নানা সমালোচনায় সরলেন সারজিস

শহীদের তালিকায় নাম ওঠাতে হয়রানির শিকার, শহীদ পরিবারের সদস্যদের ক্ষতিপূরণ না পাওয়া এবং আহতদের যথার্থ চিকিৎসা সহায়তা না পাওয়া, অভ্যুত্থানের পাঁচ মাস পরও আহতরা আর্থিক সংকটে চিকিৎসা না পাওয়া, সহায়তা পেতে দীর্ঘসূত্রতা, যোগাযোগের সময় অশোভন, অবজ্ঞাপূর্ণ আচরণসহ বেশ কিছু অভিযোগে কয়েকদিন ধরে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন নিয়ে ওঠে সমালোচনার ঝড়।

খোদ সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক সারজিস আলমের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেন অনেকে। শুধু তাই নয়, জুলাই ফাউন্ডেশনকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর দাবি আসতে শুরু করে। অনেকেই আবার ফাউন্ডেশনের দায়িত্ব থেকে সারজিসকে অব্যাহতি দেওয়ার জোর দাবি তোলেন। এসব সমালোচনার মধ্যে গতকাল বুধবার জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব থেকে নিজেই সরে দাঁড়িয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক এবং জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম।

গতকাল সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে তিনি এ তথ্য জানান। সেখানে সারজিস বলেছেন, তার পদত্যাগের পর ‘সাধারণ সম্পাদক’ নামে কোনো পদ আর ফাউন্ডেশনে নেই। কেন ফাউন্ডেশন ছেড়ে দিয়েছেন সেই ব্যাখ্যায় সারজিস কাজের ক্ষেত্রে তার সময়ের স্বল্পতাকে কারণ হিসেবে তুলে ধরেছেন।

গত জুলাই-আগস্টের কোটা ও সরকার পতনের গণ-আন্দোলনে হতাহতদের পরিবারকে সহায়তায় কাজ করে যাচ্ছে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন। আন্দোলনে নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে সংগঠনটি কাজ করছে। সারজিস জানিয়েছেন, গত বছরের ২১ অক্টোবর থেকে ‘জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের’ সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়ে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কাজ করেছেন তিনি। এই দুই মাস ১০ দিনের দায়িত্ব পালনকালে ফাউন্ডেশন থেকে কোনো বেতন বা সম্মানী তিনি নেননি বলেও জানান।

এদিকে সারজিসের পদ ছাড়ার পর আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। তার দায়িত্ব ছাড়াকে অনেকে ‘ব্যর্থতা’ হিসেবে দেখছেন। তারা বলছেন, সমালোচনায় পদ না ছেড়ে আরও বেশি দায়িত্ব নিয়ে আহত এবং শহীদ পরিবারদের পাশে দাঁড়াতে পারতেন। তবে অনেকে বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে নিয়েছেন। এ ছাড়া আহত ব্যক্তি এবং শহীদ পরিবারের সহায়তা লাভে বিলম্ব ও দীর্ঘসূত্রতায় উদ্বেগ জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক কমিটি।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, নাগরিক কমিটি এবং ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা যায়, নাগরিক কমিটি, নতুন রাজনৈতিক দল গঠনসহ বেশ কিছু কাজে জড়িত থাকায় জুলাই ফাউন্ডেশনে সময়ে দিতে পারছিলেন না সারজিস। গুরুত্বপূর্ণ এই দায়িত্ব পালনে ‘অবহেলায়’ অনেকেই পদ ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন সারজিসকে। জুলাই ফাউন্ডেশনের কাজের অগ্রগতি না থাকায় সংগঠনের ভেতরেও সমালোচনা তৈরি হয়। অনেক আহত ও তাদের পরিচিতজনরা চিকিৎসা এবং আর্থিক সহায়তা না পাওয়ার কথা জানান। সমালোচনায় বিদ্ধ হওয়ায় এবং সময় দিতে না পারায় সারজিস পদ ছাড়েন বলে অনেকেই মনে করছেন।

জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ১৫ দিন ধরে ফাউন্ডেশনের অফিসে সারজিসকে দেখা যায়নি। সমালোচনা এবং সময় দিতে না পেরে তিনি অনেকটা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। যতটুকু জানি, তখন থেকেই তিনি ছাড়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। পরে গঠনতন্ত্র তৈরি করে সাধারণ সম্পাদক পদও বাদ দেন। তারপর তিনি পদত্যাগ করেন। মূলত সময় দিতে না পারায় এবং সমালোচনা তৈরি হওয়ায় তিনি সরে দাঁড়িয়েছেন।

এর আগে জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম ও সারজিসের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক রিফাত রশীদ। নিজের ফেসবুক ওয়ালে সারজিসকে উদ্দেশ করে তিনি লেখেন, ‘জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনকে এক সপ্তাহের মাঝে ফাংশনাল করুন। অন্যথায় আপনাদের বিরুদ্ধে আমরা সর্বস্তরের জনগণ কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলব। জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনের জন্য ফুলটাইম কাজ করবে এমন বড় একটা এক্সপার্ট টিম অবিলম্বে নিয়োগ দিতে হবে। প্রতি শুক্রবার একটা জেলা সফরের ফালতু ট্রেন্ড বাদ দিতে হবে।’

সারজিসের পদ ছাড়ার পর রিফাত রশিদ ‘নজির সৃষ্টি করেছেন’ উল্লেখ করে বলেন, সারজিস আলম দায় নিতে জানেন, তাই পদ ছেড়েছেন। বাংলাদেশের কেউ কোনোদিন দায় নিয়ে নিজের বড় পদবি ছেড়ে দেয় নাই। সারজিস আলম তো নজিরও সৃষ্টি করেছেন বটে।

