নিহতদের পরিবারের সামনে শুধুই অন্ধকার

রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার নবীনগর হাউজিং এলাকার ১২ নম্বর সড়ক ধরে কিছুক্ষণ হাঁটলেই চোখে পড়বে একটি ছোট্ট ঘর। টিন দিয়ে চারদিকে ঘেরা ঘরটির ওপরও টিনের ছাউনি। জানালাহীন এই অন্ধকার ঘরে মশারির ভেতরে এক কোণে বসে আছেন এক নারী, কোলে তার চার মাস বয়সী এক শিশু। শিশুটি যখন মায়ের গর্ভে তখন তার বাবা মো. জাবেদ (২৭) কারাগারে। আর যখন শিশুটির জন্ম হলো তার ঠিক এক মাস আগেই তার বাবা কারাগারে থাকা অবস্থায় কারারক্ষীদের গুলিতে প্রাণ হারান।

জুলাই অভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন বিদ্যুতের মিটার মিস্ত্রি ও চন্দ্রিমা হাউজিংয়ের নিরাপত্তাকর্মী জাবেদ। তারপর থেকেই আদালতের মাধ্যমে তাকে কেরানীগঞ্জের কারাগারে পাঠানো হয়। ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর দেশের অন্য কারাগারগুলোর মতো সেখানেও বিদ্রোহ করেন বন্দিরা। বিদ্রোহ দমনে গুলি চালান কারারক্ষীরা। সেই গুলি এসে লাগে জাবেদের ডানপাশের গালে। এরপর কারাগার থেকে তাকে মিরপুরের একটি হাসপাতালে নেয় পুলিশ। সেখানে একটি অপারেশন শেষে জাবেদকে পাঠানো হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে। ঢামেকেই চিকিৎসারত অবস্থায় গত ১৩ আগস্ট তার মৃত্যু হয়। জাবেদের মৃত্যুতে অন্ধকার নেমে আসে পরিবারে। দুধের শিশুকে নিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তার স্ত্রী আকলিমা খাতুনের। গত ২৫ ডিসেম্বর এ টিনের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে কথা হয় আকলিমার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী বিএনপির কর্মী আছিল। তারে ধইরা নেওয়ার আগের দিন মিছিলে গেছিল। মিছিলে যাওয়ার লাইগা পুলিশ ধইরা নিয়া ছিনতাই মামলা দিয়া জেলে পাঠাইছে। জেলে থাকা অবস্থায় ৫ তারিখ গুলি লাগে তার। এরপর ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসার সময় আট দিন পর মইরা যায়।’

আকলিমার প্রশ্ন কী এমন অপরাধ ছিল যে জাবেদকে গুলি করে মারতে হবে? সেই সঙ্গে স্বামীর মৃত্যুর জন্য সরকারের তরফ থেকে যেন পরিবারকে সহায়তা দেওয়া হয় এমন দাবি তুলে বলেন, ‘তার আয়ের ওপর আমাদের সংসার চলত। হে নাই, এহন আমাগো খায়া-না খায়া দিন যায়। কী এমন দোষ ছিল তার, গুলি কইরা মারতে হইল। মরার পরে সরকারের তরফ থাইকা কোনো সহায়তাও দেয় নাই। কত মানুষ আইসা ওয়াদা দিয়া গেছে সহায়তা দিব কিন্তু কেউ দেয় নাই।’

নিহত জাবেদের স্ত্রীর প্রশ্নের উত্তর জানতে চাওয়া হয় কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেনের কাছে। তিনি বলেন, ‘দেশের সব কারাগার থেকে যদি সব বন্দি পালিয়ে যেত তাহলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কী হতো? এটা তো রক্ষা করতে হতো। সেই রক্ষা করতে গিয়ে... যেহেতু তাদের ভেতরে বিদ্রোহ ছিল, তাদের দমন করতে হয়েছে। এজন্য কিন্তু আমাদের কারারক্ষীদের ফায়ার ওপেন করতে হয়েছিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে যতটুকু হতাহতের ঘটনা হওয়ার কথা ছিল, ততটুকুই হয়েছে। আমার মনে হয় সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে তখনকার কর্র্তৃপক্ষরা সঠিক পদক্ষেপই নিয়েছিল। এটা অবশ্যই কারাগারকে সুরক্ষিত রাখার প্রচেষ্টা হিসেবে। পুরো পরিস্থিতি ছিল নিয়ন্ত্রণের বাইরে। সেই প্রেক্ষাপটে হয়তো ফায়ার ওপেন করতে হয়েছিল। এ কারণেই হতাহত হয়েছে। যার মধ্যে এই যুবক ছিল। আমরা একটা অভ্যন্তরীণ তদন্ত করেছি। সেখানে উঠে এসেছে কী কারণে কোন পরিস্থিতিতে ফায়ার ওপেন করা হয়েছিল এবং সেগুলো আমরা চিহ্নিত করতে পেরেছি।’

তবে এ ধরনের মৃত্যু কোনোভাবেই কাম্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন কারা মহাপরিদর্শক। তিনি বলেন, ‘ভেতরে তাদের মধ্যে একটা বিদ্রোহের মতো পরিস্থিতি ছিল। তারা সব ভেঙে বের হয়ে যেতে চেয়েছিল। সেই সময় ফায়ার ওপেন করার কারণেই কিন্তু কারাগারটা সুরক্ষিত ছিল। যে মৃত্যুগুলো হয়েছে সেটা খুব দুর্ভাগ্যজনক। আমরা কোনোভাবেই চাইনি যে আমাদের কোনো কয়েদি মারা যাক। কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিকল্প কোনো পথও ছিল না।’

