শেখ হাসিনার ভিসার মেয়াদ বাড়াল ভারত

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে গত ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়ার পর থেকে ভারতেই অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি করা হচ্ছে। এ নিয়ে কূটনৈতিক চ্যানেলে চিঠি চালাচালিও হয়েছে। ঢাকা সেই চিঠির জবাবের অপেক্ষা করছে। কিন্তু দিল্লির পক্ষ থেকেই সেই চিঠির কোনো জবাব তো দূরের কথা এরমধ্যে বৈধভাবে ভারতে অবস্থানের জন্য শেখ হাসিনার ভিসার মেয়াদ বাড়িয়েছে ভারত।

কূটনৈতিক চ্যানেলগুলো ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শেখ হাসিনাকে বিচারের মুখোমুখি করতে দেশে যখন দাবি তীব্র হচ্ছে তখনই প্রতিবেশী দেশটিতে তার ভিসার মেয়াদ বাড়ানোন একটা তাৎপর্য রয়েছে। সূত্র বলছে, ঢাকার পক্ষ থেকে যত চাপেই থাকুক না কেন শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি সহজ হবে না। এটা গত ৫ মাসে দিল্লির বিভিন্ন বার্তায় স্পষ্ট হয়েছে।

শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে দিল্লিকে চিঠি দেওয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যেই শেখ হাসিনার ভিসার মেয়াদ বাড়ানো বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন,  ভারত শেখ হাসিনার ভিসার মেয়াদ বাড়ালে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কিছু করার নেই। গতকাল সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ মন্তব্য করেন।

তৌহিদ হোসেন বলেন, আপনাদের মতো আমিও পত্রিকার মাধ্যমে বিষয়টি (ভিসার মেয়াদ) জেনেছি। এটি ভারতের বিষয়।’ তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনাকে ফেরত আনার জন্য চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু তারা এখনো জবাব দেয়নি।’ গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শেখ হাসিনাকে বিচারের মুখোমুখি করতে গত মাসের ২৩ ডিসেম্বর নয়াদিল্লির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছে ঢাকা।

এরপর গতকাল দিল্লিভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ত্যাগ করেন এবং তখন থেকেই তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। সম্প্রতি তার ভিসার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। তবে ভারত ঠিক কবে শেখ হাসিনার ভিসার মেয়াদ বাড়িয়েছে তা এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

তবে দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, শেখ হাসিনাকে ভারতে থাকার বৈধ অনুমতি দিয়ে ৫ বছরের জন্য ভিসার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। আর এ থেকে সহজেই অনুমান করা যাচ্ছে আপাতত অন্য কোনো দেশে নয়, শেখ হাসিনা ভারতেই থাকছেন। আর বাংলাদেশ সরকার চাইলেও সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে দেশে ফিরিয়ে আনতে পারবে না। গত ৫ মাস ধরে দিল্লি এটা নানাভাবেই প্রকাশ করছে।

এদিকে গত মঙ্গলবার উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৯৭ জনের পাসপোর্ট বাতিল করেছে সরকার। এদের মধ্যে গুমের সঙ্গে জড়িত অভিযোগে ২২ জনের এবং জুলাই হত্যাকাণ্ডে জড়িত অভিযোগে ৭৫ জনের পাসপোর্ট বাতিল করা হয়েছে।

এর আগে গত ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের গত ১৫ বছরে গুমের ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। গত ১৭ অক্টোবর শেখ হাসিনাসহ ৪৬ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়। জুলাই-আগস্টের ঘটনায় ‘গণহত্যার’ মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে তদন্ত রিপোর্ট দেওয়ার জন্য এক মাসের সময় দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে একই বিষয়ে আরেক মামলায় শেখ হাসিনা সরকারের মন্ত্রী-উপদেষ্টা ও প্রতিমন্ত্রীসহ মোট ১৩ জনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল।

ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি থাকলেও তার ভিসার মেয়াদ বাড়িয়েছে ভারত। ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেশটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে খবর করা হয়, শেখ হাসিনার ভিসা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র ভারতে তার অবস্থান সহজ করার জন্যই নেওয়া হয়েছে। তারা আরও জানিয়েছেন, ভারতে শরণার্থী ও আশ্রয় সংক্রান্ত কোনো নির্দিষ্ট আইন নেই তাই ‘শেখ হাসিনাকে ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে’ মর্মে যেসব অনুমান-নির্ভর খবর ছড়াচ্ছে তা সঠিক নয়। ভিসা বাড়ানোর প্রক্রিয়ায় ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন ছিল। এ প্রক্রিয়া আঞ্চলিক বিদেশি নিবন্ধন অফিস (এফআরআরও)-এর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। যদিও বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

এদিকে পদত্যাগ করে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান করার পর থেকেই দেশটিতে তিনি কোন স্ট্যাটাসে রয়েছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এরপর গত বছরের অক্টোবরে ভারতীয় গণমাধ্যমে এ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনের মাধ্যমে বিষয়টি অনেকটাই স্পষ্ট হয়। দেশটির গণমাধ্যম দ্য প্রিন্টের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে দেশটির সরকারের ব্যবস্থাপনায় নয়াদিল্লির লোধি গার্ডেনের লুটিয়েনস বাংলো জোনের একটি নিরাপদ বাড়িতে বসবাস করছেন।

দ্য প্রিন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনার মর্যাদা অনুসারে তাকে থাকার জন্য বেশ বড়সড় বাংলো দেওয়া হয়েছে। সাধারণত এ ধরনের বাংলো ভারতের মন্ত্রী, পার্লামেন্ট সদস্য ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে শেখ হাসিনার গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার কথা ভেবে দ্য প্রিন্ট ওই বাংলোর প্রকৃত ঠিকানা বা সড়ক নম্বর প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, নিরাপত্তার খাতিরে যথার্থ প্রটোকল সঙ্গে নিয়ে শেখ হাসিনা মাঝেমধ্যে লোধি গার্ডেনে হাঁটতে বের হন। শেখ হাসিনার জন্য কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সাদা পোশাকে ২৪ ঘণ্টা তার চারপাশে নিরাপত্তারক্ষীরা থাকেন। বিশিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে তিনি এই পর্যায়ের নিরাপত্তা পাচ্ছেন। একজন ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’ হিসেবে তিনি এই পর্যায়ের সুরক্ষা পাচ্ছেন বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে দ্য প্রিন্টকে। বলা হয়, দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে তিনি ওই এলাকায় বসবাস করছেন। এখানে তার থাকার জন্য সবকিছুর ব্যবস্থা করা হয়েছে।