নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জেড আই খানের

নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধের আহ্বার জানিয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) চেয়ারপার্সন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী জেড আই খান বলেছেন, আমরা প্রতিটি মানুষ ভিন্ন, আমাদের মতাদর্শও ভিন্ন। তবে আসুন আমরা একটা জায়গা অন্তত এক হই, নারীর প্রতি কোনও সহিংসতা দেখাব না। দেখেন আমরা আমাদের কাজের বুয়াকে সম্মান করি না। তাদের কোনো সুযোগ-সুবিধা দিতে চাই না। তাদের প্রতি আমরা কোনও সহানুভূতি দেখাই না। অথচ তারা কিন্তু রুটি-রুজির জন্য গার্মেন্টে গিয়ে খুব সম্মানের সঙ্গে কাজ করছে। একটা নিয়মের মধ্য দিয়ে কাজ করছে।

আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে "যৌন হয়রানি এবং জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও প্রতিকারে করণীয়" শীর্ষক এক মতবিনিময়সভায় স্বাগত বক্তেব্যে তিনি এ কথা বলেন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) অগ্নি প্রকল্প এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করে।

আইনজীবী জেড আই খান বলেন, নারীর প্রতি যেকোনও ধরনের সহিংসতা ও বৈষম্য অগ্রহণযোগ্য। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা আশা করব গণমাধ্যম নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় বরাবরের ন্যায় সচেষ্ট থাকবে। একই সঙ্গে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পক্ষ থেকে অঙ্গিকার থাকবে নারীর অধিকার সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকায় সচেষ্ট থাকার।

মতবিনিময়সভায় আসকের জ্যেষ্ঠ সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির সঞ্চালনায় প্রকল্প সমন্বয়কারী আসমা খানম রুবা প্রকল্পের লক্ষ্য ও কার্যক্রম, কর্ম এলাকায় যৌন হয়রানি ও জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার চিত্র এবং যৌন হয়রানি প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়নের বর্তমান অবস্থার ওপর একটি উপস্থাপনা তুলে ধরেন।

আসমা খানম রুবা বলেন, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সহায়তায় ব্র্যাকের সঙ্গে যৌথভাবে অগ্নি প্রকল্পের বাস্তবায়ন করছে আসক। প্রকল্পটির অধীনে গাজীপুর ও রাজশাহী জেলায় বিশেষ করে পরিবহন, বাজার স্থান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সাইবার ভিত্তিক যৌন হয়রানি এবং জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ করে জেন্ডার সমতায়নের লক্ষ্যে ১৪টি সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশনসহ (সিএসও) সরকারি, বেসরকারি কর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

তিনি আরও বলেন, শিক্ষাঙ্গনে এবং কর্মস্থলে নারী ও শিশুদের যৌন হয়রানি প্রতিরোধে উচ্চ আদালতের মাইলফলক রায়ের এক যুগ পার হয়ে গেছে। এ রায়ে সুষ্পষ্টভাবে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট দিক-নির্দেশনা প্রদান করা হলেও তা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। নির্দিষ্ট আইনে রূপান্তর না হওয়া পর্যন্ত সংবিধান অনুযায়ী এ নির্দেশনা আইন হিসেবে কাজ করার কথা থাকলেও প্রায়োগিক ক্ষেত্রে তা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। নারী ও শিশুদের যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ও প্রতিকারে পূর্ণাঙ্গ আইনের খসড়াটির বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে তিনি।

২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে রাজশাহী ও গাজীপুর জেলায় নারীর প্রতি সহিংসতা, যৌন হয়রানি ও ধর্ষণ, পারিবারিক নির্যাতন, শিশু নির্যাতন ও যৌতুকের জন্য নির্যাতনসহ নারীর প্রতি বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার ঘটনায় একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়।

পরিসংখ্যানে বলা হয়, ২০২৪ সালে রাজশাহী জেলায় যৌন হয়রানি ও সহিংসতার শিকার হয়েছেন কমপক্ষে ৮৬ জন নারী, ধর্ষণ ও ধর্ষণের চেষ্টার শিকার হয়েছেন মোট ৪৪ জন নারী, অপহরণ এবং অপহরণের চেষ্টার শিকার হয়েছেন ২৮ জন বিভিন্ন বয়সের নারী, হত্যা ও আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন ৬৫ জন নারী, এদের মধ্যে একজন নারীর রহস্যজনক মৃত্যুর শিকার হয়েছেন, যৌতুকের জন্য নির্যাতনের শিকার হয়েছেন কমপক্ষে ২৪৫ জন নারী, স্বামীর দ্বারা মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে কমপক্ষে ৪৩ জন নারী এবং পারিবারিকভাবে, শ্বশুরবাড়ীর লোক, প্রতিবেশী, পরিবারের লোকজনের মাধ্যমে গৃহকর্মীসহ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন কমপক্ষে ৩৫১ জন নারী।

২০২৪ সালের গাজীপুর জেলায় নারীর প্রতি সহিংসতার চিত্র তুলে ধরে প্রকল্প সমন্বয়কারী আসমা খানম রুবা জানান, গাজীপুরে জেলায় গত বছরে (জানুয়ারি-ডিসেম্বর) যৌন হয়রানি ও সহিংসতার শিকার হয়েছেন কমপক্ষে ২১৩ জন নারী, ধর্ষণ ও ধর্ষণের  চেষ্টার শিকার হয়েছেন মোট ৪২ জন নারী, অপহরণ এবং অপহরণের চেষ্টার শিকার হয়েছেন ১৪ জন বিভিন্ন বয়সের নারী, হত্যা ও আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন ২৫ জন, যৌতুকের জন্য নির্যাতনের শিকার হয়েছেন কমপক্ষে ৪০ জন নারী, স্বামীর দ্বারা মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছন কমপক্ষে ২৭ জন নারী এবং স্বামী, শ্বশুরবাড়ীর লোক, প্রতিবেশী, পরিবারের লোকজনের মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন কমপক্ষে ৪২৩ জন নারী।