চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে চায় বিএনপি। সেভাবেই দলটি তাদের প্রস্তুতি নিয়ে এগোচ্ছে। দলীয়প্রধান লন্ডন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন। চিকিৎসাব্যবস্থার পরিবর্তন ও থেরাপি দেওয়ার পর তিনি নিজে নিজে হাঁটতে পারছেন। আগামী নির্বাচনে তিনিই নেতৃত্ব দেবেন এমন মনোভাব পোষণ করেছেন দলটির নীতিনির্ধারকরা।
খালেদা জিয়া দেশে থাকাকালেই বিএনপি নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেছিল। সার্বিক বিষয় দেখভাল করছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। খালেদা জিয়ার পরামর্শে ২ শতাধিক আসনে দলটির প্রার্থী চূড়ান্ত করে প্রস্তুতি নিতে নির্দেশনা রয়েছে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের। সবুজসংকেত দেওয়া হয়েছে বিকল্প প্রার্থীদেরও। এই প্রার্থীরা নির্বাচনের জন্য দলে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে ৫ আগস্টের পর থেকেই কাজ করা শুরু করেন। জনসংযোগের পাশাপাশি সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোয় যোগ দিয়ে এবং নিজ নিজ এলাকায় প্রতিটি ইউনিটকে পুনর্গঠন করে জোরদার সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
বিশেষ করে গত মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে চলতি বছরের শেষ বা পরের বছরের দ্বিতীয় ভাগে নির্বাচন আয়োজন হতে পারে এমনটি ঘোষণা করা হলে নড়েচড়ে বসে রাজনৈতিক দলগুলো। অন্য দলগুলোর মতো বিএনপিতেও নির্বাচনী আমেজ তৈরি হয়। গতকাল সোমবার সংবাদ সম্মেলন করে চলতি বছরের জুলাই-আগস্টে নির্বাচনের দাবি তোলে বিএনপি। তাদের এই দাবির পর আন্দোলনে থাকা জোটসঙ্গী ও জামায়াতে ইসলামীসহ প্রায় সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে আগামী সংসদ নির্বাচন নিয়ে আলোচনা আরও ব্যাপকতা পেয়েছে।
নেত্রকোনা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মো. আনোয়ারুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। পাশাপাশি দলের পুনর্গঠনের লক্ষ্যে জেলা কাউন্সিল সম্পন্ন করার নির্দেশনা দিয়েছেন।’
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। তবে শেষ পর্যন্ত কত আসনে প্রার্থী দেব, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।’
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একদিকে আমরা অন্তর্বর্তী সরকারকে নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার দাবি জানাচ্ছি, অন্যদিকে নিজেরা দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করছি। পাশাপাশি আগামী সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। আশা করছি, সরকার শিগগিরই নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করবে।’
বিএনপির সূত্রগুলো বলছে, গত ৫ জানুয়ারি খালেদা জিয়ার বাসভবনে গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির সদস্যরা। বৈঠকের একপর্র্যায়ে সিনিয়র এক সদস্য খালেদা জিয়ার উদ্দেশে বলেন, ‘আপনি দ্রুত সুস্থ হয়ে আসেন। আপনার নেতৃত্বে আমরা আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেব। জবাবে “হাসি”
দিলেও খালেদা জিয়া কোনো মন্তব্য করেননি। তবে বিএনপিপ্রধানের পরামর্শে তারেক রহমান দলের দেখভাল যেভাবে করছেন, আগামী নির্বাচনের যে ছক সাজাচ্ছেন, এতে তার আস্থা রয়েছে বলে মনে করেন ওই বৈঠকে অংশ নেওয়া নেতারা।’
জানা গেছে, নির্বাচনের আগে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সক্রিয় রাখতে তারেক রহমান মাঝেমধ্যে ভার্চুয়ালি সংযুক্ত হয়ে বিভিন্ন জেলা-উপজেলা নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন। সম্ভাব্য প্রার্থীরা সক্রিয় কি না, সে বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন। আসন্ন নির্বাচনে শতাধিক আসনে অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতাদের এবার প্রাধান্য দিতে চান তারেক রহমান। এরই মধ্যে বিভিন্ন আসনে তরুণ নেতাদের নির্বাচনের বিষয়ে প্রস্তুতি নিতে ‘সবুজসংকেত’ দিয়েছেন। প্রার্থীরা বিএনপির ইতিবাচক কর্মকাণ্ড ও চিন্তাভাবনা তুলে ধরার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কাছে ধানের শীষ প্রতীক তুলে দিয়ে কৌশলে প্রচার চালাচ্ছেন। সম্ভাব্য প্রার্থীদের আমলনামা যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চালিয়ে যেতে গুলশান অফিসের কাজ চলছে বলে জানা গেছে।
