খ্রিস্টের জন্মের ওপর নির্ভর করে পশ্চিমের ইতিহাসবিদরা খ্রিস্টপূর্ব ও খ্রিস্টাব্দ এই দুটি ভাগে সময়কে ভাগ করেছেন। তবে, নানা যুগে নানা বিষয়কে কেন্দ্র করে এভাবে সময়কে ভাগ করা হয়েছে। আধুনিক যুগে যদি তেমন কোনো বিষয় বেছে নিতে হয়, তবে করোনাভাইরাসকে নেওয়া যায়। এই একটি ভাইরাস পৃথিবীর মানুষের জীবনযাত্রা আগাপাছতলা বদলে দিয়েছিল। করোনার ফলে বাধ্যগত লকডাউন তৈরি করেছিল নতুন এক দুনিয়া। গভীর প্রভাব ফেলেছে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সম্পর্ক আর সমীকরণে। অত্যাধুনিক দুনিয়া ভয়ে অসহায় হয়ে পড়েছিল মারণঘাতী ক্ষুদ্র ভাইরাসের জন্য। ঘর পোড়া গরু যেমন সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায়, করোনার পর থেকে সারা দুনিয়া তাই যেকোনো রকমের ভাইরাসের আগমনে শঙ্কিত হয়ে পড়ে। সম্প্রতি এই শঙ্কার নাম ‘রিওভাইরাস’। বাংলাদেশেও এই ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে।
দেশ রূপান্তরের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, নিপাহভাইরাসের মতো উপসর্গ আছে, খেজুরের কাঁচা রস খেয়েছে ও এনকেফালাইটিস বা মস্তিষ্কের প্রদাহ রয়েছে এমন রোগীদের পরীক্ষা করে এই ভাইরাস শনাক্ত করেছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। তবে আক্রান্তদের কারও অবস্থা গুরুতর ছিল না এবং তারা সবাই চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন বলে জানিয়েছেন আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীন। আইইডিসিআরের বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, রিওভাইরাস হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়ায়। এর লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে শ্বাসকষ্ট, জ¦র, মাথাব্যথা, বমি ও ডায়রিয়া। গুরুতর ক্ষেত্রে এটি নিউমোনিয়া বা এনকেফালাইটিস (মস্তিষ্কের প্রদাহ) সৃষ্টি করতে পারে। এ ক্ষেত্রে শিশু ও বয়স্করা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
বিশ্বব্যাপী ১৯৫০ সালে প্রথম রিওভাইরাস শনাক্ত করা হয়। শীতকালে এর প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়। বিশ্বে এ পর্যন্ত রিওভাইরাসের ৯টি ধরন শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে চারটি মানবদেহে সংক্রমণ ঘটাতে পারে। বাংলাদেশে যে ধরনটি শনাক্ত হয়েছে, সেটি ব্যাট-রিওভাইরাস, যা বাদুড়ের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। বিশেষত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব রয়েছে। তবে রিওভাইরাস নিপাহভাইরাসের মতো ভয়ংকর না। রেসপিরেটরি অর্থাৎ শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো উপসর্গ, যেমন হাঁচি, কাশি, জ্বর, ঠান্ডা হয়। এই ভাইরাসের ঝুঁকি হলো এটাও বাদুড় থেকে আসে, প্রাণী থেকে মানবদেহে আসছে। শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত রোগের মাধ্যমে ছড়াতে পারে।
শীতের সময় নিপাহভাইরাসের প্রকোপ বাড়ে। এ রোগে আক্রান্ত হলে শরীরে প্রচন্ড ব্যথা, জ্বর, মাথা ঘোরা, বমি ও খিঁচুনি হতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তি প্রলাপ বকে, অনেক সময় আক্রান্ত ব্যক্তি অজ্ঞান হয়ে যায়। শরীরে ভাইরাস প্রবেশের ৭-১৪ দিনের মধ্যে লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে। নিপাহভাইরাস বাদুড়ের মাধ্যমে ছড়ায়। বাদুড় কোনো রসের হাঁড়িতে মুখ দিলে সেখানে ছড়ায় ভাইরাস। আর সেই কাঁচা রস পান করলে ভাইরাস পৌঁছায় মানুষের দেহে। নতুন শনাক্ত ভাইরাসটিও একইভাবে ছড়াতে পারে। তবে এ ভাইরাস নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই বলে আশ্বস্ত করেন অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীন। অবশ্য এও বলেছেন যে, এ বিষয়ে আরও বিশ্লেষণ এবং গবেষণা প্রয়োজন। এই বিষয়ে প্রধান সতর্কতা হলো বাদুড় থেকে নিপাহ ও রিওভাইরাস আসছে। সুতরাং আরও অনেক ভাইরাস আসার সম্ভাবনা আছে। সুতরাং বাদুড় থেকে সংক্রমিত হয় এমন ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হতে হবে। যেমন আধা খাওয়া ফল খাওয়া, বাদুড়ে খাওয়া রস খাওয়া এসব থেকে নিজেদের নিরাপদ রাখতে হবে, যাতে প্রাণী থেকে কোনো ভাইরাস মানবদেহে না আসে। এই রিওভাইরাস হয়তো রেসপিরেটরি বা শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত রোগ তৈরি করে, কিন্তু এমন ভাইরাসও তো আসতে পারে, সেটা আরও মারাত্মক হতে পারে। ফলে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।
এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে। করোনাভাইরাস থেকে আমরা এই শিক্ষা পেয়েছি যে, ভাইরাসের ব্যাপারে সবাইকে একযোগে সতর্ক থাকতে হবে। সরকারই কেবল নয়, সামাজিকভাবে এবং ব্যক্তিপর্যায়ে স্বাস্থ্যবিধি অবশ্যই মেনে চলতে হবে। এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা থেকে একচুল কম হলেও তা বিরাট বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।