উজানের বাঁধে ভাটিতে ভয়

বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ বাঁধ হতে পারে তিব্বতে এমন একটি নির্মাণকাজের অনুমোদন দিয়েছে চীন। তিব্বত মালভূমির পূর্ব পাশে ইয়ারলুং জাংপো নদীর নিম্ন প্রবাহে (ব্রহ্মপুত্রের উজানে) এ প্রকল্পের কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নিম্নপ্রবাহে ভারত ও বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে গত সপ্তাহে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর বড় পরিসরে আলোচনা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের তরফে এখনো সরকারিভাবে কিছু বলা না হলেও ভারত সরকার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। গত শুক্রবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল এ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, এ বিষয়ে ভারতের মতামত ও উদ্বেগের কথা চীনকে জানানো হয়েছে।

ব্রহ্মপুত্রের উজানে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বা এ ধরনের বড় বাঁধ নির্মাণের বিষয়টি অনেক দিন ধরেই আলোচনায় আছে। গণমাধ্যমে এ নিয়ে অনেক লেখালেখিও হচ্ছে। কিন্তু তার মোকাবিলায় দুই ভাটির দেশ ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ প্রচেষ্টার কোনো ইঙ্গিত অতীতে ছিল না, এখনো নেই।অথচ প্রস্তাবিত বাঁধ নিশ্চিতভাবেই দুই ভাটির দেশ ভারত ও বাংলাদেশের নদীপ্রবাহে প্রভাব ফেলবে। দুই দেশই এ বিষয়ে চিন্তিত। তবুও যৌথ প্রচেষ্টা শুরু হয়নি।

রণধীর জয়সোয়াল বলেন, অভিন্ন নদীর ক্ষেত্রে ভাটির দেশেরও কিছু অধিকার আছে। রাজনৈতিক ও বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে সেই অধিকারের কথা বারবার জানানো হয়েছে। সেই অধিকার ও স্বার্থের বিষয়ে ভারতের পর্যবেক্ষণ জারি আছে। সরকার সেই মতো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও গ্রহণ করবে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, এ ধরনের প্রকল্প গ্রহণের আগে ভাটির দেশের সঙ্গে আলোচনা করা জরুরি। পরিস্থিতির ওপর ভারত নজর রাখছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হবে।

জয়সোয়াল বলেন, ওই তল্লাটে চীনের দখলদারি ভারত কখনো মেনে নেয়নি, নেবেও না। তাদের ওই ঘোষণা ভারতের সার্বভৌমত্বের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না। ওই এলাকা ভারতের ছিল, ভারতেরই থাকবে। কূটনৈতিক পর্যায়ে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হবে।

রয়টার্স জানায়, চীনের পাওয়ার কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের ২০২০ সালের হিসাব অনুযায়ী, ইয়ারলুং জাংপো নদীর নিম্ন প্রবাহে এই বাঁধ তৈরি হবে। এ প্রকল্প থেকে বার্ষিক ৩০ হাজার কোটি কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। এটি নির্মিত হলে তা হবে পৃথিবীর বৃহত্তম বাঁধ। বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প হলো চীনের মধ্যাঞ্চলীয় থ্রি গর্জেস বাঁধ। তিব্বতের প্রকল্পটি এর তিনগুণেরও বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ নিয়ে নকশা করা হবে।

চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানায়, এই প্রকল্পটি চীনের শূন্য কার্বন লক্ষ্য পূরণে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে আর প্রকৌশলের মতো সংশ্লিষ্ট শিল্পগুলোকে উজ্জীবিত করবে এবং তিব্বতে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র প্রসারিত হবে।

ইয়ারলুং জাংপো নদীর একটি অংশ ৫০ কিলোমিটারের একটি ছোট পরিসরের মধ্য দিয়ে নাটকীয়ভাবে ২ হাজার মিটার নিচে পড়েছে। এই অংশটিতে বিপুল পরিমাণ জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা আছে আর এটি একই সঙ্গে অনন্য প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ হয়ে আসবে।

রয়টার্স জানায়, তিব্বতের প্রকল্পের কারণে কত মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে আর এটি স্থানীয় আবাসকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত করবে কর্র্তৃপক্ষ তার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি। তিব্বত মালভূমির মধ্যে এই অংশটি প্রাকৃতিকভাবে সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় ও সমৃদ্ধ। তবে চীনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তিব্বতে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো পরিবেশের ওপর বা নিম্নপ্রবাহে পানি সরবরাহের ক্ষেত্রে বড় ধরনের কোনো প্রভাব ফেলবে না।

তাদের এমন দাবি সত্ত্বেও ভারত ও বাংলাদেশের জন্য এ বাঁধ নিয়ে উদ্বেগের অনেক কারণ আছে। প্রকল্পের সম্ভাব্য প্রভাবে শুধু স্থানীয় আবাসের পরিবর্তন হবে এমন নয়, এটি নিম্নপ্রবাহের নদীগুলোর পানি প্রবাহ ও গতিপথকেও প্রভাবিত করবে।

ইয়ারলুং জাংপো নদী তিব্বত থেকে বের হওয়ার পর ব্রহ্মপুত্র নাম নিয়ে দক্ষিণে ভারতের অরুণাচল প্রদেশ ও আসাম হয়ে শেষ পর্যায়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।