ধ্বংস মৃত্যু বাস্তুচ্যুতির পাশে ভালোবাসার গল্প

ভালোবাসা শুধু হৃদয়ের ব্যাপার নয়, বহুলাংশে আদর্শেরও। ফিকশনে সেসব রোমাঞ্চের খোরাক পাওয়া যায়। সম্ভবত বিশ্বের এমন কোনো ভাষা ও ভূখণ্ড নেই, যেখানে প্রেম-বিদ্রোহ-বিপ্লবের রোমাঞ্চে ভরা ফিকশনের জন্ম হয়নি। যেমন- সোভিয়েত বিপ্লবের ৮-৯ বছর আগে মার্কিন ঔপন্যাসিক জ্যাক লন্ডন ‘দ্য আয়রন হিল’ শিরোনামে একটি উপন্যাস লেখেন, যেখানে তিনি আমেরিকান অলিগার্কির বিরুদ্ধে একটি  শ্রমিক অভ্যুত্থান কল্পনা করেন। উপন্যাসের নায়ক আর্নেস্টা, নায়িকা অ্যাভিসকে উদ্দেশ্য করে বলছিলেন, ‘আমরা যদি আদর্শের জন্য লড়তে পারি, তবে ভালোবাসাও আমাদের পথ দেখাবে।’ ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে লড়াইকে উপজীব্য করে লেখা শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথের দাবি’ উপন্যাসে নায়ক সব্যসাচীকে উদ্দেশ্য করে নায়িকা চিত্রলেখা বলছেন, ‘তুমি দেশের জন্য লড়াই করছ, আর আমি তোমার জন্য। বিপ্লব যদি তোমার প্রেম হয়, তবে আমিও তার অংশ।’ আমরা ফিকশনের দুনিয়া থেকে ফিলিস্তিনের মাটিতে আসি। গাজা উপত্যকার ধ্বংসলীলা, মৃত্যু, স্বজন হারানোর শোকের পাশে আমরা একটি ভালোবাসার গল্পকে উদযাপন করতে পারি; যেখানে আদর্শ আর ;িবপ্লবী প্রতিশ্রুতির একটি ‘রিয়েলিটি’ ফিকশনকে হার মানিয়ে যাচ্ছে। ৬৫ বছরের মারওয়ান বারঘোতি আর ৬১ বছরের ফাদওয়া ইব্রাহিমের প্রেম-পরিণয় সে রকমই আইকনিক এবং সাহিত্যের সঠিক মর্যাদা পেলে তা ক্লাসিকও হতে পারে। এ দম্পতির গল্প ফিলিস্তিনের হাজার হাজার স্বাধীনতাকামী তরুণ-তরুণীর জন্য শুধু পাথেয় নয়; বরং দুনিয়ার যেখানে প্রাণ-প্রকৃতি, জলবায়ু, জমি-জঙ্গল, স্বজাত্য কিংবা অধিকারের জন্য লড়াই হচ্ছে সেখানে তরুণ-তরুণীদের জন্য তারা দৃঢ়প্রত্যয়ী অনুপ্রেরণা। হামাস ও ইসরায়েলি প্রশাসনের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্পাদনের আগ পর্যন্ত গাজায় ১৮ মাসে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত সময়ে সবচেয়ে বড় গণহত্যার নজির।  সে কারণে দশকের পর দশক ধরে চলা এসব লাঞ্ছনা-বঞ্চনার বিরুদ্ধে মারওয়ান ও ফাদওয়ার মতো তরুণ-তরুণীদের প্রতিরোধ অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়।

