উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়লেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এদিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা ছাড়ার আগে সরকারের উপদেষ্টা, রাজনীতিক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা আশা প্রকাশ করে বলেছেন, দীর্ঘদিনের লড়াই-সংগ্রামের আপসহীন নেত্রী খালেদা জিয়া সুস্থ হয়ে দেশে ফিরে রাজনীতিতে যোগ দেবেন।
এদিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার আগে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তার সুস্থতা কামনা করেছেন এবং সুস্থ হয়ে দেশে ফেরার পর আবার সাক্ষাতের আশা প্রকাশ করেছেন। বিকল্পধারা বাংলাদেশের মহাসচিব মাহী বি চৌধুরী ও লেখক, কবি, দার্শনিক এবং বুদ্ধিজীবী ফরহাদ মজহার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। মাহী বি চৌধুরী দীর্ঘদিন পর খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের মধ্যে সাক্ষাতের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে ফরহাদ মজহার দাবি করেছেন, খালেদা জিয়া জাতীয় ঐক্যের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন।
খালেদা জিয়া ঐক্যের প্রতীক ফরহাদ মজহার : গত ৪ ডিসেম্বর লেখক, দার্শনিক, গবেষক ও বুদ্ধিজীবী ফরহাদ মজহার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে দাবি করেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তার দীর্ঘ আপসহীন লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জাতীয় ঐক্যের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। তিনি চান বা না চান অর্থাৎ সক্রিয় রাজনীতিতে তাকে জনগণ পাক বা না পাক, খালেদা জিয়ার প্রতীকী তাৎপর্য আগামী রাজনীতিকে অনেকাংশেই প্রভাবিত করতে পারে। এর আগে আমি বলেছি, তার আপসহীনতা অর্থাৎ ফ্যাসিস্ট শক্তি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার অধীনে নির্বাচন না করা তাকে এক ঐতিহাসিক মর্যাদা দিয়েছে, তা আর বাংলাদেশের ইতিহাসে এবং জনগণের স্মৃতিতে আর মøান হওয়ার নয়। এদিক থেকে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামানের সাক্ষাৎকার নিছকই সৌজন্য হলেও, তার ইতিবাচক রাজনৈতিক বার্তা পরিষ্কার। সেটা হচ্ছে, ঐক্য এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পরিবেশ তৈরির আন্তরিক প্রয়াস। এই সাক্ষাৎকার খুবই সময়োপযোগী হয়েছে। বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক মেরূকরণের ফল কী দাঁড়াবে, সেটা নির্ভর করবে মোটাদাগে রাজনীতির তিন ত্রিভুজপক্ষের মধ্যে সমঝোতা কিংবা বিরোধের মাত্রা দ্বারা। এই তিনপক্ষ কারা?
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ উল্লেখ করে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার মিথ্যা মামলা দিয়ে তাকে কারাগারে নিয়ে নির্যাতন করেছিল। বিএনপি ও পরিবারের পক্ষ থেকে বারবার তাকে জামিন দিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর জন্য আবেদন করলেও আওয়ামী লীগ সরকার তাতে সাড়া দেয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। উন্নত চিকিৎসা নিয়ে খালেদা জিয়া সুস্থ হয়ে দেশে ফিরবেন এবং রাজনীতির হাল ধরবেন, সেই প্রত্যাশা করি আমরা।’
দেশে ফিরে সক্রিয়ভাবে দলের হাল ধরবেন : বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার অন্যায়ভাবে খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করেছে। মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। শেখ হাসিনা বিদায় না নিলে তার জীবন নিয়ে শঙ্কা ছিল। আমরা প্রত্যাশা করি, খালেদা জিয়া বিদেশে উন্নত চিকিৎসা নেবেন এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ হয়ে দেশে ফিরবেন। দেশে ফিরে সক্রিয়ভাবে দলের হাল ধরবেন।’
