বন্ধ রেডিওথেরাপি চিকিৎসা

দেশে ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসায় একমাত্র সরকারি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান জাতীয় ক্যানসার হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের সাতটি রেডিওথেরাপি মেশিনের মধ্যে ৬টিই বিকল। এর মধ্যে ৪টি মেশিন নষ্ট ৭ বছর ধরে। আর বাকি দুটি নষ্ট হয়েছে গত বছরের ২১ ও ২২ ডিসেম্বর রেডিওথেরাপি চলাকালে। এসব মেশিনের মেয়াদ শেষ হয়েছে পাঁচ-ছয় বছর আগেই।

বাকি যে একটি রেডিওথেরাপি মেশিন চালু রয়েছে, সেটি এক ধরনের বিশেষায়িত রেডিওথেরাপি ‘ভ্রাকি মেশিন’। এটি দিয়ে জরায়ু মুখের ক্যানসারসহ নারীদের বিশেষ ক্যানসারের রেডিওথেরাপি দেওয়া হয়। এই মেশিনে সব ধরনের ক্যানসার রোগীর চিকিৎসা সম্ভব নয়।

ফলে এই মুহূর্তে ক্যানসার রোগীদের একমাত্র বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতালটিতে কোনো রেডিওথেরাপি চিকিৎসা পাচ্ছেন না রোগীরা। এতে দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বেসরকারি হাসপাতাল থেকে সরকারি হাসপাতালের তুলনায় ১০ গুণ বেশি দামে রেডিওথেরাপি নিতে হচ্ছে।

হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলছেন, জাতীয় ক্যানসার হাসপাতালে প্রতিটি মেশিন দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১০০ জনকে রেডিওথেরাপি দেওয়া সম্ভব। সে হিসেবে ৬টি মেশিন চালু থাকলে প্রতিদিন এখান থেকে সেবা পেতেন ৬০০ রোগী। এখন এসব রোগীকে ১০ গুণ বেশি টাকায় বাইরে থেকে রেডিওথেরাপি নিতে হচ্ছে।

সর্বশেষ ২২ দিন আগে নষ্ট হওয়া শেষ দুটি মেশিন মেরামতের চেষ্টা করছে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। কিন্তু ঠিক কবে নাগাদ মেশিন দুটি চালু করা যাবে, সে ব্যাপারে তারা কিছু বলতে পারছেন না।

সংকট সমাধানে দুটি নতুন মেশিন কেনা হয়েছে। সেগুলো স্থাপনের কাজ চলছে। হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ আশা করছেন, আগামী মার্চ নাগাদ দুটি মেশিন চালু করা সম্ভব হবে।

মেশিন নষ্ট হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন হাসপাতাল পরিচালক অধ্যাপক ডা. জাহাঙ্গীর কবির। তিনি গতকাল শনিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, রেডিওথেরাপির ৬টি মেশিন ছিল। চারটি ৫-৭ বছর ধরে নষ্ট। বাকি মেশিন দুটির মধ্যে একটি গত বছরের ২১ ডিসেম্বর ও আরেকটি ২২ ডিসেম্বর নষ্ট হয়েছে। এখনো ঠিক করতে পারিনি। চেষ্টা চলছে। আশা করছি শিগগির ঠিক করতে পারব। তবে আমরা দুটি নতুন মেশিন কিনেছি। সেগুলো স্থাপনের কাজ চলছে। আশা করছি আগামী ফেব্রুয়ারিতে একটি ও আরেকটি মার্চে চালু করা যাবে।

নতুন মেশিন কিনতে বাধা : হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ৬টি যে নষ্ট, এগুলোর চার-পাঁচ বছর আগেই মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। ফলে এগুলো নষ্ট হবে ও মেরামত করতে অনেক টাকা লাগবে এটাই স্বাভাবিক। উচিত ছিল যখন এসব মেশিনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে তখনই নতুন মেশিন কেনা ও প্রতিস্থাপন করা। কিন্তু সেটা হয়নি। কারণ ওই হাসপাতালের চিকিৎসকরা যেভাবে চাচ্ছিলেন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা সেভাবে চাচ্ছিলেন না। এর আগে ওই হাসপাতালের প্রত্যেকটি পরিচালককে খুব বাজেভাবে বদলি হতে হয়েছে। কারণ তাদের সঙ্গে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বনিবনা হচ্ছিল না। মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ব্যবসার দিকে বেশি মনোযোগী ছিলেন। আর হাসপাতালের চিকিৎসকরা চাচ্ছিলেন ভালো মেশিন আনতে, যাতে রোগীরা সঠিক চিকিৎসা পান। তিন-চারজন পরিচালককে খুবই বাজেভাবে সরানো হয়েছে। সর্বশেষ পরিচালক আওয়ামী লীগ মনোভাবাপন্ন হলেও তার সময়ে দুটি ভালো হাইটেক মেশিন এসেছে।