রামাল্লা শহরের পাশে কোবার গ্রামে ১৯৫৯ সালে জন্ম নেওয়া তরুণ মারওয়ান ছাত্রজীবনে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দল ‘ফাতাহ’-এর সঙ্গে যুক্ত হন। কাজ করেন দলটির ছাত্রসংগঠন এবং সশস্ত্র শাখায়। ফাতাহর অন্যতম জনপ্রিয় এ নেতা ২০০২ সাল থেকে ইসরায়েলে কারারুদ্ধ। সম্প্রতি তাকে নিয়ে আবারও আলোচনা শুরু হওয়ার কারণ হলো হামাসের হাতে জিম্মিদের মুক্তির বিনিময়ে ইসরায়েলের কারাগারে বন্দি থাকা ফিলিস্তিনিদের মুক্তির প্রশ্নটি সামনে আসা।  মারওয়ানের মুক্তির বিষয়টি তুলে ধরেছেন মধ্যস্থতাকারীরা। কিন্তু তা শেষ পর্যন্ত সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। মারওয়ান ছোট্টবেলা থেকে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের দখলদারি প্রত্যক্ষ করেছেন। ১৮ বছর বয়সে তরুণ মারওয়ান প্রথম কারাগারে যান, তখন কোবার গ্রামের কিশোরী ফাদওয়ার বয়স মাত্র ১৪। কারাগার থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত এক সহবন্দির মারফতে ফাদওয়াকে প্রেমের প্রস্তাব পাঠান মারওয়ান। বার্তাবাহকের মাধ্যমে ফাদওয়াকে তিনি বলেন, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি ফাদওয়া। আমার মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত আমার জন্য অপেক্ষা কোরো।’ প্রাণবন্ত তরুণী সত্যি সত্যি অপেক্ষা করেছিলেন। প্রতিশ্রুতি মতো কারাগার থেকে বেরিয়ে ভালোবাসার ফাদওয়াকে বিয়ে করেছিলেন মারওয়ান। বিয়ের পরমুহূর্তে স্ত্রীকে মারওয়ান বলেছিলেন, ‘অর্থ উপার্জন বা বাড়িঘর নির্মাণের স্বপ্ন আমার নেই। আমি ফিলিস্তিনিদের জন্য জীবনটা উৎসর্গ করতে চাই। তোমাকে কথা দিলাম, যেদিন ইসরায়েলি দখলদারির অবসান হবে, সেদিন আমরা সুন্দর ও স্বাভাবিক জীবন শুরু করব।’ তাদের স্বাভাবিক সুন্দর জীবন এখনো হয়নি।

মারওয়ান বিরজেইত ইউনিভার্সিটি থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাসে স্নাতক শেষ করে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর স্নাতকোত্তর করেন। ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল মারওয়ান ছাত্রাবস্থায় ছাত্রসংসদের নেতৃত্বে আসেন। ১৯৮৭ সালে প্রথম ইন্তিফাদায় তার প্রভাব ছিল চোখে পড়ার মতো। এ সময় তাকে জর্ডানে যেতে বাধ্য করে ইসরায়েল। ১৯৯৩ সালে অসলো চুক্তি সইয়ের পর মারওয়ান ফিরে আসেন ফিলিস্তিনে। এর দুই বছর পর ফিলিস্তিনি আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০০ সালে দ্বিতীয় ইন্তিফাদার সময় যে গণজাগরণে পাঁচ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারান, মারওয়ান ছিলেন নেতৃত্বের ভূমিকায়। বিশেষত, ফাতাহর সশস্ত্র শাখা ‘তানজিম’-এর নেতৃত্বভার তাকে তরুণ ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় করে তোলে। তার নেতৃত্বে ‘আল আকসা মার্টায়ার্স ব্রিগেড’ নামেও সশস্ত্র তৎপরতার ইতিহাস রয়েছে। নিয়মতান্ত্রিকতার বাইরে কার্যকর প্রতিরোধের তত্ত্ব তাকে আপসহীন হিসেবে পরিচিত করে তোলে। ফলে, ইসরায়েলি প্রশাসনের কাছে তিনি সবচেয়ে আকাক্সিক্ষত এক স্বাধীনতাকামী প্রতিরোধযোদ্ধায় পরিণত হন। মারওয়ানের প্রভাব ঠেকাতে ইসরায়েলি প্রশাসন শুরু থেকেই মরিয়া ছিল। বিচারপ্রক্রিয়ায় তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগটি ছিল, তিনি নাকি ইন্তিফাদার সময় চার ইসরায়েলি ও এক গ্রিক ধর্মযাজককে হত্যায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, তেলআবিবের একটি রেস্তোরাঁয় বেসামরিক হত্যায় ভূমিকা ছিল তার। প্রহসনপূর্ণ বিচারিক প্রক্রিয়ায় ২০০৪ সালে তাকে আজীবন কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। যখন তাকে আদালতে বিচারের মুখোমুখি করা হয়; তখন তিনি প্রথম কোনো ফিলিস্তিনি হিসেবে ইসরায়েলি আদালতের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনিই প্রথম কোনো ফিলিস্তিনি আইনপ্রণেতা, যাকে গ্রেপ্তার করেছিল ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী। উল্লেখ্য, বিশ্বের যে কোনো রাজনৈতিক বন্দির জন্য এত দীর্ঘ কারাবাস বিরলতম। সে কারণে তিনি এখন ‘ফিলিস্তিনের নেলসন ম্যান্ডেলা’। দেড় বছর আগে হামাসের অতর্কিত আক্রমণের পর তিনি কারাগারে নিপীড়নের মুখে পড়েছেন বলে খবর বেরিয়েছিল। তবে এত কিছুর পরও তিনি আপসহীন। গত ২২ বছরে কারাগার থেকে মারওয়ান বেশ কয়েকবার পিএ প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, তারা যেন ইসরায়েলের সঙ্গে অসহযোগিতার নীতি গ্রহণ করেন। বেশ কয়েকবার কারাগার থেকে তৃতীয় ইন্তিফাদার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। সে কারণে ফিলিস্তিনের উদার-ধর্মনিরপেক্ষ তরুণ-যুবারা এখনো তাকে কেন্দ্র করে স্বপ্ন দেখেন।

