নারীর জন্য বৈষম্যহীন পৃথিবী

প্রতিদিনই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের নারীরা নিজ গৃহ, কর্মক্ষেত্র এবং বৃহত্তর সমাজে নানা ধরনের সহিংসতা, শোষণ ও বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হচ্ছেন। বিশ্ব জুড়ে দারিদ্র্যের অন্যতম চালক লিঙ্গ-অসমতা। তাই সাম্প্রদায়িক পরিচয়, ধর্মীয় অন্ধত্বের শিকার হন নারীরাই।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে আয়োজিত জাতিসংঘের ৭০তম অধিবেশনে ১৯৩টি সদস্য দেশ ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’ (এসডিজি) গ্রহণ করে। এর ১৭টি অভীষ্টের মধ্যে পঞ্চম অভীষ্টটি নারীর ক্ষমতায়ন সংক্রান্ত। এতে রয়েছে ৯টি লক্ষ্য ও ১৪টি সূচক। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ এবং ইউএনউইম্যান প্রতি বছর এসডিজির অগ্রগতি নিয়ে ‘দ্য জেন্ডার স্ন্যাপশট’ নামের বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরি করে থাকে। ২০২৪ সালের সর্বশেষ প্রতিবেদনে যে বিবর্ণ চিত্র উঠে এসেছে, তাতে মাত্র ছয় বছরের মধ্যে এসডিজির পঞ্চম অভীষ্ট অর্জন তথা নারীর জন্য পরিপূর্ণ সমতা অর্জন অসম্ভব।  প্রতিবেদনের কিছু তথ্য তুলে ধরা যাক। চরম দারিদ্র্য দূরীকরণের বর্তমান গতি বজায় থাকলে নারীদের দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেতে সময় লাগবে ১৩৭ বছর! লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ, বিয়ে ও তালাকের ক্ষেত্রে সমানাধিকার, সমান মজুরির নিশ্চয়তা এবং যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যের পরিপূর্ণ অধিকার প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় আইন এখনো বিশ্বের কোনো দেশে নেই। তা ছাড়া ২০৬৩ সালের আগে বিশে^র আইনসভাগুলোতে নারী ও পুরুষের মধ্যে সমতা প্রতিষ্ঠা করা যাবে না।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম গত ১২ জুন ২০২৪ সালের ‘গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ ইনডেক্স’ প্রকাশ করে। এতে চারটি মৌলিক ক্যাটাগরিতে নারী-পুরুষের অসমতার বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হয়। এগুলো হলো অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ ও সুযোগ, শিক্ষায় সাফল্য, স্বাস্থ্য ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন। এতে কিছু সাফল্যের চিত্রও এসেছে। বর্তমানে বিশ্বের প্রতি চারটি পার্লামেন্টারি আসনের একটি নারীদের দখলে, যা গত এক দশকের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন। সূচকে বিশ্বকে মোট আটটি অঞ্চলে ভাগ করা হয়। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, এতে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলটি রয়েছে সপ্তম স্থানে। পুরো অঞ্চলের স্কোর মাত্র ৬৩.৭ শতাংশ যেখানে বিশ্বের দরিদ্রতম অঞ্চল সাব-সাহারান আফ্রিকার ক্ষেত্রে এই হার ৬৮.৪ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি দেশের মধ্যে ছয়টিই শীর্ষ ১০০টি দেশের বাইরে রয়েছে। সুখের বিষয়, সূচকে একমাত্র বাংলাদেশের অবস্থান ৯৯তম। এককভাবে আমাদের মোট গড় ৬৮.৯ শতাংশ।

নারী যদি পুরুষের সমান অধিকার না পান, তাহলে সেটি কেবল নারীর জীবনকে বিপন্ন করে না, গোটা সমাজের জন্যই তা একটি গুরুতর সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণেই নারীর অধিকার নিশ্চিত করে সমাজে বিদ্যমান বৈষম্যকে বিদায় জানাতে ১৯৪৬ সালে জাতিসংঘে নারীর মর্যাদাবিষয়ক কমিশন (ঈঝড) গঠন করা হয়। এই সংস্থার উদ্যোগে ১৯৫০-এর দশকে নারীর অধিকার সুরক্ষায় একাধিক আন্তর্জাতিক চুক্তি গৃহীত হয়।

১৯৬০-এর দশকে বিশ্বের নানা দেশে নারী অধিকারের আন্দোলন জোরদার হলে পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে কমিশন একটি বৈশ্বিক সনদ তৈরির জন্য কাজ শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় তৈরি হয় ‘নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ’ (সিডো)। যা ১৯৭৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয়। এই সনদের মর্মবাণী হলো, সভ্যতার ক্রমবিকাশে যুগ যুগ ধরে নারী যে ভূমিকা পালন করছেন তার যথাযথ স্বীকৃতি দান এবং বিশ্ব শান্তি ও উন্নয়নের জন্য নারী-পুরুষের মধ্যে সমতা স্থাপন।

