‘রঙিন নবাব’-এর অভিমানী বিদায়

জীবনাবসান ঘটেছে রুপালি পর্দার ‘রঙিন নবাব’-এর। বার্ধক্যজনিত কারণে বিভিন্ন রোগে ভুগে রবিবার রাতে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান প্রবীর মিত্র। জীবনপ্রদীপ নেভার পর শেষবারের মতো তিনি এসেছিলেন তার প্রিয় কর্মস্থল এফডিসিতে, যেখানে তার জীবনের বেশিরভাগ সময়টা কাটিয়েছিলেন। অন্যান্য সময়ে শুটিংয়ে এলেও এদিন তিনি এসেছিলেন কফিনে করে, নিথর দেহে। এফডিসির জহির রায়হান ভিআইপি প্রজেকশনের সামনে অভিনেতার প্রথম জানাজা সম্পন্ন হয়। প্রবীর মিত্রকে শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানাতে এফডিসিতে এসেছিলেন তার সহকর্মীসহ নবীন-প্রবীণ চলচ্চিত্রকর্মীরা। উপস্থিত ছিলেন চিত্রনায়ক আলমগীর, উজ্জল, ইলিয়াস কাঞ্চন, শিল্পী সমিতির সভাপতি মিশা সওদাগর, নির্মাতা ছটকু আহমেদ, খোরশেদ আলম খসরুসহ অনেক অভিনেতা, অভিনেত্রী ও এফডিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এরপর তাকে দাফন করা হয় আজিমপুর গোরস্তানে।

অভিমানেই বিদায়

অনেকটা অভিমান করেই যেন চলে গেলেন প্রবীর মিত্র। বছর দু-এক আগে যখন গণমাধ্যমের সঙ্গে তার কথা হচ্ছিল, তখন তার কণ্ঠে ঝরছিল অনেক অভিমান। সে সময় তিনি বলেছিলেন, ‘কেউ আমার খবর নেয় না। যেন কারোরই খবর নেওয়ার দরকার নেই। শুধু ভাবি, কেউই তো আমার খোঁজ নেয় না। আমিও কারও খোঁজ নিই না। কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে জীবনটা।’

কয়েক বছর ধরে হাঁটুর হাড়ক্ষয় রোগে ভুগছিলেন। মাঝে অস্ত্রোপচার করা হলেও পুরোপুরি সেরে ওঠেননি, রুটিনমাফিক ফিজিওথেরাপি নিতে হতো তার। স্বাভাবিক হাঁটাচলা করতে পারতেন না, চলাচলের জন্য তার ভরসা ছিল হুইলচেয়ার।

বাসার বাইরে খুব একটা যাওয়া হতো না।

পত্রিকা পড়ে কিংবা টিভি দেখে, শুয়ে-বসে সময় কাটত দিন তার।

প্রবীর মিত্র বলেছিলেন, ‘আমি ভালো নেই। কী করব বুঝতে পারি না। কিছুই ভালো লাগে না। বেকার হয়ে বসে আছি। কেউ কাজের জন্য ডাকে না। পারলে আজ থেকেই কাজ করি। কিন্তু পাই না।’

প্রেমিকার জন্য হয়েছিলেন ধর্মান্তরিত

সনাতন ধর্ম থেকে ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হয়েছিলেন এই অভিনেতা। একটি ভিডিওতে

প্রবীর মিত্রকে বলতে শোনা যায়, আমি তো কনভার্ট হয়েই ওর মাকে বিয়ে করেছিলাম। তখন মুসলমান হয়েছিলাম। তখন প্রয়োজন হয়েছিল মুসলমান হওয়ার।

সে সময় ধর্ম নিয়ে প্রবীর মিত্রের ভাবনা জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, ‘ধর্ম নিয়ে আমার কোনো বাড়াবাড়ি নেই। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’। মানুষ সবার ওপরে। এরপর তার পরিবার অর্থাৎ অভিনেতার ছেলেও জানিয়েছিলেন, ‘মাকে বিয়ে করার আগে বাবা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন।’