তিনি আরও বলেন, ‘সরকারি দায়িত্ব-কর্তব্য পালনের সময় যদি ফায়ার ওপেন করা হয় নিরাপত্তার কারণে তাহলে দায়টা সরকারের। এ ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে অস্বাভাবিক মৃত্যুর কারণ দেখিয়ে। আমাদের তরফ থেকে আমরা যেটা পেয়েছি (তদন্তে) পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের কারণে গুলি করা হয়েছিল, সেখান থেকে তার গায়ে লেগেছে।’

নবীনগর এলাকার স্থানীয়দের সঙ্গে কথা হয় জাবেদের ব্যাপারে। এলাকার এক চা বিক্রেতা বলেন, ‘জাবেদ মাঝেমধ্যে ছিনতাই করত। এর আগেও তাকে কয়েকবার পুলিশ ধরে নিয়েছিল। আন্দোলনের সময়ও ধরে নিয়ে যায়। তবে সে মিছিলে গিয়েছিল কি না জানি না।’ এদিকে মোহাম্মদপুর থানা সূত্রে জানা গেছে, জাবেদের নামে থানায় দুটি ছিনতাই মামলা আছে।

জুলাই অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে এবং সরকার পতনের দিন থেকে পরের কয়েক দিন দেশের কারাগারগুলোতে বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয় কেন্দ্রীয় কারাগার কেরানীগঞ্জে, কাশিমপুর কারাগার, নরসিংদী, জামালপুর, শেরপুর ও চট্টগ্রাম কারাগারে। এসব কারাগারে বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলা দমনে গুলি চালায় কারারক্ষীরা। এতে জাবেদসহ অন্তত ১৪ জন বন্দি নিহতের ঘটনা নিশ্চিত হওয়া গেছে। যদিও এসব বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলায় কারাগার ও কারারক্ষীদের নানা ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে আনুষ্ঠানিক তথ্য জানিয়েছে কারা অধিদপ্তর। তবে বিদ্রোহ দমনের সময় কতজন বন্দি নিহত হয়েছেন, সেটা জানানো হয়নি। কারা মহাপরিদর্শক বলেন, ‘বিদ্রোহের ঘটনায় কাশিমপুর কারাগারে নিহত হয়েছেন ছয়জন এবং কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে নিহত হয়েছেন দুজন।’ এ ছাড়া জামালপুরে বন্দিদের বিদ্রোহের সময় সেখানে আরও ছয়জন নিহতের খবর পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে ১৪ জন বন্দি নিহতের খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাদের মধ্যে কাশিমপুর কারাগারে নিহত হয়েছেন ইমতিয়াজ পাবেল, মো. জিন্নাহ, মো. আসলাম হোসেন র‌্যাশ, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আবজাল হোসেন, রাধেশ্যাম ও স্বপন শেখ। কেরানীগঞ্জ কারাগারে নিহত হয়েছেন জাবেদসহ আরও একজন। এ ছাড়া জামালপুর কারাগারে গুলিতে নিহত কয়েদিরা হলেন জামালপুর সদর উপজেলার ফাহিমের ছেলে আরমান, মাসুদের ছেলে শ্যামল, নুরুল ইসলামের ছেলে জসিম, ফজলে রাব্বি বাবু, রায়হান ও রাহাত।

গুলিতে নিহত বন্দিদের পরিবারের জন্য কোনো সহযোগিতার ব্যবস্থা আছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে কারা মহাপরিদর্শক বলেন, ‘না, এই মুহূর্তে আমরা সেটা করিনি। এটা করবে সরকারের অন্য সংস্থাগুলো। আমরা আমরা পক্ষ থেকে তাদের আইনি যে সহায়তা লাগে সেটায় সহায়তা করছি। আমরা পারিবারিক সাহায্য-সহযোগিতা করতে পারি না। এটা রাষ্ট্রই দেখবে।’

সারা দেশের কারাগারগুলোর মধ্যে ১৭টি কারাগারে বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে উল্লেখ করে কারা মহাপরিদর্শক বলেন, ‘১৭ কারাগারে বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলা হয়েছে। এর মধ্যে নরসিংদী ও শেরপুর কারাগারের অবস্থা একেবারেই খারাপ। এগুলো পরিত্যক্তই বলা যায়। এগুলো আগুনে ভস্মীভূত করে দেওয়া হয়েছে। এ দুই কারাগারের সব বন্দিই চলে গিয়েছিল। অস্ত্র লুট হয়েছে নরসিংদী কারাগার থেকে।’ কারা বিদ্রোহের ঘটনায় সারা দেশে দুই শতাধিক কারারক্ষী আহত হয়েছেন। সেই সঙ্গে কারাগারের হেফাজতে চিকিৎসা নিয়েছেন অন্তত ৫০ বন্দি।

কারা সূত্রে জানা গেছে, সাত শতাধিক বন্দি এখনো পলাতক। তাদের মধ্যে ৮০ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, ৭৮ জন জঙ্গি।