মানুষের বয়স যত বাড়ে, তত বেড়ে যায় রোগ এবং অক্ষমতার ঝুঁকি। প্রাচীনকাল থেকেই অমরত্ব এবং চির যৌবনের ধারণায় মানুষ বিভোর থেকেছে। আধুনিক বিজ্ঞান গবেষণা করে চলেছে মানুষের এই অধরা স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে। এ বিষয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব
বয়স বাড়ে কেন
বয়স নিয়ে মানুষের ভাবনা সেই প্রাচীনকাল থেকেই। কী করে তারুণ্য ধরে রাখা যায়, এ নিয়ে রয়েছে বিস্তর জল্পনা-কল্পনা। এক সময়ে মানুষের গড় আয়ু ছিল কম। নানারকম কারণে ২০-২৫ বছরের মধ্যেই মানুষের মৃত্যু হতো। ২০২২ সালের এক গবেষণা থেকে জানা যায়, পৃথিবীতে মানুষের গড় আয়ু ৭১ ছুঁয়েছে, যা মানুষের জন্য বড় রকমের সুখবর। কিন্তু পৃথিবী জুড়ে মানুষের গড় আয়ু বেড়ে যাওয়ায় যোগ হচ্ছে বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত রোগ ও অক্ষমতার ঝুঁকি। ফলে গড় আয়ু বেড়ে যাওয়া পুরো পৃথিবীর জন্য একটি সমস্যা হয়ে উঠছে। মানুষের রোগকে কী করে নির্মূল করা যায় এ নিয়ে চলছে গবেষণা। বিজ্ঞানীরা ভাবছেন, প্রতিটি রোগ আলাদাভাবে চিকিৎসা করার পরিবর্তে, বয়স বৃদ্ধির প্রক্রিয়ার কার্যকর সমাধান জরুরি।
মানুষ এখনো পুরোপুরি জানে না কেন বয়স বাড়ে। গবেষকদের ধারণা, বিভিন্ন কারণে মানুষের বয়স বেড়ে যায়। বয়স বাড়ে আমাদের কোষ ও পেশিগুলো ধীরে ধীরে দুর্বল হওয়ার ফলে। যদিও শরীরের ভেতরের এই ক্ষতি মেরামতের জন্য কিছু ব্যবস্থা রয়েছে। যাকে সহজ ভাষায় বলা হয় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, এই ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। বিজ্ঞানীরা বয়স বৃদ্ধির ক্ষেত্রে শরীরে এর প্রভাবগুলো নিয়ে গবেষণা করছেন। তারা চেষ্টা করছেন যেন তারা কোষের ক্ষয়কে ধীর করতে পারেন। এমনকি তারা কোষের ক্ষতিকে কী করে বিপরীতমুখী করা যায় যে উপায়ও খুঁজে বের করতে চেষ্টা করছেন। এর ফলে বয়সের সঙ্গে সম্পর্কিত রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং চিকিৎসা বহু দূর এগিয়ে যাবে।
বয়স বৃদ্ধির প্রভাব ব্যক্তি বিশেষ আলাদা। কিছু মানুষ আছে যারা অন্যদের তুলনায় ধীরে ধীরে বয়সী হন। বায়োলজিক্যাল বয়স হলো মানুষের শরীরের কোষের ক্ষতির মাপকাঠি। এর মাধ্যমে বয়স বৃদ্ধির হার মাপা যায়। যা বয়স সম্পর্কিত রোগের ব্যাপারে আগে থেকেই জানা যাবে। গবেষকরা ‘এজিং ক্লক’ এবং আরও বিভিন্ন উপায় উদ্ভাবন করছেন। যেমন গবেষকরা ডুনেডিন-পেইস তৈরি করছেন, যা বায়োলজিক্যাল বয়স এবং ব্যক্তির বয়স বৃদ্ধির গতি পরিমাপ করতে সহায়ক। ডুনেদিন-পেইস অ্যালগরিদম ডিএনএ মেথাইলেশন এবং বায়োমার্কার ব্যবহার করে বয়স বৃদ্ধির গতি হিসাব করে। এর মাধ্যমে রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি এমন মানুষদের চিহ্নিত করা সম্ভব। মানুষের শরীরের কোন অঙ্গ কোন মাত্রায় বয়স্ক হচ্ছে এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত স্বাস্থ্যসেবা কৌশলগুলো কী হবে বের করতে সাহায্য করবে। ফলে চিকিৎসা হবে আরও দ্রুত ও সফল।
বয়স থামিয়ে রাখা যায়
বয়স বৃদ্ধির সবচেয়ে গুরুতর প্রভাবকগুলোর মধ্যে একটি হলো স্নায়বিক ক্ষরণ। মস্তিষ্কের স্নায়বিক যোগসূত্রকে শক্তিশালী করার ক্ষমতা, যাকে সাইনোটিক প্লাস্টিসিটি বলা হয়। যা বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে কমে যায়। এই পতনটি বিশেষভাবে হিপোক্যাম্পাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। হিপোক্যাম্পাস হলো মগজের একটি অংশ, যা স্মৃতি এবং মানুষের নতুন কিছু শেখার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করে। এটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে স্নায়বিক অক্ষমতা এবং স্নায়ুতন্ত্র সম্পর্কিত