কারাগারে গিয়ে মারওয়ানের লড়াকু জীবনের ব্যত্যয় ঘটেনি। ২০১৭ সালে তিনি সহবন্দিদের নিয়ে টানা ৪০ দিন অনশন করেন এবং ইসরায়েলি প্রশাসন কারাগারের সুবিধা বৃদ্ধি করতে বাধ্য হয়। কারাগারে তার গুরুত্বপূর্ণ কাজটি ছিল ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার প্রশ্নে ক্রিয়াশীল নানা মত-পথের সংগঠনগুলোর কারাবন্দি নেতৃত্বকে এক ছাতার তলায় নিয়ে আসার প্রচেষ্টা। যদিও তা ততটা কার্যকর হয়নি। তবে উদ্যোগটি ছিল যুগান্তকারী। হামাস, ফিলিস্তিন ইসলামিক জিহাদ (পিআইজে) এবং বামপন্থি সংগঠনগুলোর মধ্যে দূরত্ব কমাতে তিনি নিজে উদ্যোগ নেন। সর্বোপরি, মারওয়ান ফাতাহর এমন এক নেতা, যার ন্যূনতম গ্রহণযোগ্যতা সব মতের সংগঠনের মধ্যেই দেখা যায়। মারওয়ান নিজে বেশ কয়েকবার নিজ ফাতাহর কর্মপদ্ধতির সঙ্গে নিজের ব্যবধানের কথা বলতে চেষ্টা করেছেন। কারাগারে যাওয়ার দু-তিন বছরের মাথায় তিনি ফাতাহ থেকে বেরিয়ে আলাদা রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলেন। অবশ্য পরে তিনি নিজেই তা বিলুপ্ত করে দেন। মারওয়ানকে নিয়ে ফিলিস্তিনি জনিপরিসরে এ কথা প্রচলিত যে, তার মুক্তির জন্য যতটা বাধা ইসরায়েল, তার চেয়ে বড় বাধা ফিলিস্তিনি কর্র্তৃপক্ষের (পিএ) প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস ও তার অনুগত নেতৃত্ব। এমনও শোনা যায়; সাম্প্রতিক গাজা যুদ্ধ বন্ধের চুক্তির আওতায় মারওয়ানকে মুক্তির আলাপ মধ্যস্থতাকারীরা যখনই তুলেছেন; তখনই পিএ প্রশাসনের প্রভাবশালী কর্তারা তাতে বাদ সেধেছেন। তা ছাড়া ফাতাহর নেতা হিসেবে পশ্চিমারা তাকে সুবিধার মনে করে না। দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের কথা বলে আসা ফাতাহর এই আপসহীন নেতাকে আব্বাসের প্রধান বিকল্প ভাবা হয়। যদি ফিলিস্তিনে আবারও নির্বাচন হয়, তবে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। একটি জরিপে উঠে এসেছে, তিনি এখন ফিলিস্তিনের সর্বাধিক জনপ্রিয় নেতা। গাজার শাসক হামাসের কাছেও তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে; যে কারণে উপত্যকার নিয়ন্ত্রকরা বেশ কয়েকবার তার মুক্তির প্রস্তাব তুলে ধরেছেন।

