জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় সবাই খালাস

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে এতিমদের জন্য বিদেশ থেকে আসা ২ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগের মামলা থেকে বেকসুর খালাস পেলেন বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। একই মামলায় তার ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ আরও চারজনকে খালাস দিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সাজার বিরুদ্ধে খালেদা জিয়াসহ অন্যদের আপিলের ওপর শুনানি নিয়ে গতকাল বুধবার প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে গঠিত পাঁচ বিচারপতির আপিল বিভাগ সর্বসম্মতিক্রমে এ রায় দেয়।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এ মামলায় প্রায় সাত বছর আগে অধস্তন আদালতের রায় এবং ছয় বছরের বেশি সময় আগে হাইকোর্টের রায় বাতিল করে আদেশ দেয় আপিল বিভাগ।    

এই মামলাকে ম্যালিসাস প্রসিকিউশন (বিদ্বেষপূর্ণ কার্যপ্রণালী) উল্লেখ করে রায়ে আদালত বলেন, ‘আপিলকারীদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কোনো দোষ পাওয়া যায়নি। এই মামলায় ইচ্ছাকৃতভাবে আইনের অপব্যবহার করা হয়েছে।’ আদালত বলে, সর্বসম্মতিক্রমে সবার আপিল মঞ্জুর করা হলো। সেই সঙ্গে হাইকোর্ট ও বিচারিক আদালতের রায় বাতিল করা হলো। আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় বেকসুর খালাস দেওয়া হলো। যারা আপিল করেননি, এই রায় তাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। আপিল বিভাগ আরও বলে, ‘এই সিদ্ধান্তের ফলে সাজাপ্রাপ্ত সবাই তাদের মর্যাদা ফিরে পেলেন এবং তারা যে নির্দোষ তা প্রতিষ্ঠিত হলো।’

দেশজুড়ে আলোচিত জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার সাজার মাধ্যমে প্রায় সাত বছর আগে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাবাসে যান। যদিও বিএনপির আইনজীবী ও দলটির নেতারা সব সময় দাবি করে আসছিলেন এ মামলায় যে অর্থ আত্মসাতের কথা বলা হয়েছে সে ব্যাপারটি সত্য নয়। ট্রাস্টের নামে গচ্ছিত টাকা ব্যাংকে রয়েছে এবং তা সুদে-আসলে দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। খালেদা জিয়া অবিচারের শিকার। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা বলে আসছিলেন খালেদা জিয়া এতিমের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। তার বিচার সঠিক। গতকাল আপিল বিভাগের রায়ে এসব বিতর্কের অবসান হলো।

মামলার ইতিবৃত্ত : জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে খালেদা জিয়াসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই এ মামলাটি করে দুদক। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর বকশীবাজারে স্থাপিত বিশেষ আদালতে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছর কারাদ-াদেশ ও অর্থদ- দেয়। একই সঙ্গে খালেদা জিয়ার বড় ছেলে ও বিএনপির তখনকার সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব (এখন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন) তারেক রহমান, সাবেক মুখ্য সচিব ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মোমিনুর রহমানকে ১০ বছর করে কারাদ-াদেশ দেওয়া হয়। রায়ে বলা হয়, খালেদা জিয়ার বয়স ও সামাজিক মর্যাদা বিবেচনায় তাকে কম সাজা দেওয়া হয়েছে।

বিচারিক আদালতের রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি পাওয়ার পর একই বছর হাইকোর্টে আপিল করেন খালেদা জিয়া। এছাড়া কারাদ- ও অর্থদ-ের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন সালিমুল হক ও শরফুদ্দিন আহমেদ। অন্যদিকে খালেদা জিয়ার সাজা বাড়াতে আপিল করে দুদক। তারেক রহমান, কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী আইনের দৃষ্টিতে পলাতক থাকায় আপিলের সুযোগ পাননি।

দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট খালেদা জিয়ার সাজা বাড়ানোর প্রশ্নে রুল দেয়। আপিল ও রুলের ওপর শুনানি শেষে ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর হাইকোর্টের রায়ে খালেদা জিয়ার আপিল খারিজ হয়ে যায়। এছাড়া দুদকের আবেদনের ওপর দেওয়া রুল যথাযথ ঘোষণা করে খালেদা জিয়ার সাজা বাড়িয়ে ১০ বছর কারাদ-ের রায় দেয় হাইকোর্ট। অন্যদিকে সালিমুল হক কামাল ও শরফুদ্দিন আহমেদের আপিল খারিজ হলে তাদের ১০ বছর সাজা বহাল থাকে। পাশাপাশি তারেক রহমান, কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও মোমিনুর রহমানের আপিলের সুযোগ না থাকায় তাদের সাজাও বহাল থাকে হাইকোর্টের রায়ে।

দুই বছরের বেশি কারাবাসের পর ২০২০ সালের মার্চে সরকারের নির্বাহী আদেশে খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিত হলে তিনি কারাবাস থেকে মুক্তি পান। গণ-অভ্যুত্থানে গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতির আদেশে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা মওকুফ করা হয়। এরপর ১১ নভেম্বর জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়ার পক্ষে আপিল বিভাগ থেকে আপিলের অনুমতি নেন তার আইনজীবীরা। আপিল বিভাগ সাজার রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করে। দুই মামলায় সাজা মওকুফের পরেও আপিল শুনানির যুক্তি হিসেবে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা তখন বলেছিলেন, বিএনপির চেয়ারপারসন আইনের প্রতি শ্রদ্ধশীল। তিনি আইনিভাবেই মামলা মোকাবিলা করে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চান। অন্যদিকে সালিমুল হক কামাল ও শরফুদ্দিন আহমেদ হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন। তিনটি আপিলের ওপর গত ৭ জানুয়ারি শুনানি শুরু হয়। চার কার্যদিবস শুনানি নিয়ে আপিল বিভাগের এ রায় হলো।

আদালতে খালেদা জিয়ার পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীন, এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, এম বদরুদ্দোজা বাদল ও ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। সালিমুল হকের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান। খালেদা জিয়া ও শরফুদ্দিন আহমেদের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। দুদকের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী আসিফ হাসান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল আরশাদুর রউফ ও অনীক আর হক।

রায়ের প্রতিক্রিয়ায় অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ মামলায় সারবত্তা কিছুই ছিল না। যে সাজা দেওয়ার মতো কোনো উপাদান ছিল না সেই মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ ৫ বছর থেকে ১০ বছর করেছে, এটা খুবই দুঃখজনক। তখন (আওয়ামী লীগ সরকারের সময়) বিচারব্যবস্থা বলে কিছুই ছিল না। ফ্যাসিস্ট সরকার যেভাবে বলত, সেভাবে আদালতের রায় হতো। আজ মনে হয়েছে বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করেছে।’ 

ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, ‘এই মামলা ছিল শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত জিঘাংসার প্রতিফলন। তিনি (শেখ হাসিনা) সংসদে দাঁড়িয়ে মিথ্যা বলতেন। বলতেন, তিনি (খালেদা জিয়া) নাকি এতিমের টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এই রায়ে খালেদা জিয়া নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন। আজ প্রমাণিত হলো, খালেদা জিয়া-তারেক রহমানের ওপর অবিচার করা হয়েছিল।’

দুদকের আইনজীবী আসিফ হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাইকোর্ট ও বিচারিক আদালতের রায় বাতিল করেছে আপিল বিভাগ। সেইসঙ্গে যারা আপিল করতে পারেননি, তাদেরও খালাস দিয়েছে আদালত। পুরো মামলাকেই ‘ম্যালিশাস প্রসিকিউশন’ বলেছে আদালত। তিনি বলেন, আপিলের শুনানিকালে তিনি শুনেছেন যে সাজাপ্রাপ্ত মোমিনুর রহমান পলাতক থাকাবস্থায় মারা গেছেন। তিনি  আরও বলেন, ‘এই রায়ের বিষয়টি দুদককে চিঠি দিয়ে জানাব। কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’