ঢাকাকে কোন চোখে দেখবে ওয়াশিংটন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বরাবরের মতো এবারও মার্কিন নতুন প্রেসিডেন্টকে নিয়ে দুনিয়াব্যাপী জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়ে গেছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নেই। আলোচনা নতুন প্রেসিডেন্টের সময়ে ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্ক কোন দিকে যাবে। এখানে আলোচনা হচ্ছে, নতুন প্রেসিডেন্টের সময় যুক্তরাষ্ট্র কি ঢাকাকে নিজের চোখে দেখবে, না কি দিল্লির চোখে দেখবে?

কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও দুই দেশের কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, গত চার বছর বাইডেন প্রশাসনের সময় বাংলাদেশ ইস্যুতে ওয়াশিংটন সরাসরি যোগাযোগ রক্ষা করেছে। নির্বাচন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, শ্রম অধিকারসহ তাদের সম্পৃক্ত বিষয়গুলোয় যুক্তরাষ্ট্র তাদের মতামত ও পরামর্শ দিয়েছে সরকারকে। এসব বিষয়ে তারা চার বছর ধরেই কাজ করছে। বিশেষ করে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য বিগত সরকারের প্রতি কিছুটা চাপও প্রয়োগ করেছে পশ্চিমা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নকে নিয়ে। গত বছরের ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের পর থেকে হাসিনা সরকারের সঙ্গে কাজ করার কথা বললেও নির্বাচন, মানবাধিকার ও শ্রম অধিকার নিয়ে কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছে। তবে এসব ইস্যুতে বাইডেন সরকারের সঙ্গে শেখ হাসিনার সম্পর্ক তথা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকে।

কিন্তু গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতন ও ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র এ সরকারের সঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেয়। সরকারকে নানা বিষয়ে পরামর্শও দিয়ে আসছে। ইউনূস-বাইডেন সম্পর্কের উষ্ণতা প্রকাশ পায় গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সম্মেলনে। আবার বাইডেন সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কও ছিল চার বছর ধরে শীতল।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিগত সময়গুলোয় বাংলাদেশ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর নির্ভর করত। এই অঞ্চলে অন্যতম মিত্র হিসেবে দিল্লির চোখেই তারা ঢাকাকে দেখেছে। কিন্তু বাইডেনের নতুন নীতিতে ধাক্কা খায় ভারত। হাসিনা ইস্যুতেও নরেন্দ্র মোদি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ইন্দো-প্যাসিফিক ইস্যুসহ বেশ কিছু বিষয়ে দিল্লির পক্ষ থেকে ওয়াশিংটনকে জানানো হয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তাতে তেমন একটা সায় দেয়নি। কিন্তু ট্রাম্প জয়ী হওয়ার পর মনে করা হচ্ছে, ওয়াশিংটনের এই নীতিতে কিছুটা পরিবর্তন আসবে। কারণ এর মধ্যে দায়িত্ব নেওয়ার আগেই গত দুই মাসে দিল্লি সফরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ নিয়ে কথা বলেছেন। আবার ট্রাম্প তার নির্বাচনের আগেই বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে কথা বলেছেন। তা ছাড়া মোদি-ট্রাম্প একে অন্যের বন্ধু এ বিষয়টিও স্পষ্ট।

ট্রাম্পের বক্তব্য ও বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট : নির্বাচনের আগে ট্রাম্প তার এক্স বার্তায় লিখেছেন, ‘আমি বাংলাদেশে হিন্দু, খ্রিস্টান ও অন্য সংখ্যালঘুদের ওপর বর্বরোচিত সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। দেশটিতে দলবদ্ধভাবে তাদের ওপর হামলা ও লুটপাট চালানো হচ্ছে। বাংলাদেশ এখন পুরোপুরিভাবে একটি নৈরাজ্যকর অবস্থার মধ্যে রয়েছে।’

ট্রাম্পের সময়ে বাংলাদেশ নীতির পরিবর্তন প্রসঙ্গে একজন কূটনীতিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতিতে খুব পরিবর্তন হয় না। যেহেতু ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার নির্বাচন নয়, সে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র চাইবে কোনো নির্বাচিত সরকার। ইতিমধ্যে দিল্লিতে নিযুক্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে তারা ভারতের সঙ্গে কথা বলেছেন।

