অংশীজনের মত চাইবে কমিশন

সংবিধান সংস্কারের কমিশন আগামী ১৫ জানুয়ারির মধ্যে তাদের প্রস্তাবনা চূড়ান্ত করবে। শুরু থেকে এ পর্যন্ত কমিশন অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর লিখিত মতামত নিয়েছে। সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও আলোচনা করেছে। এখন প্রস্তাবনা তৈরির শেষ পর্যায়ে। তবে শেষবারের মতো আরও একবার অংশীজনের মতামত নিয়েই চূড়ান্ত সংস্কার প্রস্তাবনা তৈরি করবে অন্তর্বর্তী সরকার।

কমিশন প্রধান ড. আলী রীয়াজ বলেছেন, বিভিন্ন পক্ষের প্রস্তাবনা এবং ১২০টি দেশের সংবিধান পর্যালোচনা করে প্রস্তুত করা হয়েছে প্রস্তাবনা। তিনি মনে করেন, পুনর্লিখন না হলেও কার্যকর সংস্কারের মাধ্যমে জনআকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

তিনি বলেন, সংস্কার প্রস্তাবনায় গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে হবে এবং জবাবদিহির ব্যবস্থা করতে হবে। আর সে জন্যই শেষে আবারও অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। আর আগেও শুরুতে অংশীজনদের একটা বড় অংশ কথা বলেছি। তাদের আকাক্সক্ষা ও চিন্তাগুলোকে সমন্বয় করার চেষ্টা করছি।

সংস্কারে যেসব প্রস্তাব আসতে পারে

সংসদ সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে বর্তমান বয়স ২৫ আছে। সেটি কমিয়ে ২১ করার প্রস্তাব আসছে। তরুণদের দেশ গঠনের সুযোগ দিতে সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বয়স ৪ বছর কমিয়ে করা হচ্ছে ২১। এ ছাড়াও সংবিধানের বিভিন্ন বিতর্কিত ধারা পরিবর্তনে রাখা হচ্ছে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা। সংবিধান ১৯৭২ সাল থেকে যে ১৭টি সংশোধন হয়েছে, সেগুলো বিবেচনায় রাখা হয়েছে। সংসদ দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট করা, অনেক ধরনের মতের প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্টের একটা ভূমিকা থাকে। দুবারের বেশি প্রধানমন্ত্রিত্ব নয়, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা যেন এককেন্দ্রিক না হয় সে ব্যাপারে জোরালো প্রস্তাব রয়েছে। তাই এটাকে একটা ইতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।  প্রধানমন্ত্রীর জায়গায় একটা জবাবদিহি তৈরি করার প্রস্তাবও থাকছে এতে। প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান এক ব্যক্তি হবেন না। ৭০ অনুচ্ছেদসহ বিতর্কিত ধারা বাতিলও থাকছে তাদের প্রস্তাবে। সংবিধান

বিষয়ে ৫৪ হাজার মতামত ও ১২০টি দেশের সংবিধান পর্যালোচনা করে বিভিন্ন প্রস্তাবনা ও সুপারিশ করতে যাচ্ছে কমিশন। ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে নেওয়ার বিধান, স্পিকারের একক ক্ষমতা নয়।

সংস্কার কমিশন প্রধান বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করতে বারবার সংবিধানকে কাটাছেঁড়া করেছে বিভিন্ন সরকার। সংসদীয় ব্যবস্থা পাল্টে একদলীয় ব্যবস্থা কিংবা সামরিক শাসনকে বৈধতা দিতে ব্যবহার করা হয়েছে সংবিধানকে। সবশেষ ১৬ বছরে শেখ হাসিনা সরকার স্বৈরতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে পঞ্চদশ সংশোধনীসহ বেশ কয়েকবার সংবিধানে আনে পরিবর্তন। সবমিলিয়ে ’৭২-এর সংবিধানে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে ১৭ বার পরিবর্তন আনা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা পালানোর পর দাবি ওঠে সংবিধান পরিবর্তনের। সেই ক্ষেত্রে পুনর্লিখন নাকি সংস্কার, তা নিয়ে মতভেদ দেখা যায় বিভিন্ন শিবিরে। ৬ অক্টোবর গঠন করা হয় সংবিধান সংস্কার কমিশন। ৩ মাসে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং নাগরিকদের মতামত নিয়েছেন সদস্যরা।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেন বলেছেন, সম্পূর্ণ সাংবিধানিক সংস্কার একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া এবং তা এখনই সম্পন্ন করা কঠিন। এই সরকার একটি প্রস্তাবনা তৈরি করতে পারে, যা পরে যে সরকার ক্ষমতায় আসবে তারা জনগণের ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে তার বাস্তবায়ন করতে পারে। তিনি বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সংবিধান পর্যালোচনা করা খুব জরুরি। তবে যেকোনো সংস্কারের সময় আমাদের মনে রাখতে হবে, সংবিধান আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশের ভিত্তি। বাংলাদেশের সব মানুষের ত্যাগ ও ঐক্যবদ্ধ আকাক্সক্ষার ফসল। কোনো ব্যক্তিই এককভাবে সংবিধান পরিবর্তন করার অধিকার রাখেন না। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে, সংবিধান যেন কাউকেই কোনো নির্যাতনের সুযোগ না দেয়। সমতা, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়ের পাশাপাশি বৈষম্য নিরসন এবং গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিগুলো প্রতিষ্ঠার নিশ্চয়তা প্রদান করে।