বিদ্যুতের সিন্ডিকেট ভাঙবে কবে

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রায় সব খাত ও প্রতিষ্ঠানে কায়েমি স্বার্থের সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আশা করা হয়েছিল অন্যান্য খাতের মতো দেশের জ্বালানি খাতে সেই ধারার অবসান হবে। অথচ গত পাঁচ মাসের অভিজ্ঞতা মোটেই সুখকর নয়। বিগত ১৬ বছর যেই সিন্ডিকেট বা চক্র এই খাতে লুটপাট, অনিয়ম চালিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে, সেই চক্রটি কৌশলে একই তৎপরতা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে। 

দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নানা কূটকৌশলে বিদ্যুৎ খাতে প্রিপেইড মিটার বাণিজ্যের মাধ্যমে কয়েক হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে একটি শক্তিশালী চক্র। নেপথ্যে ছিলেন সাবেক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু এবং তৎকালীন বিদ্যুৎ সচিব ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউস। নতুন করে এখন আবার ভিন্ন উপায়ে সেই চক্রটি সক্রিয় হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। মূলত বিদ্যুতের অপচয় ও চুরি রোধ করে গ্রাহকের স্বার্থরক্ষার কথা বলে এসব প্রিপেইড মিটার বসানোর উদ্যোগ নিয়েছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। এরই মধ্যে কয়েক লাখ প্রিপেইড মিটার স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু গ্রাহকের স্বার্থ কতটুকু পূরণ হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও একটি চক্র মিটার-বাণিজ্যের মাধ্যমে রাতারাতি যে ফুলেফেঁপে উঠেছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। অনেকেই মিটার আমদানিকে ঢাল বানিয়ে দেশের টাকা বিদেশে পাচার করেছেন বলেও রয়েছে অভিযোগ। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মিটার-বাণিজ্যের সঙ্গে সাবেক প্রতিমন্ত্রী, সচিবসহ সংস্থা ও কোম্পানির চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রকল্প পরিচালকরাও যুক্ত ছিলেন। ঘুরেফিরে নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নিত এবং নিজেদের মধ্যে শলাপরামর্শ করে দেওয়া হতো দরপ্রস্তাব। বিপু সিন্ডিকেটের বাইরে গিয়ে কারও দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ, সাহস কোনোটাই ছিল না। এই সিন্ডিকেটে বিদেশি প্রতিষ্ঠানও ছিল বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। 

প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুরনো সেই সিন্ডিকেটের মূল হোতারা গা-ঢাকা দিলেও তাদের হয়ে নতুন মুখ এখন এই বাণিজ্যে তৎপর বলে অভিযোগ করেছেন অনেকেই। তদবির চালানো হচ্ছে। চক্রটি দরপত্র ছাড়াই মিটার সরবরাহের জন্য প্রস্তাব দিয়েছে ইতিমধ্যে। এসব প্রস্তাব প্রক্রিয়াধীন। একটি প্রতিষ্ঠান ডিপিএম পদ্ধতিতে মিটার ক্রয়ের প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছে। তবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেছেন, এখন থেকে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সব ধরনের কেনাকাটা হবে। আর কোনো চক্র তৈরির সুযোগ দেওয়া হবে না বলেও জানিয়েছেন তিনি। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে অনেক মিটার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা উন্মুক্ত দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে স্মার্ট প্রিপেইড মিটার সরবরাহ করতে সক্ষম। যদি এই প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান করা হয়, তবে সরকার কমমূল্যে গুণগত মানসম্পন্ন স্মার্ট প্রিপেইড মিটার কিনতে পারবে এবং দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কারিগরি সক্ষমতা অর্জন করবে। পাশাপাশি বিদেশে অর্থ পাচারও বন্ধ হবে।

এটা মনে রাখা দরকার, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির যতগুলো কোম্পানি সবগুলোই সরকারি মালিকানাধীন। প্রশ্ন হলো সরকারের কোম্পানিগুলো সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের দিয়ে পরিচালনা করা হলেও তাদের কারোরই কোথাও কোনো জবাবদিহি নেই কেন? প্রশ্ন উঠেছে কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো টিকিয়ে রাখার যৌক্তিকতা নিয়েও, যা বিগত আওয়ামী সরকার ও তাদের দেশি-বিদেশি সহযোগীদের লুটপাটের অন্যতম ক্ষেত্র ছিল। এই পরিস্থিতিতে সেই পুরনো প্রশ্নটি আবারও সামনে আসছে যে, তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের উৎপাদন, মজুদ, সরবরাহ এবং দাম নিয়ন্ত্রণের কোনো সমন্বিত পরিকল্পনা সরকারের নেই কেন? বিদ্যুৎ খাতের কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হোক, এটাই প্রত্যাশিত। আমরা দেখতে চাই, এই চক্রের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে নতুন চক্র যেন গড়ে না ওঠে, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। পুরনো কিংবা নতুন সিন্ডিকেটমুক্ত হোক বিদ্যুৎ খাত।