অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে সম্ভাব্য সময়সীমা ঘোষণা করেছেন। চলতি বছরের শেষের দিকে কিংবা আগামী বছরের শুরুতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলেছেন। তবে বিএনপি, জামায়াতসহ কয়েকটি দল মনে করে, সরকার চাইলে ২০২৫ সালের মধ্যেই সংসদ নির্বাচন করতে পারে। তারা চায় সরকার দ্রুত প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করুক। কেউ কেউ বলছেন, নির্বাচন কমিশন (ইসি) নতুন ভোটার তালিকা তৈরির যে কার্যক্রম নিয়েছে, তা এপ্রিল-মে মাসের মধ্যে শেষ হবে। এরপর সরকার ইসিকে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার নির্দেশ দিতে পারে। কেউ আবার ১৫ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন।
নির্বাচন ও নির্বাচনের তারিখের বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচন আয়োজনের জন্য অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজন নেই। নির্বাচন কমিশনসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরের সংস্কার সম্পন্ন হলে, ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব। তবে, নির্বাচন আয়োজনের জন্য সরকারকে আমরা ২০২৫ সালের পুরো সময়টাই দিতে চাই। তবে এ সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন না করা হলে রাজনৈতিক দলগুলো মানবে না।’ তিনি বলেন, ‘সংস্কার কমিশনগুলো তাদের প্রস্তাব দেওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার সেসব প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত করতে পারে। এরপর তা বাস্তবায়নে কাজ শুরু করতে পারে। এরপর নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারে। জনগণের ভোটে যারা ক্ষমতায় আসবে, তারা পুরো সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করবে।’
অবশ্য এর আগে ঠাকুরগাঁওয়ে এক জনসভায় মির্জা ফখরুল নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘আপনারা কী সত্যি সত্যি পরিবর্তন চান, না-কি আবার ওই আওয়ামী লীগের নৌকায় ফিরে যেতে চান। যদি পরিবর্তন চান, তবে ৫ আগস্ট আপনারা যেমন রাস্তায় নেমেছিলেন, আবারও ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাস্তায় নামতে হবে। ভোটের অধিকার, ভাতের অধিকার আদায়ের জন্য এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য রাস্তায় নামতে হবে।’
গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে অন্তর্র্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘২০২৫ সালের শেষ থেকে ২০২৬ সালের প্রথম দিকে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘একই সঙ্গে একটি জাতীয় ঐকমত্য কমিশন তার নেতৃত্বে আগামী মাসেই কাজ শুরু করবে। ওই কমিশনের কাজই হবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য যেসব বিষয় জরুরি, সেসব বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি করা।’
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়ে গেছে। কমিশন দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। এখন থেকে তাদের হাতে দায়িত্ব ন্যস্ত হলো ভবিষ্যৎ সরকার গঠন করার প্রক্রিয়া শুরু করার। তারা তাদের প্রস্তুতির কাজ শুরু করেছেন।’
নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, ‘আমরা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন চাই। যে নির্বাচন হতে হবে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ। নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, জনপ্রশাসনে শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে। ইতিমধ্যে পুলিশ, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন কাজ করছে। তারা তাদের সংস্কার প্রস্তাব দিলে সেগুলো বাস্তবায়ন শুরু হবে। তা ছাড়া নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা শুরু করেছে। তাদের প্রস্তুতির বিষয় আছে। এগুলো শেষ হলে অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে সুস্পষ্ট ঘোষণা দেবে। তবে মনে হচ্ছে, এসব কাজ করতে এক থেকে দেড় বছর লাগবে না।’
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান গত শুক্রবার এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘আমরা চাই আগামী দিনে অতি জরুরি সংস্কারকাজ শেষ করে বর্তমান সরকার সুষ্ঠু নির্বাচন দিয়ে যার যার জায়গায় ফিরে যাক। এ নির্বাচনে জনগণ যার ওপর আস্থা রাখবে, তাকে ভোট দেবে, যাদের ভোট দিলে দেশের মানুষকে সম্মান করবে, দেশের মানুষকে ভালোবাসবে। দেশের মানুষের আমানত শ্বশুরবাড়ির নিয়ামত মনে করবে না। চুরি করে দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার করবে না। যেমনটি সাড়ে ১৫ বছরে হয়েছে।’
‘সরকার চাইলে চলতি বছরেই নির্বাচন করতে পারে’ এমন মন্তব্য করে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন সরকারের দিক থেকে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) বার্তা দেওয়া দরকার যে তারা ২০২৫ সালের মধ্যে নির্বাচন করতে চায়। ইতিমধ্যে ইসি খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে। আগামী ২০ জানুয়ারি বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার কাজ শুরু করবে। আশা করি, আগামী এপ্রিল-মে মাসের মধ্যে নির্বাচনের প্রস্তুতিমূলক কাজগুলো সম্পন্ন করতে পারবে। তারপর সরকার নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করলে ইসি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে পারবে।’ তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকলে নানা ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়। ইতিমধ্যে তার কিছু লক্ষণ আমরা দেখছি। সরকারের উচিত দ্রুত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে কীভাবে সংস্কার শুরু করবে এবং কবে নাগাদ নির্বাচন দেবে, তা ঠিক করা। তারপর সরকারের দিক থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া দরকার যে তারা ২০২৫ সালের মধ্যে নির্বাচন করবে।’
গত শুক্রবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত এক সমাবেশে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স আগামী ১৫ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, ‘টাইম ফ্রেম করেন। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কথা বলেন। কথা বলে যতটুকু ঐকমত্য করা যায়, কাজ শুরু করেন। কী কী করবেন বলেন। কিন্তু জরুরি কাজ হলো আর এক মুহূর্ত দেরি না করে আগামী ১৫ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করেন। এটার কোনো বিকল্প নেই।’
সিপিবির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের কর্তব্য হচ্ছে নির্বাচনের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা। নির্বাচনব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কার করে যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন দিয়ে জনগণের রায় সেখানে নিয়ে আসেন। সংবিধানে পরিষ্কার লেখা আছে প্রজাতন্ত্রের মালিক হলো জনগণ। আপনারা যদি বিশ^াস করেন প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ, জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করেন। সব সমস্যার সমাধান সেখানেই হবে।’