লন্ডনে মা-ছেলের পুনর্মিলনের বিষয়ে মাহী বি চৌধুরীর স্ট্যাটাস : নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে পোস্ট করে মাহী বি চৌধুরী গত সোমবার রাতে লিখেছেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া উন্নত চিকিৎসার জন্য অচিরেই লন্ডন যাচ্ছেন। অতীতের সব রাজনৈতিক পার্থক্য ও ভুল বোঝাবুঝি সত্ত্বেও, এই পুনর্মিলনের আনন্দে আমার হৃদয় এক অনির্বচনীয় শান্তি ও তৃপ্তিতে ভরে উঠেছে।’
খালেদা জিয়া লন্ডন পৌঁছে সরাসরি হাসপাতালে যাবেন। সেখানে তারেক রহমান ও তার পরিবারের সদস্যরা খালেদা জিয়াকে বরণ করবেন। যার মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন পর মা-ছেলের সঙ্গে সাক্ষাৎ হতে যাচ্ছে। তাদের পারিবারিক এই পুনর্মিলনের প্রসঙ্গ টেনে মাহী বি চৌধুরী লিখেছেন, ‘কিছু সময়ের মধ্যেই একটি মায়ের সঙ্গে তার সন্তানের পুনর্মিলন, একজন দয়ালু দাদির সঙ্গে তার আদরের নাতনি ও পুত্রবধূর পুনর্মিলন ঘটতে যাচ্ছে। আমি কল্পনা করে আনন্দিত হই, তাদের প্রথম পারিবারিক নৈশভোজ, যেখানে হাসি-আনন্দ, গল্প আর স্মৃতিচারণায় মুখরিত হবে তাদের পরিবেশ।’
নিজের বাবার মৃত্যুর কথা স্মরণ করে মাহী বি বলেন, ‘গত বছরের ৫ অক্টোবর আমার বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তার কষ্ট আর অসুস্থতার মুহূর্তগুলোয় আমরা দেখেছি, আমার আর বোনদের উপস্থিতি তার মুখে হাসি এনে দিয়েছে। আমার মা এবং তার নাতি-নাতনিদের সান্নিধ্যে তিনি বার্ধক্য জয় করে প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করতেন কখনো তার প্রিয় গান গেয়ে, কখনো প্রিয় কবিতা আবৃত্তি করে। তার জীবনের বড় বড় অর্জনের চেয়ে এই সাধারণ মুহূর্তগুলোই তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ করে তুলত।’
সুস্থতা কামনা করলেন জাপা চেয়ারম্যান : গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক শুভ কামনা বার্তায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রোগমুক্তি, সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করেছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের। একই সঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, পরিবার এবং খালেদা জিয়ার অনুসারীদের প্রতি সহমর্মিতা জানিয়েছেন। বার্তায় জিএম কাদের বলেন, ‘দেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়া গুরুত্বপূর্ণ। দেশ ও দেশের মানুষের মঙ্গলের জন্য তার সুস্থতা জরুরি।’ মহান আল্লাহর রহমতে চিকিৎসা শেষে দ্রুত সুস্থ হয়ে দেশে ফিরবেন এমন আশাও প্রকাশ করেছেন তিনি।
বাংলাদেশের গণতন্ত্র অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখবেন : গত ৬ জানুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল ফেসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘চিকিৎসার জন্য নভেম্বরে খালেদা জিয়ার বিদেশে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। সে রকম একটা সময় আমি ওনার সঙ্গে সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎ করতে যাই। একান্তে কথা হয় কিছুক্ষণ ওনার বাসভবনে। খালেদা জিয়া গণ-অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতৃত্বের প্রশংসা করেন এবং অন্তর্র্বর্তী সরকারের সাফল্য কামনা করেন। জানান, সবসময় তিনি খবর রাখেন দেশের।’
পোস্টের শেষ অংশে অন্তর্র্বর্তী সরকারের এই আইন উপদেষ্টা লিখেছেন, ‘আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ফিরে আসেন দেশে। আবার যেন ভূমিকা রাখতে পারেন বাংলাদেশের গণতন্ত্র আর অগ্রগতি বিনির্মাণে।’