বিশ্ব জুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা দিন দিন বেড়ে চলেছে। এসব দুর্যোগের মধ্যে ‘দাবানল’ সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক এবং পরিবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর। প্রতি বছর পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে দাবানলে পুড়ে যায় কোটি কোটি হেক্টর বনভূমি। শুধু বনভূমিই নয়, দাবানল মানবজীবন, পরিবেশ এবং অর্থনীতির ওপরও ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। এর ভয়াবহতা প্রতিনিয়ত আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছে, সময়মতো পদক্ষেপ না নিলে পৃথিবীর পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। তখন আর কিছুই করার থাকবে না।
দাবানলের ঝুঁকি মূলত শুষ্ক জলবায়ু এবং তীব্র তাপপ্রবাহের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। শুষ্ক মৌসুমে পাতা, ঘাস এবং গাছের ডালপালা শুকিয়ে যাওয়ার ফলে এক ধরনের দাহ্য পরিবেশ তৈরি হয়, যা আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার জন্য আদর্শ। অনেক সময় বজ্রপাতের মতো প্রাকৃতিক কারণ থেকেও আগুনের সূত্রপাত হয়। কিন্তু শুধু প্রকৃতিই নয়, মানুষের অসতর্কতা ও অসাধু কর্মকাণ্ড দাবানলের অন্যতম কারণ। জঙ্গল পরিষ্কার করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন দেওয়া, পর্যটকদের অসাবধানতাবশত আগুন ছড়িয়ে দেওয়া এবং শিল্প কার্যক্রমের মাধ্যমে স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টির ঘটনাগুলো দাবানলের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ ব্যাপারে সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কতটুকু সচেতন, তা আমাদের সন্দিহান করে।
বিশে^র বিভিন্ন অঞ্চলে দাবানলের ঘটনা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৯-২০ সালে অস্ট্রেলিয়ার ‘বুশফায়ার’ পৃথিবীকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। এতে ১৮.৬ মিলিয়ন হেক্টর বন পুড়ে গিয়েছিল, প্রাণ হারিয়েছিল কয়েক কোটি বন্যপ্রাণী। আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া প্রতি বছর দাবানলে বিপর্যস্ত হয়, যেখানে লক্ষাধিক মানুষকে ঘরছাড়া হতে হয় নিয়মিতভাবে। একইভাবে ব্রাজিলের অ্যামাজন বন প্রায় প্রতি বছরই দাবানলের শিকার হয়, যার পেছনে রয়েছে মানুষের কার্যকলাপ এবং কৃষিজমি সম্প্রসারণের প্রয়াস।
দাবানলের প্রভাব শুধু একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দাবানল থেকে প্রচুর পরিমাণে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়, যা জলবায়ু পরিবর্তনের গতি বাড়িয়ে দিচ্ছে। জীববৈচিত্র্যের ওপর এর প্রভাব ভয়াবহ। এর ফলে বন্যপ্রাণীদের আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে এবং অনেক প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। একই সঙ্গে মানুষের জীবনেও এর ক্ষতিকর প্রভাব কম নয়। ঘরবাড়ি হারানো, শ্বাসকষ্টজনিত রোগ এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয় সব মিলিয়ে ‘দাবানল’ একটি সর্বাত্মক সংকট তৈরি করে। তবে এই সংকট মোকাবিলা করা অসম্ভব নয়। দাবানল প্রতিরোধে প্রাকৃতিক এবং মানবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। ঝুঁকিপূর্ণ বনাঞ্চলে ‘ফায়ার ব্রেক’ বা আগুন ঠেকানোর পথ তৈরি করা যেতে পারে, যা আগুন ছড়িয়ে পড়া রোধ করবে। আগুন শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার এবং শুষ্ক মৌসুমে বনাঞ্চলে নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো দরকার।