ছেলের মৃত্যু তাড়িয়ে বেড়িয়েছিল তাকে

প্রবীর মিত্রের চার সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ছেলের নাম সামিউল ইসলাম। ছোট ছেলেকে অকালে হারিয়েছিলেন তিনি। হঠাৎ মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে মারা যান সামিউল। তখন সামিউলের বয়স ছিল ৩০। জীবদ্দশায় আদরের সন্তানের মৃত্যু তাড়িয়ে বেড়িয়েছে প্রবীর মিত্রকে।

প্রায় ১০ বছর আগে গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সামিউলকে নিয়ে স্মৃতিচারণা করেছিলেন এই খ্যাতিমান অভিনেতা। সাক্ষাৎকারে প্রবীর মিত্র বলেছিলেন, ‘ও (সামিউল) বাইরে খেতে পছন্দ করত। বাইরে থেকে পরোটা নিয়ে এসেছিল। পেটে গ্যাস হয়েছিল। পরে স্ট্রোক হয়ে ছেলেটা মারা গেল। ছোট ছেলের মৃত্যু আমাকে খুব পীড়া দেয়। আমি ওকে ভুলতে পারি না।’

ক্রীড়া ভুবনেও তিনি ছিলেন সেরা

ষাটের দশকে ঢাকা ফার্স্ট ডিভিশন ক্রিকেটে ক্যাপ্টেন হিসেবে খেলেছেন প্রবীর মিত্র। একই সময় তিনি ফায়ার সার্ভিসের হয়ে ফার্স্ট ডিভিশন হকিও খেলেছেন। এ ছাড়া কামাল স্পোর্টিংয়ের হয়ে সেকেন্ড ডিভিশন ফুটবলও খেলেছেন এই অভিনেতা। ১৯৪১ সালের ১৮ আগস্ট চাঁদপুরের নতুনবাজারের গুয়াখোলায়, মামাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন প্রবীর মিত্র। তার পুরো নাম প্রবীর কুমার মিত্র। তার বেড়ে ওঠা

ছিল পুরান ঢাকায়। ওই এলাকার একটি সড়কের নাম তার ঠাকুরদার নামে ‘হরিপ্রসন্ন মিত্র রোড’ রাখা হয়।

প্রবীর মিত্র স্কুলজীবন থেকেই নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত হন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ডাকঘর’ নাটকে অভিনয় করেছিলেন। পরে পরিচালক এইচ আকবরের হাত ধরে ‘জলছবি’ নামে একটি চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে বড় পর্দায় তার অভিষেক হয়। মূলত এ ছবিতে কাজের ব্যাপারে তার বন্ধু এ টি এম শামসুজ্জামানই তাকে সহযোগিতা করেছিলেন।

‘তিতাস একটি নদীর নাম’, ‘চাবুক’-এর মতো সিনেমায় নায়কের ভূমিকায় দেখা গেছে প্রবীর মিত্রকে।

এ ছাড়া ‘রঙিন নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ সিনেমায় মুখ্য চরিত্রে ছিলেন তিনি। এ কারণেই অনেকে তাকে ঢাকাই সিনেমার ‘রঙিন নবাব’ বলে ডাকেন। ‘দুই পয়সার আলতা’, ‘বড় ভালো লোক ছিল’, ‘বেদের মেয়ে জোসনা’র মতো চলচ্চিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের হৃদয়ে জায়গা করে নেন তিনি।

কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮২ সালে মহিউদ্দিন পরিচালিত ‘বড় ভালো লোক ছিলো’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান প্রবীর মিত্র। আর ২০১৮ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তাকে আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয়।

প্রবীর মিত্রর তিন ছেলে ও এক মেয়ে মিথুন মিত্র, ফেরদৌস পারভীন, সিফাত ইসলাম ও সামিউল ইসলাম। এর মধ্যে সামিউল মারা গেছেন। প্রবীর মিত্রর স্ত্রী অজন্তা মিত্র প্রয়াত হয়েছেন ২০০০ সালে।