একজন লেখক হিসেবে আমার শব্দগুলো প্রায়ই আবেগের বন্যার মতো কাগজের বুকে ঢল বইয়ে দেয়। কিন্তু অনুভূতির বানের স্রোতে এই মুহূর্তে আমি মুখোমুখি বাস্তুচ্যুত হওয়ার এক গভীর হাহাকার আর বেদনার, যা আমার সত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। উত্তর গাজা থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে দক্ষিণে চলে যাওয়া সব ফিলিস্তিনির জন্যই তা সত্য।
আমার শেকড় উত্তর গাজায়। গাজা নগরের প্রাণকেন্দ্র আল-রিমালে বেড়ে ওঠা। যেখানে একসময় জীবনের উচ্ছ্বাস এবং সৌন্দর্য আমাকে ঘিরে রেখেছিল। সেখানকার কোলাহলপূর্ণ সড়কগুলোয় স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থীদের হাসির ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হতো। আর গাজার আকাশ ভরে উঠত আজানের সুরে। প্রতিবেশীদের সঙ্গে উষ্ণ শুভেচ্ছাবিনিময় ছিল আমার দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেখানকার স্থানীয় বেকারি থেকে সদ্য প্রস্তুত করা রুটি এবং পেস্ট্রির গন্ধের সঙ্গে কাছের দোকানগুলো থেকে ফালাফেল, হুমুস এবং কুনাফার মসলাদার সুবাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়ত। দোকানের জানালায় সাজানো দৃষ্টিনন্দন পোশাকগুলোর কথাও আমার মনে পড়ে। মনে পড়ে রাতের উজ্জ্বল আলোর ঝলকানিতে সড়কগুলোর মুগ্ধকর এবং জাদুকরী হয়ে ওঠার দৃশ্য। আমার এই মহল্লা অনেক বেশি স্মৃতিকাতর করে তোলে। তবে আজ এসব স্মৃতি এক তিক্ত বেদনায় পর্যবসিত হয়েছে। কারণ আমার একসময়ের প্রাণবন্ত মহল্লাটা এখন ধ্বংসস্তূপ আর অন্ধকারে রূপ নিয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েলের বোমা হামলায় আমাদের বাড়ি ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে সপরিবারে পালিয়ে আসতে হয় দক্ষিণে। বর্তমানে আমি যখন দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে একটি অচেনা তাঁবুতে বসে থাকি, তখন বাড়ি থেকে এই দূরত্ব এক অসীম ফাঁকির মতো মনে হয়। এটি প্রতিদিন আরও গভীর হয়ে উঠছে। হৃদয়ে ভারী হয়ে আসছে বাড়ি ফেরার আকাক্সক্ষা।
বিচ্ছেদের বেদনা
আমার মনে পড়ে সেসব সন্ধ্যার কথা, যখন আমি প্রিয়জনদের সঙ্গে একত্র হয়ে সময় কাটাতাম। চিন্তার নদীর মতো বয়ে যেত আলোচনা। অসীমতক বিস্তৃত গভীর সংলাপগুলোয় একে অন্যের অভিজ্ঞতা থেকে খুঁজে নিতাম সান্ত্বনা। কিন্তু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া পরিস্থিতিতে সম্পর্কের বিচ্ছিন্নতার স্মারক হয়ে সেই মুহূর্তগুলো এখন শুধুই অতীত। যেসব কণ্ঠস্বর একসময় গাজার সড়কগুলো ভরিয়ে তুলেছিল, তা এখন শুধু স্মৃতি হয়ে এক তাড়িত সুরের মতো বাতাসে ঘুরে বেড়ায়। যখনই উত্তর গাজায় থাকা আমার বন্ধু এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করি, তারা সেখানে বিপর্যয়কর পরিস্থিতির বর্ণনা দেন। সেখানে গণহত্যার কঠিন বাস্তবতা ক্ষুধা, রোগ এবং ধ্বংসযজ্ঞের জন্ম দিয়েছে। তাই আমি সচেতনভাবে খাবারের বিষয়ে আলোচনা এড়িয়ে চলি বিশেষ করে মুরগি, সবজি, ফল এবং বিস্কুটের কথা। কারণ ইসরায়েলের অবরোধের কারণে এই মৌলিক জিনিসগুলো দু®প্রাপ্য হয়ে গেছে এবং পাওয়া গেলেও সেগুলো ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। এরপরও প্রতিবার যখন দাদা-দাদি, চাচা-চাচি বা মামা-মামির সঙ্গে কথা বলি, তারা আলাপ শেষ করেন এই বলে যে : ‘ইনশাআল্লাহ, তুমি ফিরে আসবে। আমরা সেই দিনটার জন্য আর অপেক্ষা করতে পারছি না, যখন আমরা পুনর্মিলিত হব।’
