বন কেটে বাড়ি বানানোর মচ্ছব

গাজীপুরের শ্রীপুর রেঞ্জের কাওরাইদ ফরেস্ট বিটের দায়িত্বে থাকা বনপ্রহরী বনি শাহাদাতের বিরুদ্ধে সংরক্ষিত বনের গাছ অবৈধভাবে কেটে বিক্রি ও বাড়িঘর তৈরিতে সহায়তাসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তার সঙ্গে আছেন স্থানীয় বিএনপির এক নেতা। বনের জমির পাশাপাশি তারা জোত জমি থেকেও পারমিট ছাড়াই প্রকাশ্যে গাছ কেটে বিক্রি করছেন। তাদের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম তুলে ধরে সম্প্রতি ঊর্ধ্বতন বন কর্মকর্তাদের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী।

অভিযোগ সূত্রে এবং খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কাওরাইদের ধামলই মৌজার সিএস ৩৯৪ দাগটি সরকারের গেজেটভুক্ত বনভূমি। এই বন থেকে গত দুই মাসে ৫০০ গজারিগাছ কেটে চোরাই পথে পাচার করেছেন কাওরাইদ ইউনিয়ন বিএনপি সাধারণ সম্পাদক মো. শামসুল হক। একইভাবে একই মৌজার সংরক্ষিত বনের গলদাপাড়া রাজাভিটা এলাকার ৪৭৫ দাগের ৪৫০টি, ২৪৪৪ দাগের ৬ শতাধিক এবং ২৩৩৭ দাগের ৬০০ গজারিগাছ কেটে পাচার করেছেন তিনি। বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত থাকায় বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি  এলাকায় প্রবেশ করতে পারেননি। তবে গত আগস্ট মাসের পর বেপরোয়া হয়ে ওঠেন তিনি। বনি শাহাদাতকে সঙ্গে রেখেই প্রতিরাতে সংরক্ষিত বন এবং ব্যক্তির জমিতে থাকা গজারিগাছ কাটছেন তিনি।

অভিযোগ আছে, শিমুলতলা গ্রামের শাহাব উদ্দিন বিএসসির জমি থেকে দেড়শ, কাশেমপুর বাজারের দক্ষিণে সুরুজের বাড়ির পাশে ও একই এলাকার ডুবাইল্লা ভিটা থেকে দেড় হাজার গাছ কেটে নেওয়া হয়েছে। এখন মোথা তুলে ফসলি জমি তৈরি করা হচ্ছে। কাশেমপুরের কলিমউদ্দিন মেম্বারের বাড়ির পাশের ২৪৪৪ দাগে পাঁচতলা বাড়ির কাজ করছেন আলম মাস্টার। ইতিমধ্যে দোতলার ছাদ ঢালাই শেষ হয়েছে। ২৪৪৪ দাগটি ব্যক্তি জোত হলেও পাশের জমি সংরক্ষিত বনভূমি। তাই সরকারিভাবে জমির সীমানা নির্ধারণ ছাড়া স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ নেই।

জানা গেছে, গত ৫ আগস্টের পর বনের জমিতে শতাধিক নতুন ঘরবাড়ি তৈরি হয়েছে। ২২১৫ দাগে রুবেলের নেতৃত্বে বোর্ড মিল ভিটায় ১৫টি, ২৫৭১ দাগে তোফাজ্জল হোসেনের নেতৃত্বে বিধাই এলাকায় ২০টি, লালমাটিয়ায় ৬৩২ দাগে উজ্জ্বলের নেতৃত্বে ২৫টি, বিধাই পশ্চিমপাড়ার ২৬০৯ দাগে আজাদুল নেতৃত্বে ৩৫টি ও কাশেমপুর বাজারের কাছে ২৪৪৪ দাগে রফিকুল ইসলাম রবির নেতৃত্বে ৩০টি ঘর তোলা হয়েছে। প্রতিটি বাড়ির জন্য বিট কর্মকর্তাকে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। পরে লোকদেখানো কয়েকটি বাড়ি ভাঙা হলেও কিছুদিন পর আবার তৈরি করা হয়েছে। বনের পাশেই শিমুলতলা বাজারে দিনরাত চলছে একটি অবৈধ করাতকল। বন আইনে সংরক্ষিত বন থেকে পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে করাতকল স্থাপনের নিয়ম নেই। সরেজমিনে এলাকায় গিয়ে সংরক্ষিত ও ব্যক্তি জমি থেকে গাছ কেটে নেওয়া, ঘরবাড়ি তৈরি এবং করাতকল চলার সত্যতা পাওয়া যায়।

