পাঠ্যবইয়ে অঘটন

খ্রিস্টীয় বছরের প্রথম দিন, স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের আনন্দ উৎসব থাকে। কারণ সেদিন তারা নতুন বই হাতে পায়। বইয়ের ঘ্রাণে উৎফুল্ল হয় মন। কিন্তু এবার তা সম্ভব হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই দেড় দশকের সেই রীতিতে ভাটা পড়েছে। কারণ শিক্ষাক্রমে পরিবর্তন, সংশোধন-পরিমার্জন করতে হয়েছে পাঁচ শতাধিক বই। পাঠ্যবইয়ে সঠিক ইতিহাস সংযোজন, পরিমার্জন ও দ্বিতীয়বার টেন্ডার, ভারতে বই ছাপা বন্ধ করাসহ নানা কারণে বই ছাপার প্রক্রিয়া দেরিতে শুরু করতে বাধ্য হয়েছে সরকার। ফলে বিগত বছরগুলোর মতো বছরের প্রথম দিন সব বই শিক্ষার্থীদের হাতে দিতে পারেনি।  

সব বই স্কুলে না পৌঁছানোর ফলে, প্রাথমিক এবং মাধ্যমিকের কিছু পাঠ্যবইয়ের কালোবাজারে চাহিদা তৈরি হয়েছে। যদিও এনসিটিবির পাঠ্যপুস্তকের মান নিয়ন্ত্রণ, কাগজ ও আর্ট কার্ডের মজুদ, গাইড বই মুদ্রণ ও সরকারি বই বাজারে বিক্রির বিরুদ্ধে শুরু থেকেই মাঠে রয়েছে তদারকি দল এবং সরকারের বিভিন্ন সংস্থা। তারপরও দেশব্যাপী একটি চক্র বিনামূল্যের পাঠ্যবই কালোবাজারে বিক্রি করছে। দেশের বিভিন্ন জেলার বাজার ছেয়ে গেছে পাঠ্যবইয়ে। যদিও এটি নতুন নয়। কেউ কেউ বলছেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি ও এনসিটিবির সাবেক সচিব নাজমা আখতার ও আওয়ামী লীগপন্থি কয়েকটি প্রেস মালিকের সিন্ডিকেট এখনো সক্রিয়। এর সঙ্গে রয়েছে কিন্ডারগার্টেন মালিক, জেলা-উপজেলা মাধ্যমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারী সিন্ডিকেট। বছরের পর বছর ধরে তারা বইয়ের চাহিদা দেওয়ার সময় অতিরিক্ত চাহিদা দেয়। এরপর চড়ামূল্যে কালোবাজারে বিক্রি করে বিনামূল্যের পাঠ্যবই। 

এরইমধ্যে খোলাবাজার থেকে প্রায় ১৯ হাজার বই উদ্ধার করা হয়েছে। ঢাকার সূত্রাপুরে ১০ হাজার এবং শেরপুরে ৯ হাজার বিনামূল্যের বই উদ্ধার করা হয়েছে। বুধবার বিকেলে ঢাকার সূত্রাপুরের বাংলাবাজার ইস্পাহানি গলির বিভিন্ন গুদামে অভিযান চালিয়ে জব্দ করা হয় প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের বই। যার বাজারমূল্য প্রায় ৮ লাখ টাকা। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে দুজনকে। আবার চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লায় বেশ কয়েকটি বইয়ের দোকানে প্রথম থেকে দশম শ্রেণির বিনামূল্যের পাঠ্যবইগুলো বিক্রি হচ্ছে। প্রতি পাঠ্যপুস্তক ৫০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যদিও কালোবাজারে বই বিক্রি বন্ধ ও সংশ্লিষ্ট চক্রকে গ্রেপ্তার করতে সক্রিয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এভাবে দেশব্যাপী কোন কোন জেলায় এই রকম কালোবাজারি চলছে, তার সঠিক ইতিহাস নেই। এর প্রকৃত দায় কার? এ বিষয়ে শুক্রবার দেশ রূপান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। 

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) ও মুদ্রণকারীরা জানাচ্ছেন, বইগুলো মূলত দুই উপায়ে খোলাবাজারে যায়। প্রথমটি হচ্ছে- উপজেলা শিক্ষা অফিস, দ্বিতীয়টি প্রেস। এর আগে যতগুলো ঘটনার প্রমাণ মিলেছে, তার বেশিরভাগ ছিল উপজেলা শিক্ষা অফিসের।  মূলত শিক্ষা অফিসই বইয়ের চাহিদা পাঠায়। এরপর বই বিতরণ শেষ হলে অতিরিক্ত বইগুলো নাকি তারা খোলাবাজারের চক্রের কাছে বিক্রি করে। আবার কিছু ক্ষেত্রে ছোট ছোট প্রেসগুলো অতিরিক্ত বই ছাপিয়ে খোলাবাজারে বাড়তি দামে বিক্রি করে। এনসিটিবির চেয়ারম্যান বলেন, খোলাবাজারে বই বিক্রি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। যারা এসব কাজ করছে তাদের চিহ্নিত করতে কাজ করছে এনসিটিবি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এসব বই কীভাবে খোলাবাজারে যাচ্ছে তা তদন্ত করা হচ্ছে। এক শ্রেণির প্রিন্টার্স প্রতিষ্ঠান ও উপজেলা শিক্ষা অফিসার মিলে এই বইগুলো বাজারে বিক্রি করছে। শিক্ষার্থীদের হাতে ৩০ জানুয়ারির মধ্যেই নতুন বই তুলে দেওয়ার আশা প্রকাশ করেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এর মানে আর মাত্র ৬ দিন। এর মধ্যে কি আদৌ সম্ভব? যদি সম্ভব না হয়, তাহলে কী কারণে অঘটন হলো, তার ব্যাখ্যাও কর্তৃপক্ষ দেবেন। তবুও সমস্যার সমাধান হবে না। 

আসলে বই বিতরণ এবং পরিবহনের অনিয়মের কারণে বাজারে বিনামূল্যের বইপ্রাপ্তিতে কার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, তা বের করতে হবে। একইসঙ্গে কালোবাজারি পাঠ্যবইয়ে অঘটনে যারা জড়িত, তাদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে। এ ব্যাপারে দ্রুত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ জরুরি।