কুড়িগ্রামের দুর্গম সীমান্ত এলাকা অনন্তপুর। একসময় বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তবর্তী এ এলাকার নাম হয়তো জেলা সদরের অনেকেই জানত না। তবে ১৪ বছর আগে দুর্গম এই সীমান্তের দুর্নাম ছড়িয়ে পড়ে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও। যদিও এর জন্য প্রাণ দিতে হয় ১৫ বছর বয়সী ফেলানী খাতুনকে। মূলত অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগ তোলে, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ফেলানীকে মেরে ঝুলিয়ে রাখে সীমান্তের কাঁটাতারে। প্রাণহীন নিথর দেহে বাদুড়ঝোলা কিশোরীর প্রাণের বিনিময়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রকাশ পায় দুই দেশের সীমান্তে যুগ যুগ ধরে চলে আসা বিএসএফের বর্বরতা। এমন ঘটনায় ১৪ বছরের মেয়ে হত্যার বিচার পাননি ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম।
অন্যদিকে ২০২০ সালে বিরোধপূর্ণ কাশ্মীর অঞ্চলের লাদাখ সীমান্ত। সংঘর্ষ বাধে ভারত ও চীনা সৈন্যদের মধ্যে। এতে অন্তত ২০ ভারতীয় সৈন্য নিহত হয়েছেন বলে ভারতীয় সেনা ও পররাষ্ট্র কর্মকর্তাদের বরাতে খবর নিশ্চিত করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। যদিও ভারতীয় সেনাবাহিনী সে সময় আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলেছিল, ১৭ জন ভারতীয় সৈন্য প্রচণ্ড ঠাণ্ডার মধ্যে ঘটা ওই সংঘর্ষে গুরুতর আহত হন এবং পরে মৃত্যুবরণ করেন।
তবে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে বলা হয়, ভারতীয় সৈন্যদের পিটিয়ে হত্যা করা হয়, কিন্তু সামরিক বাহিনী এ খবর নিশ্চিত করেনি। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশসহ পাকিস্তান, আফগানিস্তান, নেপাল, চীন ও মিয়ানমারের সীমান্ত রয়েছে। বাংলাদেশ সীমান্তে আগ্রাসী হলেও অন্য আর ছয়টি দেশের সীমান্তে সব সময় নতজানু থাকে বিএসএফ ও দেশটির অন্য বাহিনীগুলো। মার খায় কাশ্মীর অঞ্চলের লাদাখ সীমান্তের ঘটনার মতোই।
বিএসএফ সীমান্তে কী ধরনের বর্বরতা চালায়, সেটার চিত্র পাওয়া গেছে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) গত ১১ বছরের বার্ষিক সীমান্ত সংঘাতের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলো ঘেঁটে। আসকের হিসাব অনুযায়ী গত ১১ বছরে (২০১৪-২৪) বাংলাদেশের সীমান্তগুলোয় শুধু বিএসএফের গুলিতেই প্রাণ হারিয়েছে ২৮৯ বাংলাদেশি। সীমান্তরক্ষীদের গুলিতে এর একমাত্র ও অদ্বিতীয় উদাহরণ হলো আমেরিকা মহাদেশে যুক্তরাষ্ট্র আর মেক্সিকোর সীমান্ত।
বাংলাদেশ-ভারত আর যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্ত ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো দেশের সীমান্তে এমন হত্যাযজ্ঞ চালানো হয় না। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের এমন পরিস্থিতির নেপথ্য কারণ হিসেবে বিগত ক্ষমতাসীনদের নতজানু অবস্থানকে দায়ী করছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. আব্দুল হামিদ। বাংলাদেশ হাইকমিশন দিল্লিতে ২০১৪ থেকে ১০১৭ সাল পর্যন্ত ডিফেন্স অ্যাডভাইজার (সামরিক উপদেষ্টা) হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন এই সামরিক কর্মকর্তা।
দীর্ঘ সময়ে কাজের অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা আসলে বিগত সরকারের সময় দুই দেশের যে সম্পর্ক ছিল। সেই সম্পর্কের আওতায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ ধরনের বর্ডার কিলিং বা ফেলানী হত্যা— এসব বিষয়ে কোনো ধরনের জোরালো প্রতিবাদ করা হয়নি। তবে সাধারণ মানুষের ভেতরে সেই রক্তক্ষরণ ছিল, আছে। সাধারণ মানুষ এ ধরনের ঘটনায় অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবাদ করতে চেয়েও প্রতিবাদ করতে পারেনি। প্রতিবাদ করতে গিয়ে তারা বিভিন্ন ধরনের দমন-পীড়নে পড়েছে।’