গত সপ্তাহে দিল্লিভিত্তিক অনলাইন ডব্লিউআইওএনকে ভারতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত এরিক গারসেটি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত যত দ্রুত সম্ভব, বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক নির্বাচন দেখতে চায়, যা বাংলাদেশের জন্য নতুন অধ্যায় শুরু করতে সহায়ক হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, পররাষ্ট্রনীতিতে খুব বড় পরিবর্তন হওয়ার সুযোগ নেই। তবে নতুন মার্কিন প্রশাসন বাংলাদেশে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফেরায় জোর দেবে। নির্বাচন নিয়ে কথা বলবে। ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশকে দেখবে তাদের এশিয়া নীতির আলোকে। তিনি মনে করেন, মানবাধিকার পরিস্থিতি, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় নজর রাখত তারা। তিনি বলেন, দিল্লি তো চাইবেই প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিষয়ে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে।

চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্ক সরকারকেন্দ্রিক হবে না। যা আছে, সে রকম থাকবে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে গতি কমে যেতে পারে। নতুন রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কে যে গতির সঞ্চার হয়েছে, সেটা কিছুটা স্তিমিত হতে পারে।

অন্তর্বর্তী সরকারকে সমর্থনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করল যুক্তরাষ্ট্র : বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের নতুন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন উন্নয়ন ও সন্ত্রাসবাদ দমনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি তার দেশের সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। গতকাল রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে তিনি এই কথা ব্যক্ত করেন। জ্যাকবসন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসকে বলেন, ‘জাতি হিসেবে আমরা বিভিন্ন ইস্যুতে আপনার সরকারকে সমর্থন দিতে প্রস্তুত।’

এ সময় প্রধান উপদেষ্টা বাংলাদেশে চলমান সংস্কার উদ্যোগ, জুলাইয়ের ঘোষণাপত্র সম্পর্কে রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে তুলতে সরকারের প্রচেষ্টা এবং আগামী সাধারণ নির্বাচনের পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন। জুলাইয়ের ঘোষণাপত্রের বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘তিনি আশা করছেন, ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে রাজনৈতিক দলগুলো একটি ঐকমত্যে পৌঁছাবে।’ অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমি ঘোষণাপত্র নিয়ে কোনো ভিন্নমতের কথা শুনিনি।’

তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো সংস্কার প্রস্তাবগুলোয় একবার সম্মত হলে সরকার জুলাই-সনদ তৈরির জন্য তাদের স্বাক্ষর করার জন্য অনুরোধ করবে।’

মার্কিন কূটনীতিককে তিনি বলেন, ‘আমরা জানি না ওই কনটেন্টে অনেক আইটেম থাকবে, নাকি অল্পকিছু আইটেম থাকবে। আমাদের যে ভিন্ন মতামত রয়েছে, তাতে এটি একটি কঠিন কাজ। তবে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে আমাদের রাজনীতি হবে জুলাই-সনদের ভিত্তিতে।’

মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স কয়েকজন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে কিছু সহিংসতার খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

এ সময় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দেশের সবার জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে তার সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা ও ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক, রোহিঙ্গাসংকট সমাধানের অগ্রগতি এবং মিয়ানমারের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা করেন।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘বাংলাদেশ সব প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ককে মূল্য দেয়।’ সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করে দেশগুলোকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো একটি প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরে তার সাম্প্রতিক পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সার্কের ধারণা এভাবেই এসেছে এবং আমরাই এর সূচনাকারী।’ তিনি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানবিক সহায়তা প্রদানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ধন্যবাদ জানান এবং বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন এবং মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য একটি নিরাপদ অঞ্চল তৈরির জন্য সমর্থন কামনা করেন।

বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ তুলার আমদানিকারক উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রকে আরও পোশাক ও বস্ত্র আমদানির আহ্বান জানান। এ সময় এসডিজিবিষয়ক সিনিয়র সচিব লামিয়া মোরশেদ উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে গত ১১ জানুয়ারি ঢাকায় দায়িত্ব নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্বর্তী চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন গত রোববার প্রথম পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন ও পররাষ্ট্র সচিব মো. জসীম উদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রচেষ্টার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে মার্কিন সহযোগিতা অব্যাহত থাকার কথা জাননান।

ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ড. ইউনূসের শুভেচ্ছা : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন মেয়াদের শুরুতে তাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বার্তায় জানায়, ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় প্রধান উপদেষ্টা তাকে শুভেচ্ছা বার্তা পাঠিয়েছিলেন।

সেই বার্তায় প্রধান উপদেষ্টা দৃঢ় বিশ্বাস ব্যক্ত করেছিলেন, ‘দুদেশের মধ্যে সহযোগিতার নতুন নতুন ক্ষেত্র উন্মোচনের জন্য দুদেশ কাজ করবে। আমরা সেই বিশ্বাস পুনর্ব্যক্ত করছি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন মেয়াদ শুরুতে তাকে শুভ কামনা জানাই।’