বিয়েশাদিতে বরকত নষ্টের কারণ

বিয়েশাদি মানবজীবনের পবিত্র বন্ধন। এর মাধ্যমে জীবন হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। জীবনের এ অধ্যায় দুনিয়া ও আখেরাতে কল্যাণ বয়ে আনে, যদি তা রাসুল (সা.)-এর অনুসৃত তরিকা অনুযায়ী হয়। তাতে দ্বীনের সীমা লঙ্ঘন না হয়। ইসলামে বিয়ের জন্য সুনির্দিষ্ট নিয়মকানুন ও বিধিমালা রয়েছে। এই বিধানকে উপেক্ষা করে নিজেদের খেয়াল খুশি মতো বিয়ের কার্যাদি সমাধা করার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই, বরং রয়েছে সব ধরনের অকল্যাণ ও অশান্তি।

বিয়ে নবীজির সুন্নত। সুতরাং এটা সুন্নত তরিকায় সম্পাদন করাই সমীচীন। কিন্তু আধুনিক সমাজে মুসলিম পরিবারের বিয়েশাদিতে কুসংস্কার ঢুকে গেছে। আধুনিকতার নামে চলছে অপচয়, অশ্লীলতা, বেহায়াপনা ও অবাধ্যতা। চলছে অকল্যাণ ও সুন্নতবহির্ভূত গর্হিত কাজ, যা বিয়ে-শাদির বরকত নষ্ট করে দেয়। বাগদান থেকে শুরু করে বিয়ের কিছু দিন পর পর্যন্ত যত রসম-রেওয়াজ হয় সবই রাসুল (সা.)-এর অনুসৃত তরিকার পরিপন্থী।

আমাদের সমাজ রাসুল (সা.)-এর কর্মনীতি থেকে দূরে সরে গেছে। প্রচলিত বিয়ে-শাদির আনুষ্ঠানিকতা রাসুল (সা.)-এর আনুগত্যমূলক নয়, যা আছে তা একমাত্র ইজাব-কবুলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ বলা যায়। রাসুল (সা.)-এর স্ত্রী খাদিজা (রা.)-এর ইন্তেকালের পর আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই বিয়ে সম্পন্ন হয়েছিল।

রাসুল (সা.)-এর কলিজার টুকরা মেয়ে ফাতেমা (রা.)-এর বিয়ের সময় মাত্র এক প্লেট খেজুর উপস্থিত জনতার মধ্যে বণ্টন করেন আড়ম্বরপূর্ণ কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছিল। বরের সঙ্গে আগত মেহমানদের আয়োজনে শত শত মানুষকে খাওয়ানোর জন্য আয়োজন করেননি। যদি আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে কোনো বরকত নিহিত থাকত, তাহলে রাসুল (সা.) কখনোই তা পরিত্যাগ করতেন না; বরং আড়ম্বরপূর্ণ ভোজন অনুষ্ঠান করতেন। তিনি এসব করেননি, যা থেকে পরিষ্কার হয় যে, এমন অনুষ্ঠানের জন্য অপচয় করা, ধার-কর্জ করে অথবা হাত পেতে অর্থ সংগ্রহ করে ব্যয় করা নিতান্ত অনর্থক এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিপন্থী।

সমাজে মানহানির ভয়ে অনেকে বছরের পর বছর পার হলেও বিয়ে করার সাহস করতে পারছে না। কারণ খরচ করার টাকা নেই। অনেককেই বিবাহ করতে হচ্ছে ধার করে। টিভি, ফ্রিজ, মোটরসাইকেল, ফার্নিচার, যৌতুক ইত্যাদি দেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় এবং বরের সঙ্গে আগত শত শত অতিথির মেহমানদারির ভোজন অনুষ্ঠান করতে অক্ষমতার কারণে অনেক বাবা বিয়ে দিতে পারছেন না তার উপযুক্ত মেয়েকে। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠান করতে পারছেন না, তাই লোকসমাজে মানহানি ও সমালোচনার ভয়ে উপযুক্ত ছেলের বিয়ে সম্পন্ন করতে পারছেন না অনেক অভিভাবক। আমাদের সমাজের একটা অংশের চিত্র এমন।

যৌতুক একটি অভিশাপ। নারীর প্রতি অনেক বড় জুলুম। যৌতুক দিতে না পারার কারণে বহু নারীর বিয়ে হয় না। বিয়ে হলেও এই যৌতুকের কারণেই অনেকের সংসার সুখের হয় না। লোভী ও সংকীর্ণ মানসিকতা সম্পন্ন স্বামীর ঘরে অপমান ও নির্যাতন সহ্য করতে হয় বহু নারীকে। অনেক নারীকে নরপিশাচ স্বামীর হাতে দিতে হয় জীবনও। ইসলাম নারীর আর্থিক সামর্থ্য দানের লক্ষ্যে এবং তাকে সম্মান জানানোর জন্য মহর নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু উল্টো দেখা যায়, মহরের স্থলে যৌতুকের অবৈধ আবদারের অর্থ ও সম্পদ দিতে হয় কন্যা পক্ষকে। ইসলাম এ অন্যায়কে অনুমোদন করে না।

অনেক বিয়ের ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিয়েবাড়িতে অত্যধিক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বিশাল খাবার-দাবারের ব্যবস্থা করা হয়। অনেক অপচয়ও করা হয়। এটা সম্পূর্ণ অনর্থক। খুব বেশি খরচও নয়, আবার একেবারে কৃপণতাও নয়, এমন আয়োজন কাম্য। কোরআনে আল্লাহতায়ালা অপচয় করতে নিষেধ করেছেন এবং আপচয়কারীদের শয়তানের সঙ্গে তুলনা করেছেন। অপচয় না করার জন্য নির্দেশ দিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, ‘কোনোভাবেই অপচয় করো না। নিশ্চয় অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার রবের প্রতি খুবই অকৃতজ্ঞ।’ (সুরা বনি ইসরাইল ২৬-২৭) মহান আল্লাহ আমাদের দেশে বিয়ে-শাদিকে সহজ করুন এবং সবকিছুতে মধ্যপন্থায় খরচ করার তওফিক দান করুন। আমিন।