তিন কায়দায় বাংলাদেশি হত্যা করে বিএসএফ
‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’ ও ‘চোরাকারবারি’র অভিযোগে বাংলাদেশের নাগরিকদের গুলি করে, ধাওয়া দিয়ে এবং পিটিয়ে হত্যা করে বিএসএফ। আসকের হিসাব অনুযায়ী গত ১১ বছরে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী শুধু গুলি করে মেরেছে ২৮৯ বাংলাদেশিকে। এ ছাড়া সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী সাত বছরে (২০১৮-২৪) বিএসএফ পিটিয়ে হত্যা করেছে ২৮ বাংলাদেশিকে। সেই সঙ্গে নানা কারণে সীমান্ত এলাকায় বিএসএফের ধাওয়ায় প্রাণপণ ছুটতে গিয়ে চার বছরে (২০২১-২৪) প্রাণ হারিয়েছে ছয়জন।
আসকের পর্যবেক্ষণে আরও উঠে এসেছে বিগত ১১ বছরে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো থেকে ধান কাটা, গরু চরানো, মাছ মারা ও গৃহস্থালির কাজ করা অবস্থায় ৩১৯ বাংলাদেশিকে ধরে নিয়ে গেছে বিএসএফ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধরে নিয়ে যাওয়া এই নাগরিকদের ভাগ্যে কী ঘটে, তা জানা যায় না। ধরে নিয়ে যাওয়া এই নাগরিকদের কতজন ফিরে আসেন, সেটাও থেকে যায় অজানা।
তবে আসকের গত চার (২০২১-২৪) বছরের হিসাব অনুযায়ী, ধরে নিয়ে যাওয়া বাংলাদেশিদের মধ্যে ফেরত এসেছেন মাত্র সাতজন। এই চার বছরে বিএসএফ বাংলাদেশ থেকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল ১৭ নাগরিককে। যাদের ১০ জনই ফিরে আসার খবর পাওয়া যায়নি।
রংপুর বিভাগের সীমান্তগুলোয় নিহত বেশি
খুলনা, রাজশাহী, রংপুর, সিলেট, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ বিভাগে সব থেকে বেশি সীমান্ত এলাকা। এর মধ্যে বিএসএফ সব থেকে বেশি আগ্রাসী থাকে রংপুর বিভাগের সীমান্ত এলাকাগুলোয়। আসকের হিসাব অনুযায়ী পাঁচ বছরে (২০২০-২৪) রংপুর বিভাগের সীমান্তগুলোয় বিএসএফের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছে ৯১ জন। এরপরই আছে রাজশাহী বিভাগের সীমান্ত এলাকা।
একই সময়ে রাজশাহী বিভাগের সীমান্ত এলাকায় বিএসএফ গুলি করে মেরেছে ৩৫ জনকে। সীমান্ত হত্যা নিয়ে বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠন ও কর্মীদের মতো সরব ভূমিকা পালন করছে ভারতের মানবাধিকার সংগঠন ও কর্মীরা। সীমান্ত হত্যা নিয়ে ভারতের মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চের (মাসুম) সচিব কিরীটী রায়ের ভাষ্য পাওয়া গেছে সংস্থাটির গত নভেম্বরের মাসিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে।
সেখানে তিনি বলেছেন, ‘এই সীমান্ত হত্যার পেছনে যে গল্প ফাঁদা হয়, তা-ও ঠিক না। তারা বলে, সীমান্ত দিয়ে গরু চোরাচালান হয়। চোরাচালানিদের হত্যা করা হয়। মনে হয় যেন সীমান্তে গরু জন্ম নেয় আর তা বাংলাদেশে পাচার করা হয়। বাস্তবে এসব গরু আনা হয় ভারতের অভ্যন্তরে দুই-আড়াই হাজার কিলোমিটার দূরের হরিয়ানা ও পাঞ্জাব থেকে। গরুগুলো হাঁটিয়ে, ট্রাক-ট্রেনে করে আনা হয়। তখন কেউ দেখে না! তারা আটকায় না। কারণ, তারা ভাগ পায়। এখানে আসল কথা হলো— দুর্নীতি, ভাগবাটোয়ারার মাধ্যমে সব করা হয়। যখন ভাগবাটোয়ারায় মেলে না, তখন বিএসএফ হত্যা করে।’
এদিকে ভারতের পেনাল কোড কিংবা আন্তর্জাতিক কোনো আইনেই নিরস্ত্র নাগরিককে গুলি করে বা নির্যাতন করে মেরে ফেলার বিধান নেই। কেউ অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপার করলে তাকে গ্রেপ্তার করে বিচার করা যেতে পারে। কিন্তু ভারত সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে স্বীকৃত সব আন্তর্জাতিক ও দ্বিপক্ষীয় প্রটোকল অগ্রাহ্য করে সীমান্ত হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে চলেছে।
ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত এ ধরনের দ্বিপক্ষীয় দুটি প্রটোকল হলো— জয়েন্ট ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ গাইড লাইনস ফর বর্ডার অথরিটিজ অব দ্য টু কান্ট্রিজ, ১৯৭৫ ও দ্য ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ কো-অর্ডিনেটেড বর্ডার ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান, ২০১১।
বদলে যাচ্ছে দৃশ্যপট
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার চৌকা সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ কেন্দ্র করে বিজিবি ও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) মধ্যে তিন দিন ধরে উত্তেজনা চলে। এতে যুক্ত হয় দুই দেশের স্থানীয় জনতা। এর আগে গত ৬ জানুয়ারি ভারতের মালদা জেলার সুখদেবপুর বিএসএফের ক্যাম্পের সদস্যরা সীমান্ত ঘেঁষে রাস্তা ও কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের কাজ শুরু করলে বাধা দেয় বিজিবি।
পরে গত মঙ্গলবার আবারও কাজ শুরু করলে দ্বিতীয়বারের মতো বাধা দেওয়া হয়। এ নিয়ে সীমান্তে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এরপর বুধবার সেক্টর কমান্ডার পর্যায়ের পতাকা বৈঠকের পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়। তারপরও দুই দেশের সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনী ও সাধারণ জনতার মধ্যে উত্তেজনা ছিল প্রবল। যদিও তিন দিন ধরে চলা উত্তেজনার পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়েছে।
গত বুধবার বিকেল থেকেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে। শনিবার সকাল থেকেই নিজ নিজ দেশের সীমানায় স্বাভাবিকভাবে টহল দিতে দেখা যায় বিজিবি ও বিএসএফ সদস্যদের। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের দীর্ঘ সময় পরে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে এমন ভূমিকায় দেখা গেছে, যা প্রশংসা কুড়িয়েছে সারা দেশে। এ ঘটনার পর কড়া অবস্থান জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
তার নমুনা মেলে রবিবার স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর বক্তব্যে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের জিরো লাইন থেকে দেড়শ গজের মধ্যে ভারতকে কোনো কাজ করতে দেওয়া হবে না। এর মধ্যে তিন জেলার পাঁচটি সীমান্তে বিএসএফকে কাজ বন্ধ করতে বাধ্য করা হয়েছে।
এমনটা উল্লেখ করে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘এখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতীয় হাইকমিশনারকে তলব করে বাংলাদেশের অবস্থান সম্পর্কে অবহিত করবে। আমাদের বিজিবি শক্ত অবস্থান নেওয়ায় তারা কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।’
বদলে যাওয়া প্রেক্ষাপট সম্পর্কে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. আব্দুল হামিদ বলেন, ‘ওদের (বিবিজি ও স্থানীয় মানুষের) পুঞ্জীভূত কষ্টের বহিঃপ্রকাশ এটা। যখন দেখে বাংলাদেশের সীমান্তে কোনো চুক্তি হলে আমাদের বর্তমান সরকার থেকে এটাকে প্রতিবাদ করা হয়। তখন আমাদের যারা ওই এলাকার জনগণ রয়েছে, তারাও এটার প্রতিবাদ করার সুযোগ পায়।’
তবে সীমানা পার হয়ে অন্য দেশের ভেতরে গিয়ে প্রতিবাদ করাকে নিরুৎসাহিত করা এবং সব সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ব্যাপারে জোর দেন সাবকে এই সামরিক কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, ‘বর্ডার ক্রস করে তাদের (অন্য দেশের মানুষ) ওপর আক্রমণ করে, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’