কারা প্রার্থী হতে পারেন এমন প্রশ্নের জবাবে দলটির সংশ্লিষ্ট একাধিক সিনিয়র নেতা দেশ রূপান্তরকে জানান, দলের সাবেক এমপি বিশেষ করে ২০১৮ সালের নির্বাচনে যারা প্রার্থী ছিলেন, তারা এবং বিএনপির সহযোগী সংগঠন ছাত্রদল থেকে উঠে আসা নেতারা আগামী নির্বাচনে বেশি গুরুত্ব পাবেন। তবে কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক এমপিরা এখন নিজ নিজ এলাকায় কাজ করলেও গত ১০ বছরে যারা সক্রিয় ছিলেন না, তারা এই নির্বাচনে বিবেচনায় আসবেন না। কিন্তু যারা যৌক্তিক কারণে নিষ্ক্রিয় ছিলেন, তাদের বিবেচনায় আনার বিষয়ে দল পরে সিদ্ধান্ত নেবে।
নির্বাচনী কর্মকা-ে যাতে ব্যাঘাত না ঘটে, সেজন্য ইউনিয়ন, উপজেলা, পৌর, থানা কমিটি থেকে শুরু করে মহানগর ও জেলা কমিটি সম্মেলন এবং কাউন্সিলের মাধ্যমে আগামী ৬০ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের জন্য গত মাসে তৃণমূলে চিঠি দিয়ে নির্দেশনা দিয়েছে বিএনপি। ঢাকা ছাড়া ৯টি সাংগঠনিক বিভাগে ৯ সিনিয়র নেতাকে তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সূত্রগুলো বলছে, ঢাকা-৪, ঢাকা-১১ ঢাকা-১২, ঢাকা-১৩, ঢাকা-১৫, ঢাকা-১৮, ঢাকা-২০, কক্সবাজার-১, ভোলা ১, ভোলা-৩, খুলনা-৩, যশোর-৩, মুন্সীগঞ্জ-২, মুন্সীগঞ্জ-৩, টাঙ্গাইল-৫, নারায়ণগঞ্জ-২, ফেনী-৩, বাগেরহাট-৩, ঝিনাইদহ-৪, ফরিদপুর-৪, বাগেরহাট-৪, যশোর-৪, বগুড়া- ৫, রংপুর-২, লালমনিরহাট-৩, কুড়িগ্রাম-১, কুড়িগ্রাম-৩, গাইবান্ধা-৪, নাটোর-১, চট্টগ্রাম-৫, চট্টগ্রাম-২, বরিশাল-৫, সিরাজগঞ্জ-৬, পটুয়াখালী-২, সিলেট-৩, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫, নেত্রকোনা-১, সিরাজগঞ্জ-২, নওগাঁ-৩-সহ আরও কয়েকটি আসনে যারা কাজ করছেন, তাদের বিষয়ে অনেকটাই ইতিবাচক দলের হাইকমান্ড।
এদিকে বিএনপি গত ১৬ বছরে আন্দোলনে সঙ্গীদের আসন ছাড় দেবে। ফলে সমমনা দলগুলোর নেতারাও নির্বাচনের প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু করেছেন। জানা গেছে, বগুড়া-২ আসনে নাগরিক ঐক্যের, ঢাকা-৮ অথবা বাগেরহাট-১ আসন থেকে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির, লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি), ভোলা সদর আসনসহ ঢাকার একটি আসনে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি), লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসনে বাংলাদেশ এলডিপির, কুমিল্লা-৭ (চান্দিনা) আসনে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি, কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে বাংলাদেশ জাতীয় দলের, নড়াইল-২ আসনে এনপিপির, কুষ্টিয়া-২ আসনে জাতীয় পার্টির (জাফর), ঢাকার একটি আসন থেকে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন-এনডিএমর, ফেনী-৩ আসনে জেএসডির, জামালপুর- ৫ আসনে ভাসানী অনুসারী পরিষদের, পটুয়াখালী-৩ আসন ও ঝিনাইদাহ-২ আসনে গণ অধিকার পরিষদের, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ নিজে অংশ না নিলেও চট্টগ্রাম-১৪ (সাতকানিয়া ও চন্দনাইশ) তার পক্ষে একজন। এ ছাড়া চট্টগ্রাম-৭, ময়মনসিংহ-৮, ময়মনসিংহ-১০, গোপালগঞ্জ-১ আসনে এলডিপির, ঢাকার দুটি আসনে গণফোরামের শীর্ষ দুই নেতা ও লেবার পার্টির শীর্ষ এক নেতাসহ কয়েকটি সমমনা দলের শীর্ষ নেতারা আগামী নির্বাচন সামনে রেখে নানা তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন।
নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে সারা দেশেই নানা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে সরব রয়েছে দলটি। এসব কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে যেসব নির্বাচনী আসনে ভালো করতে পারবে, সেসব আসনে প্রার্থীদের নামও ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচন সামনে রেখে এ-সংক্রান্ত কমিটিগুলোর নিয়মিত বৈঠক হচ্ছে। বৈঠক থেকে জেলাগুলোর দায়িত্বে থাকা নেতাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। যেসব আসনে প্রার্থী এখনো বাছাই হয়নি, সেখানে প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়ায় নতুন প্রার্থী যোগ-বিয়োগ করছে এই কমিটি। সম্প্রতি কক্সবাজারের চকরিয়ায় এক সমাবেশে কক্সবাজার শহর জামায়াতের আমির আবদুল্লাহ আল ফারুককে চকরিয়া-পেকুয়া আসনের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেন সংগঠনটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা মুহাম্মদ শাহজাহান। জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তরের নবনির্বাচিত আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন আগামী নির্বাচনে সিলেট-৬ (বিয়ানীবাজার-গোলাপগঞ্জ) আসনে জামায়াতের পক্ষ থেকে নিজের প্রার্থিতা ঘোষণা করা হয়।