গুমের মামলায় শেখ হাসিনাসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে পরোয়ানা

জোরপূর্বক গুমের মামলায় গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশনা দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তাদের গ্রেপ্তার করে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনালে হাজির করার আদেশ দিয়েছে আদালত। গতকাল সোমবার বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত ট্রাইব্যুনাল এ আদেশ দেয়। গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামিদের শেখ হাসিনা ছাড়া তিনজনের নাম প্রকাশ করেছে প্রসিকিউশন। তারা হলেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ ও টেলিযোগাযোগ নজরদারির জাতীয় সংস্থা ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সাবেক মহাপরিচালক জিয়াউল আহসান। আসামিদের মধ্যে জিয়াউল আহসান ট্রাইব্যুনালের একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। তদন্ত ও গ্রেপ্তারের স্বার্থে অন্য আসামিদের নাম প্রকাশ করেনি প্রসিকিউশন।

আওয়ামী লীগের শাসনামলে ১৫ বছরের বেশি সময়ে গুমের ঘটনায় গতকাল শেখ হাসিনাসহ ১২ জনকে অভিযুক্ত করে একটি মামলা করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। শুনানিতে শেখ হাসিনার নির্দেশ ও তত্ত্বাবধানে এসব গুমের ঘটনা ঘটেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। গুমের এসব ঘটনায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ‘সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটির অভিযোগ আনেন চিফ প্রসিকিউটর। শুনানিকালে মায়ের ডাকের সমন্বয়কারী সানজিদা ইসলামসহ গুমের শিকার ভুক্তভোগী এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান ঠেকাতে সংঘটিত গণহত্যার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আরও একটি মামলা হয়। গত ১৭ অক্টোবর এ মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল ট্রাইব্যুনাল। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি ৫ আগস্ট ভারতে চলে যান। এরপর থেকে সেখানেই অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। তাকে বাংলাদেশে ফেরাতে ভারতকে ইতিমধ্যে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। তবে ওই চিঠির জবাব এখনো আসেনি। এ ছাড়া শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তারে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের কাছে প্রসিকিউশনের পক্ষে ইতিমধ্যে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

আদালতের আদেশ শেষে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘গুম আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত একটি অপরাধ এবং বাংলাদেশের ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল আইনে মানবতাবিরোধী অপরাধ। সেই অপরাধগুলো সংঘটিত হয়েছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ নির্দেশনা ও পরিকল্পনাতে। সে সময়ে সরকারের যেসব বাহিনী ছিল, পুলিশ থেকে শুরু করে বিভিন্ন গোয়েন্দা বাহিনী, তাদের কিছু সদস্যকে প্রলোভন ও প্রমোশন, বিদেশে পাঠানোর লোভ দেখিয়ে নানাভাবে পুরস্কৃত করে পদক দিয়ে এই ধারাবাহিক অপরাধগুলো করানো হয়েছিল। আজ (গতকাল) একটি মামলায় ১২ জনকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেছিলাম। আদালত সেটি মঞ্জুর করেছে। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বারবার বলে আসছি যে, জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের পর বাংলাদেশে যে নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে সেই অধ্যায়ে এই জাতির সরকারের কাছে সবচেয়ে বড় যে প্রত্যাশা সেটা হচ্ছে এসব ঘৃণ্য মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করা। এই অপরাধের সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক তারা কেউ রাষ্ট্রের চেয়ে বড় নন, আইনের ঊর্ধ্বে নন।’

অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম বলেন, ‘যারা এসব অপরাধ করেছে, ৮ বছর ৯ বছর গুম করে রেখেছে। এখনো অনেকে ফিরে আসেননি। তাদের স্বজনরা জানেন না তাদের প্রিয়জন জীবিত আছেন না মারা গেছেন। এই যে ভয়াভহ সংস্কৃতি চালু হয়েছিল এর একটা নিষ্পত্তি হতে হবে।’