শুধু বনের গাছ কাটার ক্ষেত্রেই না, ওই এলাকায় সামাজিক বনায়নের অনিয়মের অভিযোগ আছে বনপ্রহরী বনি শাহাদাতের বিরুদ্ধে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত অর্থবছরে কাওরাইদ বিটে সামাজিক বনায়নের আওতায় আট হেক্টর জমিতে উডলট বাগান লাগানোর জন্য বন বিভাগ অর্থ বরাদ্দ দেয়। কিন্তু বনি শাহাদাত কর্মকর্তাদের অনুমতি ছাড়াই ১৩ হেক্টর জমিতে বাগান তৈরি করেন। কাওরাইদের কয়েকশ একর বনভূমি স্থানীয় প্রভাবশালীদের দখলে রয়েছে। মামলার ভয় দেখিয়ে দখলদারদের জমি ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেও বনি শাহাদাত লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। যারা টাকা দেননি এমন কয়েকজনের দখল করা জমিতে অতিরিক্ত পাঁচ হেক্টর বাগান তৈরি করেন। পরে উপকারভোগীদের বরাদ্দ দিয়ে মোটা টাকা হাতিয়ে নেন। বাগান তৈরির জন্য টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার চারা ব্যবসায়ী মো. গণি মিয়ার কাছ থেকে আকাশমণিসহ বিভিন্ন প্রজাতির চারা কেনেন। কিন্তু নানা বাহানায় চারার দামের বকেয়া ৫৭ হাজার টাকা দেননি। দরিদ্র গণি মিয়া বিষয়টি রেঞ্জ কর্মকর্তা ও বিভাগীয় বন কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে জানান। কিন্তু এখনো টাকা বুঝে পাননি তিনি।

জানা গেছে, বনি শাহাদাত বন বিভাগের একজন বনপ্রহরী। তার পোস্টিং সিলেট বন বিভাগে। বিগত হাসিনা সরকারের প্রভাবশালী এমপি ধীরেন্দ্র নাথ শম্ভুর (বর্তমানে কারাবন্দি) তদবিরে তাকে কাওরাইদ বিটের দায়িত্ব দেওয়া হয়। যোগ দিয়েই জড়িয়ে পড়েন নানা অনিয়মে।

সামগ্রিক বিষয়ে কথা বলার জন্য বনি শাহাদাতের মোবাইলে কল দিলে তিনি এ বিষয়ে কোনো তথ্য বা জবাব না দিয়ে প্রতিবেদককে দেখা করতে বলেন।

গাছ পাচারের হোতা বিএনপি নেতা শামসুল হক বলেন, তিনি গজারি কাঠের ব্যবসায়ী। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যবসা বন্ধ ছিল। এখন অল্প ব্যবসার সুযোগ হয়েছে। ২০ লাখ টাকার গজারিগাছ কেনা রয়েছে। ছোট জোত কাটার পারমিটে অনেক ভোগান্তি ও খরচ। তাই অনুমোদন ছাড়াই নিজ প্রয়োজনে কেটে বাড়ির কাছে রেখেছেন। সম্প্রতি একটি বড় জোত কিনে পারমিটের জন্য বন বিভাগে আবেদন করেছেন। সরকারি জমির গাছ কাটার বিষয়ে জানতে চাইলে এ ব্যাপারে কিছু না লেখার অনুরোধ করেন তিনি।

সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) সামসুল আরেফিন বলেন, ‘গেজেটভুক্ত বনের ভেতর কোনো গাছ কাটা হলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বন বিনষ্টের যেকোনো তথ্য পেলে আমরা তা আমলে নিয়ে এর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে থাকি। ৫ আগস্টের পরে যেসব স্থানে অবৈধভাবে স্থাপনা হয়েছিল, তাদের বেশ কিছু স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। অবৈধ করাতকলের বিরুদ্ধেও আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে।’