শক্তির উৎস
যখন আমার বন্ধু সারাকে ফোন করি, জানতে চাই কীভাবে সে এই নারকীয় অরাজকতার মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত রাখে। সে বলে, ‘আমি বই এবং কোরআন পড়ে নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করি। কিন্তু প্রতিবার যখন একটি বোমা বা ক্ষেপণাস্ত্রের শব্দ শুনি, একটি আতঙ্কের ঢেউ আমার ওপর আছড়ে পড়ে। এক বছর ধরে এই অনুভূতির সঙ্গে সংগ্রাম করছি।’ তার দুর্ভাগ্য আমাকে অসহায় করে তুললেও তাকে শক্ত থাকতে উৎসাহিত করি। সে ভয়েস মেসেজে বলে : ‘আমি তোমাকে অনেক মিস করি, প্রিয় হুদা। তোমার সঙ্গে আবার সাক্ষাৎ করে গভীর আলাপের জন্য আর তর সইছে না। প্রায়ই আমাদের ছবি দেখে বিশ্ববিদ্যালয়ে একসঙ্গে কাটানো সুন্দর দিনগুলোর স্মৃতি মনে করি। তুমি ফিরে আসবে, ইনশাআল্লাহ।’ তার কথা আমার কাছে শক্তির উৎস, যা সহ্যশক্তি বাড়িয়ে তোলে।
ইসরায়েলের তৈরি করা নেৎজারিম করিডর আমাদের বিচ্ছিন্নতাকে আরও প্রকট করে তুলেছে। আমাদের যে সীমাবদ্ধ দেয়ালগুলো রয়েছে, তা শুধু ভৌত নয়। এর সঙ্গে সঙ্গে রয়েছে দখল এবং অবরোধের মতো অদৃশ্য দেয়াল। আমি নিজের মতো করে বারবার চিন্তা করি, গাজার বাইরে রাফাহ ক্রসিংয়ের ওপারের জীবন কেমন? সেখানকার মানুষ কি আমাদের স্বপ্ন এবং সংগ্রাম ভাগ করে নেয়, নাকি তারা এমন এক বাস্তবতায় বসবাস করে, যা দৈনন্দিন অস্তিত্বের ওপর ছায়া ফেলছে এমন কোনো প্রভাব থেকে মুক্ত? প্রতিদিন গাজায় আমার অনিশ্চয়তা ও সীমাবদ্ধতায় পূর্ণ জীবন এবং অন্যদের সম্ভাব্য মুক্ত জীবনের মধ্যকার তীব্র বৈপরীত্যের বিষয়টি নিয়ে সংগ্রাম করি। কারণ, তা শুধু স্বপ্নে দেখতে পারি। আমার বাস্তুচ্যুত হওয়া আদতে যুগপৎভাবে একটি বোঝা এবং অনুপ্রেরণার উৎসমূল। কারণ, বিচ্ছেদের বেদনা আমার লেখনীর প্রেরণা জুগিয়ে বাড়ির স্মৃতিগুলো চিরকাল স্মরণীয় করে রাখতে উদ্বুদ্ধ করে। আর এই স্মৃতিগুলো সংজ্ঞায়িত করে অস্তিত্বকে। ২০২৩ সালের শেষাংশে ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত আমাদের গাজার ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক রেফাত আলআরির একসময় বলেছিলেন : ‘ভৌতভাবে দখল করা ভূমি আমাদের স্মৃতি এবং হৃদয়ে জীবিত রয়েছে।’
যদিও দেয়ালগুলো আমাদের বিচ্ছিন্ন করতে পারে, তবু আত্মা অক্ষুণœ রয়েছে। আমি আশা করি, এক দিন এই প্রতিবন্ধকতাগুলো ধ্বংস হয়ে যাবে। আমরা আবার গাজার সড়কগুলোয় স্বাধীনভাবে হাঁটব। বন্ধুদের আলিঙ্গন করব এবং জেরুজালেমে পৌঁছানোর পথে চলব। সেই দিনটি আসা পর্যন্ত আমি আমার স্মৃতিগুলো ধারণ করব।
লেখক : উই আর নট নাম্বারস প্রজেক্টের সদস্য
মিডলইস্ট আই থেকে ভাষান্তর : রুশাইদ আহমেদ