন করব।