জঙ্গলের অভ্যন্তরে পর্যাপ্ত জলাধার তৈরি এবং বন এলাকায় পর্যটকদের জন্য নির্ধারিত নিরাপত্তা নীতি কার্যকর করা জরুরি। না হলে একসময় আমাদেরই পস্তাতে হবে। আইনের কঠোর প্রয়োগ দাবানল প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বনাঞ্চলে ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগানোর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান করা প্রয়োজন। এ ছাড়া স্থানীয় জনগণকে সচেতন করার মাধ্যমে দাবানলের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। জুম চাষ কিংবা কাঠ সংগ্রহের মতো কাজে আগুন ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার। এই উদ্যোগ সরকারকে দ্রুত নিতে হবে। শুধু প্রয়োজন সদিচ্ছা।
বৈশ্বিক পর্যায়ে সহযোগিতা ছাড়া দাবানল প্রতিরোধ কার্যকর করা সম্ভব নয়। উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে প্রযুক্তি, অভিজ্ঞতা এবং অর্থনৈতিক সাহায্যের বিনিময় পরিবেশ রক্ষায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব কমাতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। বলা যায়, দাবানল একটি বৈশ্বিক সংকট, যা মোকাবিলায় প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা এবং মানুষের দায়িত্বশীল ভূমিকা অপরিহার্য। আমরা যদি এখনই সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ না করি, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পৃথিবী একটি অযোগ্য বসবাসের স্থানে পরিণত হবে। দাবানল রোধে সচেতনতা এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে আমরা পৃথিবীকে একটি সবুজ ও নিরাপদ স্থান হিসেবে গড়ে তুলতে পারি।
বাংলাদেশে দাবানলের সম্ভাবনা এবং প্রতিরোধের উপায় :
আমাদের সুজলা সুফলা বাংলাদেশ একটি আর্দ্র জলবায়ুর দেশ হওয়ায় দাবানলের মতো বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত মানবিক কার্যকলাপ এবং শুষ্ক মৌসুমে সৃষ্ট বিশেষ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশেও দাবানলের মতো ঘটনা ঘটতে পারে। দেশের বনাঞ্চল এবং পাহাড়ি এলাকাগুলো এ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে সুন্দরবন, চট্টগ্রামের পাহাড়ি বনাঞ্চল, সিলেটের গহিন জঙ্গল এবং মধুপুরের শালবন এলাকায় শুষ্ক মৌসুমে পাতা ও ঘাস শুকিয়ে আগুন ধরার উপযোগী পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
জুম চাষের জন্য পাহাড়ে ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন দেওয়া, মধু সংগ্রহকারীদের অসতর্কতা, কিংবা কৃষি জমিতে ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানো থেকে দাবানলের সূচনা হতে পারে। এ ছাড়া পর্যটন এলাকায় ক্যাম্পফায়ার বা অসতর্ক জ্বালানি ব্যবহার থেকেও আগুন ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে। তবে আগাম সতর্কতা অবলম্বন করে দাবানলের ঝুঁকি প্রতিরোধ করা সম্ভব। বনাঞ্চলে নজরদারি বাড়ানো, শুষ্ক মৌসুমে আগুন শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার এবং স্থানীয় জনগণকে সচেতন করা অত্যন্ত জরুরি। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে ‘ফায়ার ব্রেক’ তৈরি করা দরকার, যাতে আগুন এক স্থান থেকে আরেক স্থানে ছড়িয়ে পড়তে না পারে। বনাঞ্চলে পর্যাপ্ত জলাধার তৈরি এবং বনসংলগ্ন এলাকায় বসবাসকারীদের অগ্নিনিরাপত্তা প্রশিক্ষণ দেওয়াও কার্যকর হতে পারে।
বাংলাদেশে দাবানলের ঝুঁকি কম হলেও, বিষয়টি একেবারে এড়ানো যায় না। তাই সময়মতো পদক্ষেপ নিয়ে এবং পরিবেশ রক্ষায় সচেতন থেকে আমরা এই বিপর্যয়কে প্রতিরোধ করতে পারি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আধুনিক প্রযুক্তি এবং নীতিমালা বাস্তবায়ন করলে বাংলাদেশে দাবানলের ক্ষতি সীমিত রাখা সম্ভব হবে। এ ব্যাপারে কার, কী করণীয় তা নির্ধারণ করবে সরকারই।
লেখক: পরিবেশ বিশ্লেষক
mssadi9655@gmail.com