রোগ সৃষ্টি করতে পারে। ২০১৪ সালে, ডা. টনি উইস-করয়ে এবং তার সহকর্মীরা আবিষ্কার করেন যে, তরুণ ইঁদুরের রক্ত বয়স্ক ইঁদুরের দেহে প্রবেশ করানোর ফলে তার মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বেড়ে গেছে। বিশেষ করে হিপোক্যাম্পাসে সাইনোটিক প্লাস্টিসিটি বৃদ্ধি হয়েছে। এর অর্থ হলো, তরুণ রক্তে এমন কোনো উপাদান রয়েছে, যা বয়স সম্পর্কিত এবং স্নায়বিক ক্ষরণকে বিপরীতমুখী করতে সহায়তা করে। তবে নিজের জীবনযাপন বদলে ফেলেও ধরে রাখা যায় বয়স। এর জন্য প্রতিদিনের জীবনে আনতে হবে পরিবর্তন। ওয়েবএমডির একটি গবেষণা থেকে জানা যায় যে, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন বয়স কমিয়ে রাখতে পারে। ধূমপান হৃদরোগ এবং ফুসফুসের সমস্যার সৃষ্টি করে। ত্বক দ্রুত বুড়িয়ে যায়। নিয়মিত অ্যালকোহল পান করলে কোষ, জিন এবং লিভারের প্রদাহ ঘটে।
আমাদের শরীরের কোষের পুনর্গঠন এবং মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য হলো ভালো ঘুম। ভালো ঘুম দিতে পারে উজ্জ্বল ত্বক, সুস্থ দেহ এবং শান্তিময় মন।
মনের মতো একজন চিকিৎসক বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। একজন ডাক্তার খুঁজে বের করতে পারেন যিনি আপনার মানসিকতা বুঝে ঠিক পথে চালিত করতে পারেন। জীবনে আনতে পারেন খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন। চর্বি জাতীয় খাবার কমিয়ে জটিল কার্বোহাইড্রেট, হোলগ্রেইন জাতীয় খাবার, ফল এবং তেলযুক্ত মাছ খাওয়া কোষের সুরক্ষার জন্য উপকারি।
বিভিন্ন গবেষণা থেকে এটি ধারণা করা যায়, ৩০ শতাংশ ক্যালোরি কমিয়ে ফেললে মানুষের জীবনকাল বৃদ্ধি পায়। গবেষক ড্যানিয়েল বেলস্কি জানান, শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা এবং সুস্থভাবে খাওয়া বয়স বৃদ্ধির বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর উপায়। জীবনযাত্রার পরিবর্তন যেমন ক্যালোরি রেস্ট্রিকশন বয়স বৃদ্ধিকে বাধা তৈরি করে আয়ু বাড়ায়। ভিটামিন এবং মিনারেলস সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে (মাল্টিভিটামিন, ভিটামিন সি, ক্যালসিয়াম ইত্যাদি) শরীরে পুষ্টির ঘাটতি পূরণ হয়। যদি বয়সকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দেখেন তাহলে জীবনকাল প্রায় ৭ বছর বেড়ে যেতে পারে। ভবিষ্যতের দিকে তাকান এবং ব্যক্তি জীবনে পরিবর্তন আনুন। অপরাধবোধে ভুগবেন না। যা আপনাকে বয়স্ক করে তুলবে দ্রুত। পরিবর্তন আসলে তা গ্রহণ করার মানসিকতা রাখুন। চাইলেই স্বেচ্ছায় আনতে পারেন পরিবর্তন। গবেষণা দেখা গেছে, অবসরগ্রহণ শারীরিক এবং মানসিক অবক্ষয়ের কারণ হতে পারে। আগেভাগে অবসর নেওয়া থেকে বিরত থাকতে পারেন। অথবা অবসরের পরও কোনো না কোনোভাবে কিছু কিছু কাজের মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে পারেন।
ক্যালোরি রেস্ট্রিকশন
ক্যালোরি রেস্ট্রিকশন হলো একটি ডায়েট পদ্ধতি, যেখানে প্রতিদিনের খাবারের মাধ্যমে গ্রহণ করা ক্যালোরির পরিমাণ কমিয়ে আনা যায়। এটি এমনভাবে করা হয়, যাতে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি বজায় থাকে। এর মূল লক্ষ্য হলো ক্যালোরির অতিরিক্ত গ্রহণ এড়িয়ে শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ করা এবং দীর্ঘমেয়াদি সুস্থ জীবনযাপন করা।
গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যালোরি রেস্ট্রিকশন (বিশেষ করে প্রাণীদের ক্ষেত্রে) দীর্ঘজীবন লাভে সহায়তা করে। এটি ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ এবং ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়। নিয়মিত কম ক্যালোরি গ্রহণ শরীরের বিপাক প্রক্রিয়া উন্নত করে। ক্যালোরি নিয়ন্ত্রণ মস্তিষ্কের কার্যকারিতা এবং স্মরণক্ষমতা উন্নত করতে সাহায্য করে। তবে সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, বৃদ্ধ ব্যক্তি বা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। খুব বেশি ক্যালোরি কমিয়ে দেওয়া পুষ্টির ঘাটতি সৃষ্টি এবং এতে স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটার আশঙ্কা থাকে।