এক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন মেশিন আসুক সেটা মেশিন সরবরাহকারী ব্যবসায়ীরা চান না। কারণ নতুন মেশিন এলে তারা সেভাবে ব্যবসা করতে পারবেন না। পুরনো মেশিন ঠিক করার নামে তাদের ব্যবসা ভালো হয়।

নষ্ট মেশিন চালু নিয়ে অনিশ্চয়তা : ঠিক কবে নাগাদ সর্বশেষ নষ্ট হওয়া মেশিন দুটি চালু করা যাবে সেটা নিশ্চিত করতে পারেননি হাসপাতাল পরিচালক। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঠিক করার জন্য মেশিন প্রস্তুতকারক কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি থাকে। মেশিন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান চেষ্টা করছে মূল কোম্পানির মাধ্যমে মেশিন মেরামতের। কিন্তু তারা এখনো পারেনি। গতকাল কোম্পানির প্রকৌশলীর ভিসা হয়েছে। আশা করছি তারা আজ-কালের মধ্যে ভারত থেকে বাংলাদেশে আসবেন। তারা হয়তো কাল-পরশু চলে আসবে। চুক্তি অনুযায়ী নষ্টের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ঠিক করে না দিলে ওরা ক্ষতিপূরণ দেবে। কিন্তু ২২ দিন হয়ে গেল। ঠিক করে দেয়নি। কোম্পানির থেকে তেমন কোনো সহযোগিতা পাচ্ছি না। আরেকটি মেশিন কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করা আছে তারা ২০২৬ সালের জন্য মেশিন নষ্ট হলে ঠিক করে দেবে। সেটার ব্যাপারেও চেষ্টা করছি। তারা করতে পারছে না।

এই পরিচালক বলেন, এখন মাত্র একটি মেশিন চালু আছে। সেটা ভ্রাকি থেরাপি মেশিন। কিন্তু সেটা দিয়ে সব ধরনের ক্যানসারের চিকিৎসা হয় না। কিছু কিছু চিকিৎসা করা যায়।

পরিচালক আরও জানান, যে দুটি মেশিন নষ্ট হয়েছে, সেগুলো পুরনো মেশিন। একটি ২০১১ সালে ও আরেকটি ২০১৪ সালে কেনা। এরপর গত ১০ বছরে আর কোনো মেশিন কেনা হয়নি। এতদিন দুটি মেশিন চালু ছিল। ৪টি নষ্ট ছিল। দুটির মধ্যে একটি মেশিন ঠিক করে দিতে কোম্পানি বাধ্য। অন্যটি ঠিক করে দেওয়ার ব্যাপারে কোনো চুক্তি নেই। সেটি তারা রোগীদের স্বার্থে চালু রেখেছিল। সেটা চুক্তির পর্যায়ে নেই। পুরনো মেশিন। যন্ত্রাংশ পাওয়া যায় না। সে কারণে কোম্পানি ওই মেশিন ঠিক করে দিতে বাধ্য নয়।

কেনা হয়েছে দুটি মেশিন : হাসপাতাল পরিচালক দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুটি নতুন মেশিন এসেছে। স্থাপনের কাজ চলছে। আশা করছি একটি ফেব্রুয়ারিতে ও আরেকটি মার্চে চালু হতে পারে। কাজ চলছে। এর মধ্যে একটি মেশিনের দাম ২৭ কোটি টাকা ও আরেকটি ৩২ কোটি টাকা। আশা করছি এগুলো স্থাপন করা গেলে রোগীদের চিকিৎসা সহজ হবে।

হাসপাতালের এক চিকিৎসক জানান, যে নতুন দুটি মেশিন স্থাপন করছে সে দুটি মেশিন খুবই ভালো। এই মেশিন দুটি দিয়ে হাইটেক মডার্ন রেডিওথেরাপি দেওয়া যাবে।

দুর্ভোগে রোগীরা : হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, এখানে একটি মেশিনে প্রতিদিন ১০০ রোগীর বেশি রেডিওথেরাপি করতে পারে। এখন সব মেশিন নষ্ট থাকায় কোনো রেডিওথেরাপি হচ্ছে না। রোগীদের কষ্ট হচ্ছে। বাইরে অনেক খরচ। প্রতিবার থেরাপি করতে এখানে রোগীর খরচ ২০০ টাকা। একজন রোগীর পাঁচ সপ্তাহ পাঁচবার পাঁচ সেশনে ১০ হাজার টাকা খরচ হয়। অথচ বাইরে বেসরকারিভাবে খরচ হয় ১ লাখ টাকা।

হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, নতুন পরিচালক গত বছরের ১৭ নভেম্বর যোগ দিয়েছেন। তিনি চেষ্টা করছেন সংকট সমাধানের। গতকাল হাসপাতালে এসে রেডিওথেরাপি মেশিনের ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। স্বাস্থ্য উপদেষ্টা, সহকারী উপদেষ্টা বিষয়টি জেনেছেন। সবাই মিলে চেষ্টা করছেন যাতে দ্রুত রেডিওথেরাপি মেশিনগুলো চালু করা যায়।