ক্যালিগ্রাফি ও হাদিসচর্চায় এক অনন্য নারী

প্রায় হাজার বছর আগে ফখরুন্নেসা নামে এক মহীয়সী নারী জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার পুরো নাম ফখরুন্নেসা শুহাদাহ উম্মে মুহাম্মদ আল-বাগদাদিয়াহ। ‘ফখরুন’ অর্থ গৌরব। ‘নেসা’ অর্থ নারী। একসঙ্গে এর অর্থ হলো নারীত্বের গৌরব। তিনি ছিলেন খ্যাতনামা আলেমা ও লেখিকা। তিনি ইসলামি ক্যালিগ্রাফি ও হাদিস শাস্ত্রে বিশেষ অবদান রেখেছেন। বিশেষ করে তিনি মানসুব পদ্ধতিতে ক্যালিগ্রাফি চর্চা করতেন, যা একটি জটিল ও শৈল্পিক ক্যালিগ্রাফি রীতি হিসেবে পরিচিত। তাকে বলা হতো বাগদাদের ক্যালিগ্রাফার। তার উপাধি ছিল নারী লেখিকা।

ফখরুন্নেসা ১১ শতকের গোড়ার দিকে ৪৮৪ হিজরিতে ইরানের দিনাভার শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা আবু নাসর আহমদ ইবনে ফারাজ আল-দিনাভারি। তার প্রপিতামহ সূচের ব্যবসায়ী ছিলেন। তার বাবা ছিলেন হাদিস অনুরাগী ও ক্যালিগ্রাফার। পিতার কাছ থেকে হাদিস ও ক্যালিগ্রাফি চর্চার মধ্য দিয়ে তার শিক্ষাজীবন শুরু হয়। ফখরুন্নেসার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা এমন একটি পরিবেশে যেখানে শিল্প, সংস্কৃতি ও ইসলামি জ্ঞান অর্জনের প্রতি জোর দেওয়া হতো। ছোটবেলা থেকেই তিনি পড়াশোনায় পারদর্শী ছিলেন এবং কোরআনের পাণ্ডিত্য অর্জনের প্রতি গভীর আগ্রহ দেখান।

ক্যালিগ্রাফির প্রতি ঝোঁক : ফখরুন্নেসা মানসুব স্টাইলের ক্যালিগ্রাফি রপ্ত করেন এবং তা নিয়ে কাজ করতেন। এই স্টাইলে কাজ করার জন্য দক্ষতা ও ধৈর্যের প্রয়োজন হয়। তার ক্যালিগ্রাফি কাজের মাধ্যমে তিনি শুধুমাত্র শিল্পের সৌন্দর্যই নয়, বরং ইসলামি সংস্কৃতির গভীরতাও ফুটিয়ে তুলেছেন।

হাতের লেখার পারদর্শিতা : ফখরুন্নেসা ক্যালিগ্রাফির পাশাপাশি সুন্দর হাতের লিখার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। আব্বাসীয় খলিফা আল মুকতাফিরের বিভিন্ন কাগজ-পত্র তিনি চমৎকারভাবে লিখে দিতেন।

হাদিস বিশারদ হিসেবে পরিচিতি : ফখরুন্নিসা বাগদাদের বিখ্যাত শিক্ষকদের কাছে হাদিস অধ্যয়ন করেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য শিক্ষকগণ হচ্ছেন তিরইয়াদ ইবনে মুহাম্মদ আল-জায়নবি, ইবনে তালহা আল-নিয়ালি, আনু ইহসান ইবনে আইয়ুব, আবু ইখাতাব ইবনে বাতির, আহমদ ইবনে আবদ আল-কাদির ইবনে ইউসুফ প্রমুখ। এছাড়াও আবু আবদুল্লাহ হাসান ইবনে আহমদ নোমানি, আবু বকর মুহাম্মদ ইবনে আহমদ আশ-শাশি, আবু আল-হুসাইনির মতো খ্যাতনামা পণ্ডিতদের নির্দেশনায় জ্ঞানের অন্য শাখাগুলো অধ্যয়ন করেছিলেন। হাদিসের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় তার বিচরণ সম্পর্কে বিবরণী তুলে ধরা হলো।

মুয়াত্তা : ইমাম মালেক (রহ.)-এর সর্বাধিক পরিচিত হাদিস গ্রন্থ মুয়াত্তা ছিল মুসলিমদের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো নিয়ে হাদিসের প্রথম সংকলন। মুয়াত্তায় প্রায় ১৭২০টি হাদিস রয়েছে। ফখরুন্নেসা সেগুলো অধ্যয়ন করেন।

আল-আজযায়ু : ‘আল-আজযায়ু’ হলো ‘জুযউন’ শব্দের বহুবচন। এর অর্থ হলো কোনো কিছুর অংশ। এখানে শুধুমাত্র একজন ব্যক্তির হাদিস বা শুধুমাত্র একটি বিষয়ে সংগৃহীত হাদিসের কথা বলা হয়েছে। এটা মূলত ভিন্ন ভিন্ন মুহাদ্দিসের একক বর্ণনা। প্রত্যেকের বর্ণনা আলাদা আলাদা একেকটি জুয বা অংশ। ফখরুন্নেসা সবচেয়ে বিখ্যাত জুয ইবনে আরাফাহ অধ্যয়ন করেছেন।

ফখরুন্নেসা এক সময় হাদিসশাস্ত্র চর্চায় ব্যাপক খ্যাতিলাভ করেন। পুরো বাগদাদে তার নাম ছড়িয়ে পড়ে। আবুল ফারাজ ইবনে আল জাওজি তার ধার্মিকতা, ক্যালিগ্রাফি ও দাতব্য কাজের জন্য প্রশংসা করেছেন। আল-সাফাদি হাদিস সম্পর্কে তার ব্যাপক জ্ঞান, তাকওয়া ও দানশীলতার কথা উল্লেখ করেছেন।

ফখরুন্নেসার অবদান তাকে কেবল একজন ক্যালিগ্রাফার বা হাদিস বিশারদ হিসেবেই নয়, বরং সংস্কৃতির প্রবর্তক ও ধারক হিসেবেও পরিচিত করেছে। তার কাজ আজও অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়। মহীয়সী এই নারী ৫৭৪ হিজরি মোতাবেক ১১১২ সালে ৯০ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।