আলোচিত ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালানের ঘটনায় করা মামলায় হাইকোর্টের রায়ে খালাস পেয়েছেন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ছয়জন। একই মামলায় সাজা কমেছে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার সামরিক কমান্ডার পরেশ বড়ুয়াসহ পাঁচজনের। পাশাপাশি চার আপিলকারী মৃত্যুবরণ করায় তাদের আপিলের পরিসমাপ্তি (অ্যাবেট) ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট। সাজাপ্রাপ্তদের আপিলের ওপর শুনানি নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি নাসরিন আক্তারের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেয়। এর আগে একই ঘটনায় চোরাচালানের মামলায় গত ১৮ ডিসেম্বর ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) ও আপিলের ওপর রায় দেয় হাইকোর্ট। এতে অস্ত্র চোরাচালানের ঘটনায় বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলার সংশ্লিষ্ট ধারায় বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড থেকে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ছয়জন খালাস পান। এ ছাড়া এ মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য ৬ আসামির সাজা কমিয়ে ১০ বছর করে কারাদণ্ডাদেশ দেয় হাইকোর্ট। এ মামলায় বিচারিক আদালতে সর্বোচ্চ দণ্ডপ্রাপ্ত ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার সামরিক কমান্ডার পরেশ বড়ুয়ার সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় হাইকোর্ট।
গত ৩০ নভেম্বর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় মৃত্যুদণ্ড থেকে খালাস পান লুৎফুজ্জামান বাবর। জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের একটি মামলায় ২০২১ সালের ১২ অক্টোবর লুৎফুজ্জামান বাবরকে আট বছর কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছিল ঢাকার একটি আদালত। আপিলের পর গত বছরের ২৩ অক্টোবর হাইকোর্ট তাকে সাজা থেকে খালাস দেয়। সাজা হওয়া সব মামলাতেই খালাস পেলেন তিনি। গতকাল তার আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির সাংবাদিকদের বলেন, লুৎফুজ্জামান বাবরের কারামুক্তিতে আর কোনো বাধা নেই। হাইকোর্টের রায়ের সংক্ষিপ্ত আদেশ (অ্যাডভান্স অর্ডার) পেলেই তিনি দ্রুত কারামুক্ত হবেন।
যাবজ্জীবন থেকে যারা খালাস পেলেন : অস্ত্র মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর ও সাবেক শিল্পমন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামী (অন্য মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর) আপিল করেছিলেন। হাইকোর্ট তার আপিল পরিসমাপ্তি ঘোষণা করে বিষয়বস্তু বিবেচনা ও ঘটনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা না থাকায় তাকে খালাস দিয়েছে। যারা খালাস পেলেন তারা হলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা চিটাগং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডের (সিইউএফএল) তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মহসিন উদ্দিন তালুকদার, তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) কে এম এনামুল হক, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব নুরুল আমিন।
সাজা কমেছে পাঁচজনের : অস্ত্র মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ১৪ জনের মধ্যে পরেশ বড়ুয়াসহ পাঁচজনের সাজা কমিয়েছে হাইকোর্ট। পরেশ বড়ুয়াকে দেওয়া হয়েছে ১৪ বছর কারাদণ্ডাদেশ। এ ছাড়া জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআইয়ের সাবেক উপপরিচালক মেজর (অব.) লিয়াকত হোসেন, তৎকালীন পরিচালক উইং কমান্ডার (অব.) সাহাব উদ্দিন আহাম্মদ ও হাফিজুর রহমান এবং সংস্থার তৎকালীন মাঠ কর্মকর্তা আকবর হোসেন খানের সাজা কমিয়ে তাদের ১০ বছর করে কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিচার চলার সময় মৃত্যুবরণ করায় সাবেক শিল্পমন্ত্রী ও জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন আমির মতিউর রহমান নিজামী, এনএসআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. আবদুর রহিম, শ্রমিক সরবরাহকারী দ্বীন মোহাম্মদ ও ট্রলারমালিক হাজি সোবহানের আপিল অ্যাবেট (পরিসমাপ্তি) ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট। আদালতে আসামিপক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহানসহ শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির, অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আহসান। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সুলতানা আক্তার রুবী। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সুলতানা রুবী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় পেলে এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল করা হবে।’
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল চট্টগ্রামের ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডের (সিইউএফএল) ঘাট থেকে ১০ ট্রাক অস্ত্র চালানের ঘটনায় চোরাচালান ও অস্ত্র আইনে দুটি মামলা হয়। ২০১৪ সালের ৩০ জানুয়ারি চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালত এবং বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১ এ মামলার রায়ে মতিউর রহমান নিজামী, লুৎফুজ্জামান বাবর, পরেশ বড়ুয়া, রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, আবদুর রহিমসহ ১৪ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। এ ছাড়া অস্ত্র আইনের মামলায় ১৪ আসামিকে যাবজ্জীন কারাদণ্ড দেয় আদালত। এরপর মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির জন্য হাইকোর্টে আসে। এর ধারাবাহিকতায় হাইকোর্টে এ মামলার নিষ্পত্তি হলো।
নেত্রকোনায় আনন্দ মিছিল : বাবরসহ সব আসামিকে খালাস দিয়ে হাইকোর্টের রায় ঘোষণার পর গতকাল বিকেলে নেত্রকোনা সদর ও মদন উপজেলায় আনন্দ মিছিল করেছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। শহরের কোর্ট স্টেশন এলাকা থেকে একটি আনন্দ মিছিল শুরু হয়ে প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে একই স্থানে গিয়ে শেষ হয়। মিছিলে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ইসলাম উদ্দিন চঞ্চল, সেলিম আহমেদ, জেলা যুবদলের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি আব্দুল্লাহ আল মামুন রণি ও রফিকুল ইসলাম রফিক, পৌর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আফাজ উদ্দিন খান চন্দন, বিএনপির ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক, ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক হেলিম আহমেদ, ২ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি শাজাহান সরদারসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা অংশ নেন।
অন্যদিকে বাবরের নিজ নির্বাচনী এলাকা মদন উপজেলা বিএনপির একটি আনন্দ মিছিল উপজেলার দলীয় কার্যালয় থেকে শুরু হয়ে প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে।