পুলিশে সরষের ভেতর ভূত

দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। হাসিনা সরকারের শেষ সময়ে পুলিশের নেতৃত্বে ন্যক্কারজনক হত্যাকাণ্ড ঘটে। কোটা সংস্কার নিয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দমনপীড়ন চালায়। গুলিতে শিক্ষার্থী ও নিরীহ মানুষসহ প্রায় হাজারের ওপরে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। জনগণের আন্দোলনে দেশ ছেড়ে পালান শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগের পতনের পর বিক্ষুব্ধ জনতা থানায় থানায় আগুন জ¦ালিয়ে দেয়। জনরোষের মুখে পড়ে পুলিশ ও আনসার সদস্যেরও মৃত্যু হয়। হাজার হাজার পুলিশ আত্মগোপন করে। ধীরে ধীরে পুলিশরা কাজে ফিরলেও তাদের ওপর জনতার আস্থা ফেরেনি। উপরন্তু পুলিশ সদস্যদের কাজেও ঢিলেঢালা ভাব দেখা গেছে। দেশ রূপান্তরের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, পুলিশের ভেতরেই সিন্ডিকেটবাজি চলছে। পতিত স্বৈরাচারের সময়ে সুবিধাভোগী ও অন্যায়কারী পুলিশেরা নানারকম অপকর্ম করে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। পুলিশ সদর দপ্তর নিশ্চিত হয়েছে, সরকারকে বিতর্কিত করতে নতুন করে পদায়ন করাসহ বিভিন্ন স্থানে থাকা কর্মকর্তা ও অন্য সদস্যরা অলসতা দেখাচ্ছে। পাশাপাশি পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও ফাঁস করে দিচ্ছেন কেউ কেউ।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুলিশের দুইশর বেশি কর্মকর্তা আত্মগোপনে থাকলেও তাদের আস্থাভাজনরা বিভিন্ন ইউনিটির গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দায়িত্ব পালন করছেন। সেখান থেকে তারা কৌশলে সব ধরনের কলকাঠি নাড়ছেন বলে অভিযোগ আছে। বদলি বাণিজ্য থেকে শুরু করে নানা অনিয়মেও জড়িত আছেন কেউ কেউ। আত্মগোপনে থাকা পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হওয়ার পরও রহস্যজনক কারণে তারা আছেন বহাল-তবিয়তে। আবার কিছু সৎ ও নিষ্ঠাবান পুলিশ কর্মকর্তাকে আসামি করায় কিছুটা সমালোচনা রয়েছে। জুলাই-আগস্টের হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় সম্পৃক্ত থাকায় যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে তাদের মধ্যে বেশিরভাগ আসামিই রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েছে পাঁচ মাসের বেশি। এ সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখাসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। অপরাধীদের বিষয়ে কঠোর অবস্থানে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে সরকারের হাইকমান্ড। নিয়মিত চিরুনি অভিযান হওয়ার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। রাস্তায় থাকছে না পুলিশের কোনো ধরনের টহল। রাত গভীর হলে নিস্তব্ধতা দেখা দেয়। এমনকি থানার সামনেও থাকে সুনসান নীরবতা।

পুলিশ সূত্র জানায়, রাত নামতেই অলিগলি থেকে রাজপথের অধিকাংশ এলাকা চলে যায় ছিনতাইকারীদের দখলে। ঢাকার মোহাম্মদপুর, হাজারীবাগ, যাত্রাবাড়ীসহ একাধিক স্থানে অপরাধের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় নগরবাসীকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলেছে। গণঅভ্যুত্থানে বিতর্কিত ভূমিকার কারণে পুলিশের মনোবল ও তৎপরতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। অভিযানের উদ্যম নেই। অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে গড়িমসি করছেন অনেক পুলিশ সদস্য। এসব কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ব্যবসায়ীদের টার্গেট করে সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী-ডাকাত দল ছিনিয়ে নিচ্ছে অর্থ ও মালপত্র।

আশার কথা, পুলিশ সদর দপ্তর পুলিশ সদস্যদের এসব অপকর্মের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছে। এসব রোধ করতে পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে ইউনিট, রেঞ্জ ও জেলাগুলোতে বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। টিমের সদস্যরা ছদ্মবেশে ওই ‘অলস পুলিশদের’ চিহ্নিত করে প্রতিবেদন দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে পুলিশের একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছে। ওঝার কাজ যেমন ভূত তাড়ানো, পুলিশের কাজও অপরাধ ঠেকানো, কিন্তু সরষের ভেতরই ভূত থাকলে তা তাড়াবে কে? বাংলাদেশের ইতিহাসে জঘন্যতম গণহত্যা সংঘটিত করার পরও যদি পুলিশ আগের মতোই বেপরোয়া থাকে, আগাপাশতলা পরিবর্তন না হয়, তবে তা কেবল হতাশাজনকই নয়, দেশের ভবিষ্যতের জন্য মারাত্মক বিপদসংকেত।