ক্যালোরি রেস্ট্রিকশনের প্রভাব পুরোপুরি বুঝতে আরও গবেষণা প্রয়োজন, তবে মানুষের বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে পেশির কার্যক্ষমতা ঠিক করতে সহায়তা লাগতে পারে। স্বাস্থ্য এবং দীর্ঘ জীবনের উন্নতিতে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে তাহলো ডায়েট বা খাদ্যাভ্যাস।
খাদ্যাভ্যাস
খাদ্যাভ্যাসের এবং ব্যায়ামের মাঝেই অমরত্বের রহস্য লুকিয়ে আছে অনেক গবেষকই মনে করেন। কিছু খাবার শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্টে পরিপূর্ণ, যা ত্বক এবং শরীরকে বিষমুক্ত করতে পারে। প্রয়োজনীয় পুষ্টি সমৃদ্ধ ডায়েট ত্বককে সুন্দর এবং সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। পিডমন্ট আটলান্টা হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল ডায়েটিশিয়ান হেলি রবার্টসনের মতে, কিছু খাবার মানুষের বয়স বৃদ্ধির ফলে যেসব উপসর্গ দেখা দেয় তা আটকে রাখতে সাহায্য করে।
টমেটো : টমেটোতে ভিটামিন সি থাকে, যা কোলোজেন তৈরিতে সাহায্য এবং ত্বকের বলিরেখা আটকায়। এর লাইকোপেন সূর্যের উইভি রশ্মি আটকিয়ে ত্বক ভালো রাখে।
মাছ : স্বাস্থ্যকর চর্বি-সমৃদ্ধ খাবার ত্বককে আর্দ্র করতে সহায়ক। সালমোন এবং টুনা মতো ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ মাছ উল্লেখযোগ্য। মাছের ওমেগা-৩ শরীরের কোলেস্টেরল এবং প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। যা রক্তনালির ক্ষতি রোধ করতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত রক্তনালির ফলে হৃদরোগ এবং স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
মধু : মধু অ্যান্টি-অক্সিডেন্টে পরিপূর্ণ খাদ্য। যা বয়স বৃদ্ধির প্রক্রিয়া ধীর করে। এটি চিনি হিসেবে গণ্য হয়, তবে শরীরে প্রো-এজিং সৃষ্টি করে এমন প্রদাহ সৃষ্টি করে না। সাধারণ চিনি যেটা করে।
গ্রিন টি : গ্রিন টি অ্যান্টি-অক্সিডেন্টে ভরপুর। যা কোষগুলোকে সঠিকভাবে বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে।
ব্লুবেরি এবং রাসবেরি : ব্লুবেরি এবং রাসবেরি অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, ভিটামিন, প্রোবায়োটিকস, ফ্ল্যাভোনয়েডস এবং পলিফেনলস দিয়ে পূর্ণ। বেরি মুক্ত রেডিক্যাল কোষদের মোকাবিলা করতে এবং নতুন ত্বক তৈরি করতে সাহায্য করে। বেরিতে থাকা উপাদান প্রদাহ এবং অক্সিডেটিভ ক্ষতি কমাতে সাহায্য করে। যা বয়স-সম্পর্কিত স্মৃতি বিভ্রাট এবং শরীরের মোটর ফাংশনে বাধার দূর করতে ভূমিকা রাখে।
দই : ভালো প্রোবায়োটিক হলো দই। যা পরিপাক প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে এবং অন্ত্রের ভালো ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। দই ক্যালসিয়ামের একটি ভালো উৎস, যা অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার : বয়স বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে, ত্বক কোলোজেন এবং ইলাস্টিন দুর্বল হওয়ার কারণে কুঁচকাতে শুরু করে। ‘আমিনো অ্যাসিডগুলো ত্বক পুনর্নির্মাণ করতে সাহায্য করে। মাংস, মাছ, ডিম, এবং বাদাম মতো প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবারের ডায়েট রাখা দরকার।
অলিভ অয়েল : মনোস্যাচুরেটেড চর্বিসমৃদ্ধ খাবার যেমন অলিভ অয়েল, হৃদরোগ এবং ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে, যা জীবনকাল বাড়াতে সহায়ক।