রাফিদ হাসান সাফওয়ান নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘মাত্র কয়েক মাসের মাথায় ব্যর্থতার দায় মাথায় নিয়ে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে পদত্যাগ করেছেন উদীয়মান নেতা সারজিস।’

ঢাবির আরেক শিক্ষার্থী আবদুল করিম পদ ছাড়ার কারণ ভিন্ন কিছু উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ফাউন্ডেশনের সব জনবল নিয়োগের পর সারজিসকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। সমস্যা সেখানকার কর্মচারীদের, সারজিসের না। সেখানে পরিবারতন্ত্র কায়েম করা হয়েছে।

সারজিস আলম ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে আমি নেই। এই ফাউন্ডেশনের গতি ত্বরান্বিত করার জন্য ফাউন্ডেশনের গঠনতন্ত্র, কাঠামো ও কাজের প্রক্রিয়াতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন থেকে ‘এক্সিকিউটিভ কমিটি’ পুরো অফিসের সার্বিক বিষয় পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে। চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার (সিইও) সেখানে অফিসের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ বর্তমানে সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ‘গভর্নিং বডি’ ফাউন্ডেশনের পলিসি মেকিংয়ে কাজ করবে। যেখানে প্রধান উপদেষ্টাসহ চারজন উপদেষ্টা রয়েছেন (স্বাস্থ্য, সমাজকল্যাণ, স্থানীয় সরকার, আইসিটি)।’

তিনি আরও লিখেছেন, এই ফাউন্ডেশন প্রথম আর্থিক সহযোগিতা শুরু করে ১ অক্টোবর, অফিস চালু হয় ১৫ অক্টোবর থেকে। আমি সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছি ২১ অক্টোবর। ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় দুই মাস ১০ দিন আমি দায়িত্ব পালন করি। এরপর আমি দায়িত্ব থেকে সরে আসি। ফাইনালি আমার সাইনিং অথরিটি ৭ জানুয়ারি হস্তান্তর হয় এবং অফিশিয়ালি আমার দায়িত্ব শেষ করি। ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ভ্যারিফাইড ৮২৬ জন শহীদ পরিবারের মধ্যে ৬২৮ জনকে আর্থিক সহযোগিতা করা হয়। পাশাপাশি প্রায় ১১ হাজার ভ্যারিফাইড আহতের মধ্যে প্রায় ২ হাজার আহতকে আর্থিক সহযোগিতা করা হয়। যতদিন পর্যন্ত আমি আমার সর্বোচ্চ সময় ফাউন্ডেশনে দিতে পেরেছি ততদিন আমি দায়িত্ব পালন করেছি। যখন মনে হয়েছে, এখন থেকে ফাউন্ডেশনে প্রয়োজনীয় সময় দেওয়া আমার জন্য সম্ভব হবে না তখন আমি দায়িত্ব থেকে সরে এসেছি । আমার কাছে নিজের সীমাবদ্ধতা অ্যাড্রেস করা এবং সে অনুযায়ী দায়িত্ব গ্রহণ বা ত্যাগ করা কোনো দুর্বলতা নয় বরং এটাতে সৎ সাহস লাগে । আমি চেষ্টা করেছি আমার চেয়ারের দায়িত্বের সঙ্গে সৎ থাকতে।

এদিকে অভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তি এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের সহায়তা পাওয়ার প্রক্রিয়ায় বিলম্ব ও দীর্ঘসূত্রতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতীয় নাগরিক কমিটি। গতকাল বুধবার জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ বরাবর পাঠানো এক চিঠির মাধ্যমে এ উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় নাগরিক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ও দপ্তর সেল সম্পাদক মনিরা শারমিন স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, আমরা জুলাই অভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তি এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের পক্ষ থেকে কিছু জরুরি উদ্বেগ আপনার কাছে পৌঁছে দিতে এই চিঠিটি লিখছি। এই উদ্বেগগুলোর মধ্যে রয়েছে ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা লাভে বিলম্ব ও দীর্ঘসূত্রতা, সাহায্য লাভের জন্য যে আবেদন করা হয়, তার ফলাফল সম্পর্কে স্পষ্টতার অভাব, ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তাদের মধ্যে সহানুভূতি এবং পেশাদারিত্বপূর্ণ মনোভাবের অভাব, এবং চিকিৎসাসেবা সম্পর্কিত অসন্তুষ্টি।

এতে আরও বলা হয়, আমরা বেশ কিছু আহত ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে জানতে পেরেছি, তারা আবেদনপত্র জমা দিয়েছেন এবং ফাউন্ডেশন থেকে টোকেন নম্বর পেয়েছেন। কিন্তু মাসের পর মাস অপেক্ষা করে এখনো কোনো আর্থিক সহায়তা পাননি। কিছু ক্ষেত্রে, কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা ছাড়াই আবেদনকারীদের জানানো হয়েছে, তাদের আবেদন কার্যকর করা যাচ্ছে না এবং আবার আবেদন করতে হবে। এই বিলম্ব আহত ও শহীদ পরিবারের জন্য হয়রানি এবং অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করছে। আমরা এই বিলম্বের কারণ এবং এই সমস্যাটি দ্রুত সমাধান করার জন্য কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন তা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাই। অভ্যুত্থানে আহত এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ফাউন্ডেশনের আচরণ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।