এদিকে, সেদিনের কারাবন্দি প্রেমিকের ভালোবাসার আহ্বান উপেক্ষা করতে না পারা তরুণী ফাদওয়া বয়সের কাছে হার মেনে লড়তে লড়তে ক্লান্ত নন। মার্কিন-জায়নবাদী অক্ষের কাছে মারওয়ান যেমন আতঙ্ক, তেমনি ফাদওয়া তাদের চক্ষুশূল। আল কুদস ইউনিভার্সিটি থেকে আইন বিভাগে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর তিনি ফিলিস্তিনিদের পক্ষে আইনি লড়াইয়ের ব্রত নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। রামাল্লায় নিজের দপ্তর খুলেছেন ফাদওয়া। সেখান থেকে তিনি  লড়াই করছেন হাজার হাজার মুক্তিকামী তরুণের জন্য। স্বামীর পাশাপাশি হাজারো ফিলিস্তিনি বন্দির মুক্তির জন্য দেশে-বিদেশে জনমত তৈরিতে কাজ করতে দেখা গেছে তাকে। ২০১৩ সালে তিনি বড় এক উদ্যোগ নেন। এ সময় দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আহমেদ কাথরাদার সমর্থন নিয়ে ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তির প্রচারাভিযান শুরু করেন তিনি। এরপর আটজন নোবেল লরিয়েট, ১১৫ দেশের সরকারপ্রধান, ১৫ দেশের রাষ্ট্রপ্রধানসহ আরও অনেকে তার এ প্রচারকাজে সমর্থন ব্যক্ত করতে দেখা যায়। তার তুমুল প্রচারাভিযানের এক পর্যায়ে ২০১৬ সালে একবার মারওয়ান নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন। মারওয়ানকে এখন পাঁচটি মৃত্যুদ-াদেশের সাজা দিয়ে আটকে রেখেছে ইসরায়েল। এর বাইরে তার সাজার মেয়াদ আরও বাড়ানো হয়েছে। ফাদওয়া বারবার দাবি করছেন, এসব বিচারপ্রক্রিয়া ত্রুটিপূর্ণ ও সাজানো। মারওয়ান ও সহবন্দিরা কারাগারের ভেতরে বন্দিদের সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাতের দাবিতে বেশ কয়েকবার অনশন করেন। এসব তৎপরতার আইনি পরামর্শ প্রদান করা নিত্যদিনের কর্তব্য হয়ে উঠেছে তার। যে কোনো পরিস্থিতিতে ফাদওয়া ফিলিস্তিনি বন্দিদের স্বজনদের আশা-ভরসার জায়গা। তা ছাড়া বন্দিদের বিরুদ্ধে অন্যায্য ও ভুয়া বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে বিশ্বের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর তিনি। ফাদওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমি এখনো মারওয়ানের জন্য অপেক্ষা করছি। ৩৩ বছর ধরে অপেক্ষা করছি, তিনি আমাকে একটি স্বাভাবিক জীবন দেবেন; যেমনটা তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। অবশ্য, ফিলিস্তিনিরা এখনো মুক্তির স্বাদ পায়নি। তাই আমাদের সংগ্রাম জারি রাখতে হবে, যতদিন না আমাদের মুক্তি আসে।’ তিনি স্বামীর মতো নিজের জীবনের ব্রত জানিয়েছিলেন, ‘আমি আমার জীবনটা রাজনৈতিক বন্দিদের জন্য উৎসর্গ করেছি।’

লেখক: অনুবাদক ও লেখক

musfikur.muzahid1993@gmail.com