জাতিসংঘের নারীর মর্যাদাবিষয়ক কমিশনের উদ্যোগেই ১৯৭৫ সালকে নারী বর্ষ ঘোষণা করা হয়। মেক্সিকোতে সে বছরই অনুষ্ঠিত হয় প্রথম বিশ্ব নারী সম্মেলন। সম্মেলনে নারীর অগ্রগতি বিষয়ক নির্দেশনা সংবলিত একটি বৈশ্বিক কর্মপরিকল্পনা গৃহীত হয়, যা ‘নারী দশক’ নামে (১৯৭৬-১৯৮৫) অভিহিত হয়। এই দশকে বিশ্বের সামনে একটি নতুন উপলব্ধি তুলে ধরা হয়। আর তা হলো, নারীর অংশগ্রহণ ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়। ১৯৮০ সালে কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় বিশ্ব নারী সম্মেলন প্রাধান্য দেওয়া হয় কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায়। ১৯৮৫ সালে নাইরোবিতে অনুষ্ঠিত তৃতীয় সম্মেলনে নারী দশকের অর্জন পর্যালোচনার জন্য গৃহীত হয় অগ্রমুখী  কৌশল। ১৯৯৫ সালে বেইজিংয়ে ‘নারীর চোখে বিশ্ব দেখুন’ প্রতিপাদ্য নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলন যেখানে নারী উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ১২টি ক্ষেত্র চিহ্নিত করে গৃহীত হয় ‘বেইজিং প্ল্যাটফর্ম ফর অ্যাকশন’। এটিকে নারীর অগ্রগতি ও ক্ষমতায়নের  ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথনকশা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই কর্মপরিকল্পনার উদ্দেশ্য ছিল, সিডো সনদে গৃহীত লক্ষ্য অর্জনে রাষ্ট্রগুলোকে দিকনির্দেশনা প্রদান। এরপর থেকে জাতিসংঘের উদ্যোগে পাঁচ বছর পরপর কর্মপরিকল্পনার গৃহীত কাজের অগ্রগতি বিশ্লেষণের জন্য সম্মেলনের আয়োজন হতে থাকে। এসব আয়োজন ‘বেইজিং প্লাস ফাইভ’, ‘বেইজিং প্লাস টেন’ ইত্যাদি নামে অভিহিত।

২০২৫ সালেই বেইজিং কর্মপরিকল্পনার ৩০ বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে। তাই পৃথিবী জুড়ে চলছে নানা পর্যালোচনা। আগামী মার্চে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিতব্য নারীর মর্যাদাবিষয়ক কমিশনের সভায় বিভিন্ন দেশের সরকার নিজ নিজ দেশের নারীর ক্ষমতায়নের অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে তথ্য তুলে ধরবে। সমতার পৃথিবী গড়ে তোলার আওয়াজে আবারও এক হবেন বিশ্ববাসী।

বেইজিং কর্মপরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশেও নারী উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এমন একটি প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এই কর্মপরিকল্পনার তিন দশকের প্রান্তে দাঁড়িয়ে, যখন দেশবাসী জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলছেন। গণতন্ত্র, সুশাসন ও সামাজিক ন্যায় আকাক্সক্ষার জন্য লড়াইয়ের এক উজ্জ্বল অধ্যায় এই অভ্যুত্থান যেটিতে নারীরা ছিলেন প্রথম সারির যোদ্ধা।  দেশের ইতিহাসে যুগে যুগে নারীরা এ ধরনের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছেন। তাই নারীর প্রতি সব প্রকার বৈষম্য দূরীকরণে বর্তমান সরকারকে আইন প্রণয়ন, কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুযোগ বৃদ্ধিতে পদক্ষেপ নিতে হবে।

নারীর অবদানকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা প্রত্যেক নাগরিকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কারণ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ধারায় ন্যায্য সমাজ গঠনের জন্যও সেটি অপরিহার্য। এই উপলব্ধি নিয়ে আসতে শুধু নারী নয়, সমাজের সব স্তরের যোগ্য মানুষকে একতাবদ্ধ হতে হবে। না হলে নারীর প্রতি বিভিন্ন স্তরে যে বৈষম্য চলছে, তার সমাধান দুরূহ। আমরা যেন ভুলে না যাই সমাজ থেকে বৈষম্য দূর না হলে, কোনো প্রগতিশীলতাই স্থায়িত্ব পাবে না। সব প্রকার বৈষম্য দূর করে, সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে সবাই যেন অগ্রসর হতে পারি। 

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও লেখক

farhana.ym22@gmail.com